রচনা: পান্থ শাহরিয়ার
একটা পুরোন দুই তলা বাড়ী আছে সাত্তার সাহেবের। সব ীলো ফ্ল্যাট ভাড়া দিয়ে সাত্তার তার একমাত্র মেয়ে ঝুম্পাকে নিয়ে থাকেন একটা ফ্ল্যাটে। সাত্তারের স্ত্রী বিগত হয়েছে অনেককাল আগে। তারপর থেকেই ঝুম্পা সামলে রাখে এই সংসারটা। হয়তো এই করতে গিয়েই মেয়েটার পড়া শোনা বেশী দূর এগোয়নি। খুব বেশী মানুষের সাথে মেলা মেশাও করেনা ঝুম্পা। নিজের কাজ শেষ হয়ে গেলে একটা পুরনো গল্পের বই নিয়ে ছাদের কোনায় বসে থাকে। মাঝে সাঝে একা একাই কাকপাখির সাথে কথা চালিয়ে যায়। ছাদের কোনায় দু কামরার যে চিলেকোঠা আছে সেখানে আগে থাকতো একটা বৃদ্ধ হস্ত বিশারদ। মাঝেসাঝে জমিয়ে আড্ডা হতো ঝুম্পার সাথে। কিন্তু এখন ঐ চিলোকোঠায় নতুন ভাড়াটে হয়ে এসেছে একটাছোকরা মতো ছেলে। কেমন যেন গম্ভীর কঠিন চোখে মাঝে মাঝে তাকায় ঝুম্পার দিকে।
প্রথমদিকে দুএকবার ঝুম্পা চেষ্টা করেছিলো কথা বলবার। কিন্তু মুখটা অমন শক্ত করে রাখলে কখনো কারো সাথে কথা বলা যায় নাকি? কিন্তু খুব অবাক করে একদিন সেই অদ্ভুত মুখো লোকটা নিজেই এগিয়ে এসে ঝুম্পার সাথে কথা বলতে শুরু করে। প্রথমটায় বই নিয়ে কথা….তারপর সেখান থেকে একটা দুটো প্রশ্ন….কিভাবে যেন ঝুম্পার সাথে বেশ একটা গল্পের সূǎতা তৈরী হয়ে যায় লোকটার। নাম বলেছিলো ফয়সাল। ঢাকায় এসেছে একটা চাকরীর খোঁজে। কথা দিয়েছে অনেকে কিন্তু সেটা রাখবার সুযোগ হ”েছ না কারো। তাই হোটেলে দিনের পর দিন না থেকে এই চিলেকোঠা ভাড়া নিয়েছে। যদিও দিন দিন পকেটটা আরো শুকিয়ে আসছে। মায়া হয় কথা শুনে ঝুম্পার। সাথে সাথে ফয়সাল এর খাবার দায়িত্ব তুলে নেয় নিজের হাতে। নীচে যা রান্না হবে সেটাই খেতে হবে ফয়সালকে।
শুধু যে মায়া থেকে এটা করছে তাইনা। ফয়সাল কেমন যেন অদ্ভুত করে কথা বলে…..ছোট ছোট করে গল্প বলে শোনাচ্ছে যেন….লেখা লেখির অভ্যাস হয়তো আছে….মাঝে মধ্যেই কথায় কথায় অন্য কোথাও হারিয়ে যায়….কেমন একটা অন্য রকম চরিǎ….অনেকটা বই এ পড়া উপন্যাসের চরিত্রের মতো। এমনটা এর আগে কোনদিন দেখেনি ঝুম্পা কারো মধ্যে। আজকাল তাই যেন ফয়সাল এর কথা ঝুম্পাকে টানতে শুরু করেছে। লোকটার মধ্যে কোনদিন খারাপ কিছু দেখেছে বলে মনে করতে পারেনা ঝুম্পা। এতোটাই শান্ত আর নিরীহ প্রকৃতির মানুষ। এভাবেই কথায় কথায় ঝুম্পা যেন আরো একটা জিনিস অনুভব করতে শুরু করে। আগে কখনো কখনো গল্প উপন্যাসে যেমন পড়েছিলো. ভেতরে কোথাও যেন একটা চিনচিনে টান আজকাল প্রায়ই ঝুম্পাকে জ্বালাতন করে। কোথাও যেন শূণ্যতা গ্রাস করতে চায় তাকে। তবে কি ভালোবেসে ফেলছে ঝুম্পা এই অতি অপরিচিত অথচ কাছের মানুষটাকে? ঠিক এরকম একটা দোলাচালে যখন ঝুম্পার এতোদিনের ছিমছাম জীবনটা অ¯ি’র হয়ে আছে তখনই একদিন ভর দুপুরে বাড়ীর ছাদে দেখা দেয় একদল পুলিশ। চারপাশে হৈ চৈ পড়ে যায়। কার খোজে এসেছে পুলিশ? ফয়সাল এর খোঁজে কি? ছুটে আসা ঝুম্পা জানতে পারে এক দাগী আসামী ফয়সালের গল্প। থমকে যায় উপন্যাসের চরিত্রের মতো দোলার মধ্যে বেড়ে উঠতে থাকা অনুভুতি গুলো। ফয়সালের আরেকটা নতুন গল্প এসে ধুয়ে নিয়ে যায় ঝুম্পার না বলা গল্পটাকে।
