শিল্পকলা একাডেমিতে মঞ্চস্থ হলো বর্ণচোরা নাট্যগোষ্ঠীর ‘লালননামা’ 

প্রয়াত নাট্যকার ও নির্দেশক জিয়াউল আহসান টিটো’র স্মরণে

চাঁদপুর:  প্রয়াত নাট্যকার ও নির্দেশক জিয়াউল আহসান টিটো’র স্মরনে মঞ্চস্থ হলো বাউল সম্রাট লালন ফকিরের জীবন, দর্শন ও মানবতাবাদী চিন্তা নিয়ে প্রয়াত জিয়াউল আহসান টিটো’র রচিত ও নির্দেশিত নাটক ‘লালননামা’।
বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের সদস্যভূক্ত বর্ণচোরা নাট্যগোষ্ঠীর ৪৯তম প্রযোজনায় লালননামা নাটকটি  ২০ জুলাই (সোমবার) সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় চাঁদপুর শিল্পকলা একাডেমিতে মঞ্চায়ন করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চাঁদপুরের জেলা প্রশাসক আহমেদ জিয়াউর রহমান।
নাটকে বাউল সম্রাট লালন ফকিরের জীবন সংগ্রাম, মানবধর্ম, সাম্য ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার দিকগুলো তুলে ধরা হয়। লালনের গান, বাণী ও দর্শনের মধ্য দিয়ে সমাজের অসঙ্গতি ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে তার অবস্থানকে অসাধারণভাবে নাটকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
নাটকের লালন শাহ’র চরিত্রে অভিনয় করেন কামরুজ্জামান শিশির। এছাড়াও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে ছিলেন মাকসুদুল ইসলাম রতন, শুভ্র রক্ষিত, সিয়াম খান, নাজমুল হোসেন বাপ্পি, মরিয়ম আক্তার মাহি, মুক্তা ইসলাম মিম, আসমা আক্তার পাখি, চৈতী শীল, দেবব্রত সরকার বিজয়, রাজা মজুমদার, দিলীপ দাস, নূরে আলম নয়ন, বলাই চন্দ্র সরকার, আসিফুল আলম, বিশ্বজিৎ দেবনাথ প্রিতম ও শরীফ চৌধুরী। সংগীত ও বাদনে ছিলেন বিচিত্রা সাহা, শান্তি রক্ষিত, ঐশি দাস ও শুভ। আলোক পরিকল্পনা ও প্রক্ষাপনে ছিলেন শুকদেব রায়।
বর্ণচোরা নাট্যগোষ্ঠীর সভাপতি শুকদেব রায় ও সাধারণ সম্পাদক শরীফ চৌধুরী বলেন, লালনের দর্শন আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। নতুন প্রজন্মের কাছে লালনকে পরিচয় করিয়ে দিতেই আমাদের এই প্রয়াস। আমরা এবারের মঞ্চায়িত নাটকটি আমাদের সংগঠনের অন্যতম কর্মকর্তা এই নাটকের নাট্যকার ও নির্দেশক প্রয়াত জিয়াউল আহসান টিটো’কে উৎসর্গ করা হয়েছে। এই নাটকটি আমরা আবারো মঞ্চে আনবো, শুধুমাত্র আমাদের প্রিয় জিয়াউল আহসান টিটোকে স্মরণ করার জন্য।
নাটক শুরু হওয়ার পূর্বে প্রয়াত জিয়াউল আহসান টিটোসহ সকল নাট্য ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের স্মরনে দাঁড়িয়ে এক মিনিট নিরবতা পালন করা হয়। নাটক শেষে জেলা প্রশাসক আহমেদ জিয়াউর রহমান বক্তব্য রাখেন।
নাটক শেষে দর্শকরা দাঁড়িয়ে করতালি দিয়ে অভিনেতা ও কলাকুশলীদের অভিনন্দন জানান। অনুষ্ঠানে স্থানীয় সংস্কৃতিকর্মী, শিক্ষক ও সুধীজন উপস্থিত ছিলেন।
শিল্প, মঞ্চ এবং নাটকের কখনো মৃত্যু হয় না। ঠিক যেমন মৃত্যু হয় না সেই স্রষ্টা বা কারিগরের। যিনি নিজের ভিতর আস্ত জীবনকে ধারণ করে মঞ্চে আলো জ্বালেন। আজ এই মঞ্চে আলো জ্বলছে, মঞ্চ প্রস্তুত কিন্তু আমাদের মাঝে নেই,  সেই আলোর মূল কারিগর। আজ আমরা এখানে সমবেত হয়েছি, একধারে গভীর শোক, শ্রদ্ধা এবং পরম ভালোবাসার এক মিশ্র অনুভূতি নিয়ে। বাংলাদেশের নাট্যাঙ্গনের উজ্জ্বল নক্ষত্র, নাট্য ব্যক্তিত্ব,আমাদের বর্ণচোরা নাট্যগোষ্ঠীর প্রাণপুরুষ, চাঁদপুরের গর্ব নাট্যকার, নির্দেশক ও নাট্যাভিনেতা জিয়াউল আহসান টিটো আজ আমাদের মাঝে আর বেঁচে নেই। এবছরই ১৪ মার্চ বৃহস্পতিবার তিনি এই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে চিরবিদায় নিয়েছেন। কিন্তু তিনি রেখে গেছেন,  তাঁর সৃষ্টি, তাঁর দর্শন, থিয়েটারের প্রতি নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ।
