কচুয়া (চাঁদপুর) : চাঁদপুরের কচুয়া উপজেলার একটি বেসরকারি হাসপাতালে কর্মরত এক নারী চিকিৎসককে দীর্ঘদিন ধরে যৌন হয়রানি, ইভটিজিং ও অপপ্রচারের অভিযোগ উঠেছে। অভিযুক্ত পুরুষ চিকিৎসক ডা. সৈয়দ আসিফ ইশতিয়াক হানি (যিনি দাপ্তরিক নথিতে ডা. সৈয়দ আসিফ ইষ্পাহানী নামেও পরিচিত) ওই হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার এবং চর্মরোগ সার্জন হিসেবে কর্মরত। তার বিরুদ্ধে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি বা প্রশিক্ষণ ছাড়াই ঝুঁকিপূর্ণ এনেস্থেসিয়া প্রদান এবং হাসপাতালের রুমে বসে ইয়াবা সেবনের মতো গুরুতর অভিযোগ এনেছেন ভুক্তভোগী নারী চিকিৎসক।
এই ঘটনায় ভুক্তভোগী নারী চিকিৎসক ছদ্মনামী রূপা গত ৬ আগস্ট ২০২৬ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা বরাবর লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগের প্রেক্ষিতে ইতিমধ্যে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে কঠোর আইনি নির্দেশনা প্রদান করেন।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, অভিযুক্ত ডা. সৈয়দ আসিফ ইশতিয়াক হানি গত প্রায় দেড় বছর ধরে ডায়াগনস্টিক সেন্টারে কর্মরত নারী চিকিৎসকে বিভিন্ন উপায়ে উত্ত্যক্ত ও হয়রানি করে আসছিলেন। বিবাহিত হওয়া সত্ত্বেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কুপ্রস্তাব পাঠানো এবং নিজের স্ত্রীর প্রতি অসন্তুষ্টির কথা বলে প্রেমের প্রস্তাব দেন তিনি।
এতে ভুক্তভোগী নারী চিকিৎসক কোনো সাড়া না দেওয়ায় অভিযুক্ত ডা. সৈয়দ আসিফ ক্ষিপ্ত হয়ে তাকে ‘অহংকারী’ ও ‘দাম্ভিক’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন এবং বিভিন্ন স্থানে তার বিরুদ্ধে মানহানিকর ও কুরুচিপূর্ণ তথ্য ছড়াতে শুরু করেন। এছাড়া তিনি হাসপাতালের অন্যান্য স্টাফ ও পার্শ্ববর্তী আরেকটি হাসপাতালের এক নারী চিকিৎসকের কাছেও উদ্দেশ্যেমূলকভাবে সম্মানহানিকারী নানা কথা রটান বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
ভুয়া এনেস্থেসিয়া ও মাদকাসক্তির গুরুতর অভিযোগ
অভিযোগে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে যে, অভিযুক্ত ডা. সৈয়দ আসিফ এনেস্থেসিয়া বিষয়ে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ট্রেনিং বা ডিগ্রিধারী না হওয়া সত্ত্বেও নিয়মিত বিভিন্ন অপারেশনে এনেস্থেসিয়া প্রদান করে আসছেন, যা সাধারণ রোগীদের জীবনের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। এছাড়া তিনি হাসপাতালের নিজ কক্ষেই বসে নিয়মিত ইয়াবা সেবন করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। হাসপাতালের মালিকপক্ষ বিষয়টি অবগত থাকা সত্ত্বেও তুলনামূলক কম বেতনে চাকরি করার সুবাদে তাকে কোনো বাধা দিচ্ছেন না এবং ওটিতে (অপারেশন থিয়েটার) রোগীদের সাথে অত্যন্ত দুর্ব্যবহার করে থাকেন।
অভিযোগ পাওয়ার পর নড়েচড়ে বসেছে উপজেলা স্বাস্থ্য প্রশাসন। গত ৬ আগস্ট ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দের স্মারক নং-উস্বাস্থ্যকমচ/কচুয়া/চাঁদ/