ব্রহ্মপুত্রের তীরে : শফিক আজিজ
সারারাত ব্রহ্মপুত্র নদীতে একাকী ছোট্ট নৌকা বেয়ে বেয়ে জাল পেতে মাছ ধরে ওমেদ আলী। মাছ তেমন নেই। মানুষ কর্তৃক ক্রমাগত নদীর পাড় দখল, ভরাট আর নানাভাবে পানি দূষিত হওয়ায় এ অবস্থা। ওমেদ সামান্য মাছ যা পাচ্ছিল তা দিয়েই ভরে তুলে তার সঙ্গের মাছ রাখার বাঁশের পাত্র বা ঝাঁকা। নৌকাটি শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন সংগ্রহশালা সংলগ্ল ঘাটের কাছাকাছি আসতেই সেই পাগলটি বিষাদমাখা গান ধরে। তখন প্রায় ভোরের আলো ফুটেছে। ওমেদ নিত্যদিনের মতোই ঘাটে নৌকা বেঁধে ওপরে উঠে তার সাথে রাখা দুটি টোস্ট আর একটি কলা পাগলকে খেতে দেয়। দেখে পাগলটি জয়নুল সংগ্রহশালার সামনের চৌরাস্তায় ইটের খোয়া দিয়ে নানা ধরনের চিত্র এঁকেছে। একটি চিত্র দেখে ওমেদ থমকে যায়। জয়নুলের দুর্ভিক্ষ আর বিদ্রোহী ষাঁড়ের মতোই এঁকেছে সে। ওমেদের আর্ট সর্ম্পকে কোনো ধারনা না খাকলেও সে কল্পনা করতে পারে ছোটবেলায় সে যখন স্কুলে যেতো ওয়ান বা টু’য়ের বইতে ছবিটি দেখেছে। এগুলো যে দুর্ভিক্ষ আর বিদ্রোহের ছবি স্যার সে কথাও তখন বুঝিয়েছেন। অবশ্য তার আর উপরের ক্লাসে পড়ার সুযোগ হয়নি।
সে দ্রুত ঘাটে এসে ঝাঁকাটি মাথায় নিয়ে প্রতিদিনের মতো মহাজনের আড়তে যাবে। কিন্তু আজ হঠাৎ কী মনে করে জেলেপাড়ার নিজ ঘরে ফেরে ওমেদালী। মাথার ঝাঁকাটি একপাশে নামিয়ে রেখে তক্তাপাতা বিছানায় গা এলিয়ে দিতেই চোখজুড়ে নামে ঘুম। ন’রটার কাছাকাছি ঘুম ভেঙে-ঘুমিয়ে পড়েছিল দেখে খুব অবাক হয় ওমেদ, সেই সঙ্গে ভয়ানক এক ভয়ও চেপে বসে। নিয়মানুযায়ী ভোর সাতটার আগে আগেই সংগ্রহ করা মাছ মহাজনের মাছের আড়তে মেপে বুঝিয়ে দিয়ে- নৌকা ও জালের দাদনের সুদের টাকা কেটে রেখে-সেদিনের দাম সামান্য যা হোক নিয়ে আসতে হয়। ওজনে কমিয়ে ঠকানো, দামে কম দেয়া মহাজন আর তার সাঙ্গপাঙ্গদের নিত্যদিনের কারসাজি হলেও কোন জেলে কোনোদিন প্রতিবাদ করেনি; ওমেদালীও না। রাতের ধরা মাছ ভোরে পৌঁছে দেয়াই আড়তের নিয়ম, কোনোদিন এরও ব্যতিক্রম হয়নি, কেউ ভুলেও নিয়ম ভাঙার সাহস করেনি; কখনো।
ওমেদালী বিছানা থেকে ওঠে পেটে ক্ষুধার চাগড় অনুভব করলে প্লাস্টিকের বয়ামে রাখা দুটো টোস্ট আর জগের একগ্লাশ জল খেয়ে তা নিবৃত্ত করে। সে ওসমানের কাছ থেকে একদিনের জন্য চেয়ে আনা দাঁড়িপাল্লা আর ওজনের পাথর দিয়ে মাছ মাপার উদ্যোগ নেয়। আজ সে নিজে মেপে দেখবে মহাজন মাপে তাদের কত ঠকায়। এরপর ঝাঁকায় রাখা মাছগুলো মেঝেতে ঢালতে থাকে। হঠাৎ মাছগুলোর ভেতরে থাকা চকচকে একটি বস্তু পেয়ে সে অবাক হয়ে যায়। মুহূর্তেই বিস্ময়, ভয় আর আনন্দের আবেগে কেঁপে ওঠে। বস্তুটি হাতে নিয়ে সে নাড়াচাড়া করে, উল্টে-পাল্টে দেখে; অতীত-বর্তমান ও ভবিষ্যতজীবনের একটি ছায়াচিত্র দ্রুত ছায়াপাত করে তার চোখের পর্দায়; তিনটি কালই হঠাৎ একসূত্রে বাঁধা পড়ে বস্তুটির অদৃশ্য সুইয়ের বুননে।
২.
