ফরিদগঞ্জ (চাঁদপুর): একদিকে হিসাব থেকে ৬০ হাজার টাকা উত্তোলন, অন্যদিকে মুঠোফোনে আসা বার্তায় দেখাচ্ছে এক লাখ টাকা! নিজের ব্যাংক হিসাবের এমন গরমিল দেখে উদ্বিগ্ন হয়ে ফরিদগঞ্জের জনতা ব্যাংক পিএলসি শাখায় ছুটে যান লতিফগঞ্জ ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার প্রভাষক মো. মহিউদ্দিন। তবে টাকা উত্তোলনের বিষয়টি নিয়ে ব্যাংকে গিয়ে সমাধান পাওয়ার বদলে কর্মকর্তাদের আচরণ নিয়ে নতুন বিড়ম্বনায় পড়ার অভিযোগ করেছেন তিনি।
রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) সকাল ১০টা ২০ মিনিটের দিকে ফরিদগঞ্জের কলাবাগান এলাকার একটি ভবনের দ্বিতীয় তলায় অবস্থিত জনতা ব্যাংক পিএলসি’র শাখায় যান মহিউদ্দিন।
মহিউদ্দিনের দাবি, চলতি মাসে তিনি নিজের এটিএম কার্ড ব্যবহার করে ২০ হাজার টাকা করে তিন দফায় মোট ৬০ হাজার টাকা উত্তোলন করেছেন। কিন্তু প্রতিবার টাকা উত্তোলনের পর মুঠোফোনে আসা এসএমএস যাচাই করে তিনি দেখতে পান, ২০ হাজার টাকা করে পাঁচ দফায় মোট এক লাখ টাকা উত্তোলনের তথ্য দেখানো হয়েছে।
বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে তিনি ব্যাংক শাখার ব্যবস্থাপক ফখরুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। মহিউদ্দিনের ভাষ্য, ব্যবস্থাপক তাকে লিখিত আবেদন নিয়ে ব্যাংকে আসতে বলেন। সে অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ে ব্যাংকে গেলেও সেখানে ব্যবস্থাপককে পাওয়া যায়নি।
পরে তিনি ব্যাংকের সেকেন্ড অফিসার মো. সাইদ হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এ সময় তাকে দুটি আবেদন ফরম দেওয়া হয়। ফরম কীভাবে পূরণ করতে হবে-এ বিষয়ে জানতে চাইলে সাইদ হোসেন বিরক্তি প্রকাশ করেন বলে অভিযোগ করেন মহিউদ্দিন।
এদিকে ব্যাংকে উপস্থিত ছিলেন কয়েকজন সংবাদকর্মী। তারা নিজেদের পরিচয় দিয়ে দৈনিক ইত্তেফাক, আরটিভি ও দৈনিক চাঁদপুর কণ্ঠের পরিচয়পত্র দেখান। সাংবাদিকদের দাবি, সকাল ১১টা পর্যন্ত শাখা ব্যবস্থাপক ব্যাংকে না আসায় তার অনুপস্থিতির ছবি তুলতে গেলে সেকেন্ড অফিসার মো. সাইদ হোসেন ‘কিসের সাংবাদিক?’ বলে মন্তব্য করেন।
সাংবাদিকদের অভিযোগ, এরপর ব্যাংকের নিরাপত্তাকর্মীকে ইশারা করে তাদের বের করে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। ব্যাংক থেকে বের হওয়ার আগ পর্যন্ত নিরাপত্তাকর্মীরা একাধিকবার তাদের বাইরে চলে যেতে বলেন বলেও দাবি করেন তারা।
একাধিক সাংবাদিক নিজেদের ভিজিটিং কার্ড দেখিয়ে পরিচয় স্পষ্ট করার পরও ওই মন্তব্যের কারণ জানতে চাওয়া হলে সাইদ হোসেন কোনো উত্তর দেননি বলে অভিযোগ করেন উপস্থিত সাংবাদিকরা।
শুধু সাংবাদিকদের সঙ্গে নয়, ব্যাংকটির কয়েকজন কর্মকর্তার আচরণ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন কয়েকজন গ্রাহকও।
আদর্শ একাডেমির শিক্ষক রাসেল ইব্রাহীম অভিযোগ করেন, একদিন ব্যাংকে গেলে শাখা ব্যবস্থাপক তাকে উদ্দেশ করে ‘এই হোলাডা’ বলে সম্বোধন করেন। তার অভিযোগ, গ্রাহকদের সঙ্গে ব্যাংক কর্মকর্তাদের আচরণে প্রয়োজনীয় সৌহার্দ্য ও পেশাদারিত্বের ঘাটতি রয়েছে।
গ্রাহক রায়হান খান বলেন, জনতা ব্যাংকে এসে আমার শিক্ষা হয়ে গেছে। জীবনে বেঁচে থাকলে আর কখনো এই ব্যাংকে যাব না।
আল-আমীন ভূঁইয়ার অভিযোগ, ব্যাংকটির কয়েকজন কর্মকর্তা গ্রাহকদের সঙ্গে এমন আচরণ করেন, যেন ব্যাংকটি তাদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি।
আরেক গ্রাহক মো. আজাদ বলেন, কয়েকজন কর্মকর্তার আচরণ সভ্য মানুষের মধ্যে পড়ে না। আমার সঙ্গেও একদিন তীব্র তর্ক-বিতর্ক হয়েছিল।
এদিকে ব্যাংক শাখায় নির্ধারিত সময়ে উপস্থিত না থাকার বিষয়ে ব্যবস্থাপক ফখরুল ইসলামের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, অফিসের কাজে বাইরে ছিলাম।
গ্রাহক ও সাংবাদিকদের সঙ্গে ব্যাংক কর্মকর্তাদের অসৌজন্যমূলক আচরণের অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া আমি মন্তব্য করব না।
এদিকে মহিউদ্দিনের হিসাব থেকে প্রকৃতপক্ষে কত টাকা উত্তোলন হয়েছে এবং মুঠোফোনে আসা এসএমএসে অতিরিক্ত ৪০ হাজার টাকা উত্তোলনের তথ্য কেন এসেছে-এ বিষয়টির তাৎক্ষণিক কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
একজন গ্রাহকের হিসাবের টাকা উত্তোলন নিয়ে এমন অভিযোগ যেমন উদ্বেগ তৈরি করেছে, তেমনি গ্রাহক ও সাংবাদিকদের সঙ্গে কর্মকর্তাদের আচরণ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। গ্রাহকসেবা একটি ব্যাংকের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হলেও ফরিদগঞ্জের জনতা ব্যাংক শাখাকে ঘিরে ওঠা এসব অভিযোগের বিষয়ে কর্তৃপক্ষ কী পদক্ষেপ নেয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
ফম/এমএমএ/