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ সোহেল রানা স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, ডা. সৈয়দ আসিফ ইষ্পাহানীর এনেস্থেসিয়া প্রদানের কোনো বৈধ ডিগ্রি বা সার্টিফিকেট না থাকায়, যোগ্যতার প্রমাণস্বরূপ সার্টিফিকেট অবিলম্বে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার কার্যালয়ে দাখিল করতে হবে।
নির্দেশনার ব্যত্যয় ঘটলে অভিযুক্ত চিকিৎসকের বিএমডিসি (BMDC) সনদ বাতিলসহ বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। অভিযুক্ত বেসরকারি ক্লিনিক বা ডায়াগনস্টিক সেন্টারের লাইসেন্স বাতিল এবং প্রতিষ্ঠান সিলগালা করা হবে।
এবিষয়ে ভুক্তভোগী নারী চিকিৎসক গাইনী এন্ড অবস্ ছদ্মনামী রূপা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে যৌন হয়রানি, ইভটিজিং ও অপপ্রচারের চালিয়ে আসছে আমার বিরুদ্ধে ডাঃ সৈয়দ আসিফ। হাসপাতালের মালিকপক্ষ বিষয়টি অবগত থাকা সত্ত্বেও তাকে কোনো বাধা দিচ্ছেন না এবং ওটিতে (অপারেশন থিয়েটার) রোগীদের সাথে অত্যন্ত দুর্ব্যবহার করে থাকেন। তার বিরুদ্ধে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি বা প্রশিক্ষণ ছাড়াই ঝুঁকিপূর্ণ এনেস্থেসিয়া প্রদান এবং হাসপাতালের রুমে বসে ইয়াবা সেবনের মতো গুরুতর অভিযোগ এনেছেন ভুক্তভোগী নারী চিকিৎসক। তার ডোপ টেস্ট করার আহ্বান জানিয়েছি এবং আমি এর সঠিক বিচার চাই।
অভিযুক্ত পুরুষ চিকিৎসক ডা. সৈয়দ আসিফ ইষ্পাহানী বলেন, এনেস্থেসিয়া বিষয়ে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ট্রেনিং বা ডিগ্রিধারী লাগে না। শুধুমাত্র রোগীদের স্বার্থে আমাকে এনেস্থেসিয়া ও সিজার অপারেশন দুইটাই করতে হয়। আমি একজন ডাক্তার যেকোন রোগীকে এনেস্থেসিয়া দেয়া যায়।
মাদক, যৌন হয়রানি, ইভটিজিং ও অপপ্রচারের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি আরও বলেন, আমি হালকা পাতলা মাদকসেবক করি ঠিক, কিন্তু কোন মাদকাসক্তি না। আজ থেকে দেড় বছর আগে তাঁর সঙ্গে আমার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কথোপকথন হয়েছে। কোনো প্রকার যৌন হয়রানি ও ইভটিজিংয়ের কথোপকথন হয়নি।
এ বিষয়ে কচুয়া সিটি হসপিটাল এন্ড ডিজিটাল ডায়াগনস্টিক সেন্টারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক দিপু চন্দ্র সরকার বলেন, বিষয়টি নিয়ে কাল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দু’পক্ষের সাথে বসা হবে। নারী চিকিৎসকের আনা অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে, হসপিটালে বসে মাদক সেবন করে ডাক্তার এবং কুপ্রস্তাব দেয়া এমন তথ্য জানতে চাইলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যান।
এ বিষয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ সোহেল রানা জানান, নারী চিকিৎসকের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং চিকিৎসা খাতের অনিয়ম রোধে এ ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। খুব শীঘ্রই এ বিষয়ে আরও কঠোর প্রশাসনিক ও আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ফম/এমএমএ/