গোপনসূত্রের ভিত্তিতে ভোরেই নির্দিষ্ট রাস্তায় ওঁত পেতে থাকে একদল পুলিশ। পাক্কাসংবাদ মতো দুজন গাড়ি থেকে নেমে এগিয়ে যেতে থাকে সামনে; সন্তর্পণে পিছু নেয় পুলিশ। তাৎক্ষণিকই তা টের পেয়ে যায় দুজন; দ্রুত ছুটতে থাকে সামনে-পেছনে পুলিশও ছুটে। আকস্মিকতায় কিছুটা বিব্রত দুজন-ঠিক কী করবে যেন বুঝে ওঠতে পারছে না, দ্রুতই তারা রাস্তা ছেড়ে নদীর পাড় বেয়ে নিচে নামে। নৌকাটির সামনে এসে অচিরাৎ থমকে দাঁড়ায়; চারপাশে ইতিউতি তাকিয়ে দেখে কেউ কোথাও নেই। নৌকার একপাশে মাঝারি একটি ঝাঁকা, নানা ধরনের মাছে ভরা; একজন চটকরে চকচকে বস্তুটি মাছের ভেতর লুকিয়ে রাখে। তারপর আগের মত আগের গতিতেই সামনে যেতে থাকে। পুলিশও তাদের পেছনে ধাওয়া করতে করতে সামনে অদৃশ্য হয়ে যায়।
৩.
বস্তুটি হাতে নিয়ে নানাভাবে উল্টেপাল্টে দেখে; নানাভাবনার মধ্যদিয়ে পাড় হয় আরও কিছুটা সময়। শেষে মাছগুলো না মেপেই ঝাঁকাতে তুলে, সাড়ে ন’টার পিঠেপিঠে আড়তে রওনা হয় সে। আড়তে ততক্ষণে জেলেদের আনাগুনা কমে গেছে। তাকে দেখেই অবাক হয় বাতাসীর মা; বলে, ‘অ্যাল্লা, ভোরে তোমারে দেখছিন না যে! মাহাজন খুঁজাখুঁজি কইরা পাইছুন না। মাছও বুজাইয়া দ্যাও নাই।’ ওমেদালী কোন কথা না বলে কয়ালের কাছে এগিয়ে যায়; পাশেই মহাজন বসা। মহাজন তাকে দেখেই স্বভাবসিদ্ধভাবে ক্ষেপে যায়; সকালের জমানো ক্রোধ তাতে মিশে তা তেলে-বেগুনে জ্বলে ওঠে : বেশতো ফাঁকিবাজ অইছো! রাইতেরর মাছ ভোরে দেওনের কথা- দেও নাই। এইরকম করলে কইল দাদনের ট্যাকা-পয়সা জমা থিক্যা কাইটা রাইখ্যা বিদাই কইরা দিমু।
-কইরা দ্যান। বেশ গমকের স্বরে জোরে বলে ওঠে ওমেদালী।
মহাজন-কয়াল-মহাজনের দুজন সাগরেদকর্মচারী-জনাকয়েক জেলে-বাতাসীর মাসহ সমস্ত আড়ত যেন বিস্ময়ে ফেটে; রানাপ্লাজার মতো অকস¥াৎ ভেঙেগুড়িয়ে পড়ে। সবাই তাকায় তার দিকে। মহাজনের পঁয়ত্রিশ বছরের মহাজনীজীবনে তার মুখের ওপর এভাবে কেউ কথা বলার সাহস পায়নি বা সাহসের ধৃষ্টতাও দেখায় নি। মহাবিস্ময়েই যেন মহাজনরে মুখ হা হয়ে যায়; তিনি আর কোন কথা বলেন না বা বলতে পারেন না।
মাছ মাপা হয়। বরাবরের মতোই কয়াল তিন কেজি হক ওজনকে আড়াই কেজি করতে গেলে আর দুশ টাকার বদলে প্রতি কেজিতে পঞ্চাশ টাকা করে কম দিতে চাইলে ওমেদ প্রতিবাদ করে। এবারও মহাজন বিস্ময়ে বিস্ময়াভিভূত হয়ে সঠিক মাপ আর ঠিক দাম পরিশোধের নির্দেশ দেন। দাদনের সুদের হিসেবও সে আজ পাক্কা পাক্কা করে বুঝে নেয়; যেখানে গুলমেলে হিসেব কষে প্রতিদিনই ঠকানো হতো তাকে, তাদেরকে।
