শাহরাস্তিতে প্রকাশ্য প্রাইভেট বাণিজ্য

শিক্ষক নিজেই জানেন না সরকারি নীতিমালা

চাঁদপুর: চাঁদপুরের শাহরাস্তি উপজেলার চিতোষী পূর্ব ইউনিয়নের চিতোষী আর এম উচ্চ বিদ্যালয়ের সন্নিকটে ভবন ভাড়া নিয়ে চালিয়ে যাচ্ছেন প্রাইভেট বাণিজ্য চালাচ্ছেন ওই বিদ্যালয়ের কতেক শিক্ষক। তথ্য সংগ্রহে সংবাদকর্মীরা সেখানে গেলে প্রাইভেট টিউশন বন্ধে সরকারি নীতিমালা জানেন না বলে সাংবাদিকদের দেখে উত্তেজিত হয়ে পড়েন ওই শিক্ষা বানিজ্যের কর্ণধার দুই শিক্ষক।

জানা যায়, বিগত করোনাকালীন সময়ে শিক্ষার্থীরা পড়ালেখায় পিছিয়ে পড়লেও বর্তমানে পুরো দমে ক্লাস চালু হওয়ায় আনন্দিত শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষার্থীরা। এ সুযোগে কিছু অসাধু শিক্ষক প্রতিষ্ঠান কেন্দ্রিক কিংবা বাহিরে প্রাইভেট বাণিজ্যে ঝুঁকে পড়েন। এমনি দৃশ্যের অবতারণ হয়েছে উপজেলার চিতোষী পূর্ব ইউনিয়নের চিতোষী আর এম উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মাঝে। বিদ্যালয়ের বেশ ক’জন শিক্ষক বিদ্যালয়ের কাছাকাছি ভবন ভাড়া নিয়ে চালিয়ে যাচ্ছেন প্রাইভেট বাণিজ্য।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বিদ্যালয় সংলগ্ন একটি ভবনের দ্বিতীয় তলায় ওই বিদ্যালয়ের গণিত বিষয়ের শিক্ষক মাহফুজুর রহমান ও কৃষি বিজ্ঞান বিষয়ের শিক্ষক সাফায়েত হাসনাইন নামে দু’জন শিক্ষক প্রকাশ্যে প্রাইভেট কোচিং সেন্টার খুলে বসেছেন। চিতোষী আর এম উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সকাল ৬ টা থেকে সাড়ে ৯টা ও বিকেলে বিদ্যালয় ছুটির পর হতে সন্ধ্যার আগ পর্যন্ত এখানে প্রাইভেটে অংশ নেয়। যেখানে ওই দুই শিক্ষক দলগত ভাবে ১৫-২০জন করে প্রাইভেট পড়ান। এছাড়া ওই এলাকায় একাধিক শিক্ষক এভাবে ভবন ভাড়া নিয়ে চালিয়ে যাচ্ছেন প্রাইভেট কোচিং বাণিজ্য।

বিদ্যালয় সংলগ্ন একটি ভবনে শিক্ষক মাহফুজুর রহমানের সাথে কথা বলতে চাইলে উত্তেজিত হয়ে পড়েন। তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে বলেন আপনারা প্রতিটি বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখেন, সবাই প্রাইভেট পড়াচ্ছে। তাদের পড়াতে অসুবিধা না হলে আমাদের হবে কেন? প্রাইভেট পড়ানোর বিধি নিষেধ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি জানান, এ বিষয়ে এখনো কোন চুড়ান্ত নীতিমালা আসেনি। তাছাড়া বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কিংবা পরিচালনা পর্ষদ সভাপতি হতে আমরা এমন কোন নিষেধাজ্ঞা পাইনি। যখন প্রজ্ঞাপন পাওয়া যাবে তখন চিন্তা করবো। তাছাড়া এখানে যাদের পড়াই তাদের কাছে দাবি করে কোন অর্থ আদায় করা হচ্ছে না। যার যা ইচ্ছে সাধ্যমতো দিচ্ছে।

