চাঁদপুর : চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার এখলাছপুর ইউনিয়নের চরকাশিম গ্রামে মাসুম বকাউল (২৫) নামে এক যুবককে কুপিয়ে হত্যাচেষ্টার ঘটনাকে কেন্দ্র করে পুরো চরাঞ্চলে আবারও রাজনৈতিক উত্তেজনা ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
হামলার পর এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, পূর্বশত্রুতা এবং রাজনৈতিক প্রভাবকে ঘিরে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। একদিকে আহত যুবকের পরিবার বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে হামলার অভিযোগ তুলেছে, অন্যদিকে অভিযুক্ত পক্ষ দাবি করছে, আহত মাসুম নিজেই দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় সশস্ত্র প্রভাব বিস্তারকারী একটি চক্রের সদস্য ছিলেন।
গত শুক্রবার (১০ জুলাই) রাত আনুমানিক ৮টার দিকে ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের চরকাশিম গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। অভিযোগ অনুযায়ী, বাজার থেকে বাড়ি ফেরার পথে ধারালো দেশীয় অস্ত্র নিয়ে একদল দুর্বৃত্ত মাসুম বকাউলের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। এতে তাঁর দুই পাসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর জখম হয়। স্থানীয়রা তাঁকে উদ্ধার করে প্রথমে মতলব উত্তর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করেন। পরে অবস্থার অবনতি হলে ঢাকার জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান (পঙ্গু হাসপাতাল)-এ স্থানান্তর করা হয়।
এ ঘটনায় আহতের বাবা জামাল বকাউল মতলব উত্তর থানায় একটি লিখিত এজাহার দিয়েছেন। এতে একই গ্রামের বিএনপি নেতা শিপন খান, তাঁর ছেলে শামীম খানসহ ১০ জনকে আসামি করা হয়েছে।
মতলব উত্তর থানার পুলিশ জানায়, প্রাথমিকভাবে তাদের ধারণা, পূর্বশত্রুতা ও স্থানীয় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করেই এ হামলার ঘটনা ঘটেছে। তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে কোনো কারণ বলা সম্ভব নয়।
এদিকে ঘটনার পর স্থানীয়ভাবে নতুন করে আলোচনায় এসেছে মাসুম বকাউলের অতীত কর্মকাণ্ড। স্থানীয় বাসিন্দাদের একটি অংশের দাবি, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তিনি সাবেক মন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়ার ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত আওয়ামী লীগ নেতা সিদ্দিক বকাউল ও গফুর বাদশার অনুসারী হিসেবে এলাকায় প্রভাব বিস্তার করতেন। তাদের অভিযোগ, তাঁর বিরুদ্ধে মেঘনা নদীতে চুরি, ডাকাতি, অবৈধ বালু উত্তোলন, সাধারণ মানুষের ওপর নির্যাতন, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বাড়িঘরে হামলা ও লুটপাটসহ বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া চাঁদপুর ও মুন্সীগঞ্জের বিভিন্ন আদালতে তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মামলাও বিচারাধীন রয়েছে বলে স্থানীয়রা দাবি করেন।
তবে মাসুম বকাউলের পরিবার ও তাঁর অনুসারীরা এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন। তাদের দাবি, এসব অভিযোগ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং বর্তমান হামলার ঘটনাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা।
অন্যদিকে, মামলায় অভিযুক্ত বিএনপি নেতা শিপন খান তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগকে “মিথ্যা ও সাজানো” বলে দাবি করেছেন। তাঁর ভাষ্য, মাসুম বকাউল ও তাঁর সহযোগীরা দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিলেন। তিনি অভিযোগ করেন, ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে তাঁর বাড়িতে হামলা চালিয়ে নারী-পুরুষসহ অন্তত ২৫ জনকে আহত করার ঘটনাতেও মাসুম জড়িত ছিলেন। এছাড়া স্থানীয় প্রবীণ ব্যক্তিদের বাড়িতে হামলা এবং একটি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষককে পদত্যাগে বাধ্য করার ঘটনাতেও একই চক্রের সম্পৃক্ততা ছিল বলে তিনি দাবি করেন।
এই ঘটনার পর চরকাশিম ও আশপাশের এলাকায় উদ্বেগ বাড়ছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকের আশঙ্কা, অতীতে রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে সক্রিয় থাকা বিভিন্ন পক্ষ এখন নতুন রাজনৈতিক পরিচয়ে এলাকায় প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে। ফলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না আনলে নতুন করে সংঘর্ষের আশঙ্কা রয়েছে বলে তারা মনে করছেন।
মতলব উত্তর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. কামরুল হাসান বলেন, ঘটনাস্থল পরিদর্শন করা হয়েছে। লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেছে। প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন এবং জড়িতদের শনাক্ত করতে পুলিশ কাজ করছে। তদন্ত শেষে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বর্তমানে চরকাশিমসহ আশপাশের এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। স্থানীয়রা নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রকৃত দোষীদের আইনের আওতায় আনা এবং চরাঞ্চলে স্থায়ী শান্তি নিশ্চিত করতে প্রশাসনের কার্যকর উদ্যোগ দাবি করেছেন।
ফম/এমএমএ/