৪. সন্ধ্যাকাটার পর ঘনায়মান রাতের আঁধারে পায়ে পায়ে বাতাসীর মায়ের বস্তির আবাসের সামনে উপস্থিত হয় ওমেদালী। তাকে দেখে অবাক হয় বাতাসীর মা। আড়ত লাগোয়া এককোণে ছোট্ট একটি চায়ের দোকান চালায় সে দিনের বেলায়। মহাজনেরই বদান্যতায় স্বামীপরিত্যাক্তা অসহায় এ নারীর একটা গতি হয়েছে- সে জন্য আড়তের সবাই তাকে বেশ সমীহ করে চলে; সেও চলে ড্যামকেয়ারে। ওমেদালী বাতাসীর মাকে তার সাথে তার ঘরে বেড়াতে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব নিয়ে এসেছে। মনে মনে খুশি হয় সে। কতদিন কতবার সে নিজে যেচে পড়ে ওমেদালীকে নিয়ে সিনেমা দেখতে যেতে চেয়েছে, যায়নি সে; বলেছে, মহাজন জানলে খুন করবে। বাতাসীর মা গোপনীয়তার হাজারটা উপায় দেখিয়েও রাজি করাতে পারেনি তাকে; সে জানে বাতাসীর মা মহাজনের বাঁধাজন, বাঁধা একজন। সেই-ই যখন তাকে তার বাসায় নিতে চাইছে-খুশি হয়েই রাজি হয় বাতাসীর মা।
৫. রাতে ওমেদালীর পলিথিন-বাঁশ প্রভৃতিঘেরা ঘরে তারা তিনজন- ওমেদালী, বাতাসীর মা আর চকচকে একটি পিস্তল। বাইরে দাঁড়নো একজন-অতি গোপনে-শিকারের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ার সুযোগ ও কৌশলে ওঁৎ পেতে; জানে না ঘরের কেউ। ওমেদালীর অতীত জীবনের ছায়াচিত্র: গ্রাম-অভাব-দারিদ্র্য-মা পেটানো বাবা- ছোট ছোট ভাইবোনদের নিরন্ন মুখ- ক্ষুদ্র ঋণে বাঁধা- বাবার নিরুদ্দেশ হওয়া- সবার অবহেলা- মায়ের পাগল হওয়া-শহরে আসা, বর্তমান: প্রায় মজা নদীতে সারারাত জেগে কখনো বা ঝড়বৃষ্টিতে ভিজে সামান্য মাছ ধরা, দামে ঠকানো-দাদনের চক্রবৃদ্ধি সুদ-মহাজনের কাছেই টাকাপয়সা গচ্ছিত রাখতে বাধ্য করা-দিনমান মহাজন ও সাঙ্গপাঙ্গদের গালাগাল সহ্যকরা-ভয়ে টঠস্থ থাকা, ভবিষ্যৎ: বাতাসীর মাকে নিয়ে অনেক দূরে ছোট্ট সবুজ গায়ে কলাপাতায় ঘেরা নতুন ঘর-নতুন সংসার-পান্তাভাতে কাঁচামরিচ-এইসব ভেসে ওঠে। বাতাসীর মা হাসে-খিলখিলিয়ে-চাপা; অতি সন্তর্পণে। আর পিস্তলটি উদ্ধত-চকচকে-ধারালো। হঠাৎ নিস্তব্ধ রাতের বুক চিরে একটি ভংঙ্কর; ভয়াবহ শব্দ।
৬.
গ্রেফতারকৃত ওমেদালীকে পুলিশ আদালতে নিয়ে যায়; বাতাসীর মাকেও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নেয়া হয়। মহাজনের লাশটি ঘিরে স্বজন আর পড়শিদের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে ময়মনসিংহ শহরের লেপপট্টির পাশের মহল্লার ছোট্ট পাড়াটি।