একই বিদ্যালয়ের কৃষি বিজ্ঞানের শিক্ষক সাফায়েত হাসনাইন জানান, আমি প্রাইভেট পড়ানোর বিষয়ে সরকারের বিধি নিষেধ রয়েছে বলে অবগত। তারপরও অভিভাবক মহলের চাপে বাধ্য হয়ে তাদের সন্তানদের পড়াতে হয়। সব শিক্ষকরাই পড়াচ্ছে কারো কোন অসুবিধা হচ্ছে না বিধায় আমিও প্রাইভেট পড়াচ্ছি। সবাই বন্ধ করে দিলে আমিও বন্ধ করে দিবো।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন শিক্ষার্থী ও অভিভাবক জানান, শিক্ষকরা শ্রেণিতে পাঠদানের চেয়ে প্রাইভেটে পাঠদানে আগ্রহী। যারা প্রাইভেটে পড়ে না তারা অনেক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়। তাই সাধ্য না থাকলেও বাধ্য হয়েই অনেকক্ষেত্রে প্রাইভেটে যেতে হয়।

চিতোষী আর এম উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোঃ মিজানুর রহমান জানান, শিক্ষানীতি ২০১২ বাস্তবায়নে আমরা বদ্ধ পরিকর। আমি যোগদানের পূর্বে বিদ্যালয়ের ভিতরে প্রাইভেট পড়ানো হতো। আমি যোগদানের পর তা বন্ধ করে দেই। বিদ্যালয়ের সীমানার বাহিরে যদি কেউ প্রাইভেট কোচিং বাণিজ্য চালু করে শিক্ষার্থীদের পড়িয়ে থাকেন সেটি তাদের ব্যক্তিগত বিষয়। এ বিষয়ে আমি কোন দায়িত্ব বহন করবো না। নীতিমালা অনুযায়ী প্রাইভেট নিষিদ্ধ আমরা বিদ্যালয়ের প্রতিটি শিক্ষককে সভা করে রেজুলেশনের মাধ্যমে জানিয়ে দিয়েছি।

উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোঃ আহসান উল্যাহ চৌধুরী জানান, নীতিমালা অনুযায়ী কোন শিক্ষক প্রাইভেট কোচিং বাণিজ্য করতে পারবেন না। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে লিখিত ভাবে জানানো হয়েছে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও বিদ্যালয়ের পরিচালনা পর্ষদ সভাপতি মোঃ হুমায়ুন রশিদ জানান, সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী প্রাইভেট নিষিদ্ধ। এ বিষয়ে মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে দিয়ে প্রাইভেট কোচিং বাণিজ্য বন্ধের জন্য প্রতিটি প্রতিষ্ঠান প্রধানকে পত্র দেয়া হয়েছে। এরপরও যদি কেউ বিধান লংঘন করে তাহলে বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা নেয়া হবে।

প্রসঙ্গত, শাহরাস্তির সীমান্তবর্তী এলাকা চিতোষী। যেখানে একটি কলেজ ও একটি উচ্চ বিদ্যালয় রয়েছে। যার ফলে এ এলাকা শিক্ষার আলোয় আলোকিত করতে অগ্রণী ভূমিকা রাখছে প্রতিষ্ঠান দুটি। সচেতন মহলের দাবি, কিছু সংখ্যক শিক্ষক সেখানে সরকারের নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করে নিজেদের মনগড়া কাজ করে যাচ্ছেন। প্রাইভেট কোচিং সেন্টার খুলে শিক্ষাকে ব্যবসায় রুপান্তর করার চেষ্টা করছেন। এতে করে অর্থ সামথ্যহীন পরিবারের মেধাবী শিক্ষার্থীরা প্রাইভেট পড়তে না পারায় ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। এভাবে মেধাবী শিক্ষার্থীরা ঝড়ে পড়লে শিক্ষা ব্যবস্থা হুমকির মুখে পড়বে।

ফম/এমএমএ/

সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট | ফোকাস মোহনা.কম