বর্ণচোরা নাট্যগোষ্ঠী এবং জিয়াউল আহসান টিটো পরস্পর পরস্পরকে একই সূত্রে গেঁথে ১৯৮২ সাল থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত অতন্ত দক্ষ তার সাথে মঞ্চ সৈনিক হিসেবে কাজ করেছেন। এই দীর্ঘ ৪৪ বছরে তাঁর প্রিয় সংগঠন বর্ণচোরা নাট্যগোষ্ঠীকে অনেক অনেক শ্রম, ঘাম,মেধা,অর্থ দিয়ে সংগঠনটিকে এগিয়ে নিতে চেষ্টার ত্রুটি করেননি তিনি। আর এই চেষ্টা ফসল হিসেবে সংগঠনটি বাংলাদেশে পেয়েছে অনেক খ্যাতি ও অর্জন।
তিনি বর্ণচোরা নাট্যগোষ্ঠী,চাঁদপুর ও থিয়েটার ঢাকার নিবেদিত মঞ্চ সৈনিক হিসেবে নি:স্বার্থ ভাবে কাজ করে গেছেন। নাট্যাঙ্গণের এই ৪৪ বছরে তিনি নিজ সংগঠন বর্ণচোরা নাট্যগোষ্ঠীর জন্য সাজাহান নাটকটি নাট্যরূপ ও নির্দেশনা দিয়েছেন এবং বাউল সম্রাট লালন ফকিরের কাহিনী ও দর্শন নিয়ে রচনা ও নির্দেশনা দিয়েছেন লালননামা। এই নাটক দুটি বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে এবং বাংলাদেশ টেলিফোনে মঞ্চায়ন কারে ব্যাপক সুনাম ও খ্যাতি অর্জন করেছে। বর্ণচোরা নাট্যগোষ্ঠী অনেক নাটকের আলোক প্রক্ষেপণ ও নির্দেশনা দিয়েছেন। তিনি বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের আন্তর্জাতিক সম্পাদক, চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও নির্বাহী সদস্যের দায়িত্ব নিষ্ঠা ও সততার সাথে  পালন করেছেন।
চাঁদপুর শহরের শহীদ মুক্তিযোদ্ধা সড়ক ( কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের বিপরীতে)  তাঁর পৈতৃক বাড়ি রয়েছে। তাঁর পিতা বিশিষ্ট চিকিৎসক ডাঃ আবুল খায়ের গোলদার। চার ভাই, এক বোন। ভাইদের মধ্যে তিনি ছিলেন ৩য়। পড়াশুনায় তিনি ছিলেন অত্যন্ত মেধাবি। কলকাত ব্যাঙ্গালোর থেকে বিবিএ সর্বচ্চো ডিগ্রি নিয়ে বিভিন্ন সময় চাকরি ও ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েন। তখনো থেমে ছিলো না তাঁর নাট্যাঙ্গনে বিচরন। তিনি ছিলেন একধারে নাট্যকার, নাট্য নির্দেশক, অভিনেতা, আলোক প্রক্ষেপণ ও নির্দেশক, লেখক ও গবেষক।
জিয়াউল আহসান টিটো শুধু নাটক লিখতেন না, নাটক পড়তে পড়তে মানুষের অন্তরের সত্যকে খুঁজতেন আর এই সত্যেরই এক কালজয়ী রূপান্তর তার রচিত বিখ্যাত নাটক লালননামা। যা ছিল উপমহাদেশে প্রথম বাউল সম্রাট লালন ফকিরের কাহিনী ও দর্শন নিয়ে লেখা মঞ্চ নাটক। সাঁইজির দর্শনকে যিনি অত্যন্ত নিপুন ভাবে  ফুটিয়ে তুলেছেন। তাঁর সেই অমর সৃষ্টিকে পরম শ্রদ্ধায় আবারো মঞ্চে ফিরিয়ে এনেছে বর্ণচোরা নাট্যগোষ্ঠী। জিয়াউল আহসান টিটো বেঁচে থাকবেন লালননামা নাটকের প্রতিটি সংলাপে, কলাকুশলীদের প্রতিটি পদক্ষেপে। থিয়েটারকে ভালোবেসে যাওয়া প্রতিটি মানুষের হৃদয় স্পন্দনে। বর্ণচোরা নাট্যগোষ্ঠী  ও জিয়াউল আহসান টিটো একে অপরের সাথে জড়িয়ে থাকবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম। বর্ণচোরা নাট্যগোষ্ঠীও তাঁকে আজীবন শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করবে। তাঁর সৃষ্টিশীল আত্মা যেখানেই থাকুক – শান্তিতে থাকুক।
ফম/এমএমএ/

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট | ফোকাস মোহনা.কম