হাজিরা খাতায় মা উপস্থিত থাকলেও শ্রেণি কক্ষে ক্লাস নিচ্ছেন ছেলে

চাঁদপুর : শিক্ষক হাজিরা খাতায় মায়ের স্বাক্ষর থাকলেও শ্রেণি শিক্ষা কার্যক্রমে উপস্থিত সদ্য আলিম শ্রেণিতে ভর্তি হওয়া ছেলে। মায়ের হয়ে শিক্ষার্থীদের ক্লাস নিচ্ছেন তিনি। অজুহাত মায়ের অসুস্থতা। যদিও অসুস্থ ওই শিক্ষিকা নিয়মিত স্কুলে এসে হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করেন। ঘটনাটি চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলার ১৫২ নম্বর দক্ষিণ বদরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের।

কয়েকজন অভিভাবক জানান, গত কয়েক মাস ধরেই মাঝেমধ্যে বিদ্যালয়ে শিক্ষিকার পরিবর্তে তাঁর ছেলেকে পাঠদান করতে দেখা যাচ্ছে। অভিভাবকদের প্রশ্ন? একজন সদ্য দাখিল পাস করা শিক্ষার্থী কীভাবে একটি সরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষকতার দায়িত্ব পালন করেন?

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, শিক্ষিকা ফাতেমা বেগম অসুস্থতাজনিত কারণে দেশে ও দেশের বাইরে চিকিৎসা নিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে চিকিৎসাজনিত কারণে বিভিন্ন সময়ে বিশ্রামে ছিলেন। তবে এই সময়ে তিনি সরকারি বিধি অনুযায়ী ছুটি নিয়েছিলেন কিনা, সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো তথ্য দিতে পারেননি তিনি। সে সময়েও তাঁর ছেলেকে দিয়ে পাঠদান করিয়েছেন বলে স্বীকার করেছেন মিরাজুন্নবী সিয়াম নিজেই।

সম্প্রতি ওই শিক্ষিকার পরিবর্তে সিয়ামের পাঠদানের দিনগুলোতে হাজিরা খাতায় ঠিকই ওই শিক্ষিকার স্বাক্ষর ছিল এবং শ্রেণিতে পাঠদান না করালেও প্রতিদিনই স্কুলে এসে শিক্ষক হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করার বিষয়টি নিশ্চিত করেন ফাতেমা বেগমের সহকর্মীরা। যদি তিনি সত্যিই অসুস্থতার কারণে শ্রেণিপাঠদান করাতে না পারেন, তবে কিভাবে তিনি স্বাক্ষর দেওয়ার জন্য স্কুলে আসেন? শারীরিক অসুস্থতার কারণে পাঠদানে অক্ষম হলে, তবে কেন তিনি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে অবগত করে ছুটি নেননি?

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় থেকেই দীর্ঘদিন ধরে এমন অনিয়ম চালিয়ে আসছেন ওই শিক্ষিকা। কেউ কেউ বলেন, শিক্ষিকার এক প্রভাবশালী আইনজীবী আত্মীয় থাকায় প্রশাসনিকভাবে বিষয়টি গুরুত্ব পায়নি।

নাম প্রকাশ করা হবে না এই শর্তে এক অভিভাবক বলেন, একজন অভিজ্ঞ শিক্ষকের জায়গায় সদ্য দাখিল পাস করা ছেলে যদি ক্লাস নেয়, তাহলে শিশুদের শিক্ষার মান কীভাবে নিশ্চিত হবে?

শিক্ষিকা ফাতেমা বেগম বলেন, আমার অসুস্থতার কারণে ছেলে ক্লাস নিচ্ছে। তাঁর ছেলের ক্লাস করানো যথার্থ হচ্ছে কিনা এমন প্রশ্নের বিপরীতে তিনি কোনো উত্তর দিতে পারেননি। যদি অসুস্থ হয়েই থাকেন, তবে কেন ছুটি নিলেন না। এ প্রশ্নের বিপরীতেও তিনি কোনো উত্তর দিতে পারেননি। ফের প্রশ্ন করা হয়, আপনি স্কুলে এসে হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করেন, তার বিপরীতে আপনার ছেলে অপরিপক্বভাবে পাঠদান করছেন, এটি নিয়মবহির্ভূত এবং স্পষ্ট প্রতারণা কিনা? এমন প্রশ্ন করতেই তিনি প্রতারণার কথা স্বীকার করে বলেন, আমার ভুল হয়ে গেছে।

পঞ্চম শ্রেণির ইংরেজি ক্লাস শেষ করে শ্রেণিকক্ষ থেকে বের হলে, মিরাজুন্নবী সিয়ামকে জিজ্ঞেস করা হয়, তিনি একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শ্রেণিপাঠদান করাতে পারেন কিনা। এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, মায়ের অসুস্থতার জন্য আমি ক্লাস নিচ্ছি। গত বছরও মায়ের অসুস্থতার সময় প্রায় দেড়-দুই মাস আমি ক্লাস করিয়েছি। এখন আবার অসুস্থ, তাই এখন ক্লাস করাচ্ছি।

মিরাজুন্নবী সিয়ামকে দিয়ে শ্রেণিপাঠদানের বিষয়ে জানতে দক্ষিণ বদরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ফারহানা আক্তারের বক্তব্যের জন্য যাওয়া হলে, গণমাধ্যমের উপস্থিতি টের পেয়ে তড়িঘড়ি করে মুঠোফোনে কেউ একজনকে কল দেন। এরপর মুঠোফোনে কথা বলা শেষ হলে, মিরাজুন্নবী সিয়াম ক্লাস করার অনুমতি তিনি দিতে পারেন কিনা, এমন প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, আমি এ বিষয়ে কিছু বলতে পারবো না।

ফরিদগঞ্জ উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার শিরিন সুলতানা এই বিষয়ে বলেন, শিক্ষিকার পরিবর্তে ছেলে ক্লাস নেওয়ার বিষয়টি জেনেছি, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
চাঁদপুর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মুহাম্মদ মোছাদ্দেক হোসেন বলেন,  গণমাধ্যম কর্মীর মাধ্যমে বিষয়টি জেনেছেন। এটার তদন্ত করা হবে, সত্যতা পাওয়া গেলে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের বিভাগীয় উপ-পরিচালক মো. নুরুল ইসলাম বলেন, আমি চাঁদপুর জেলা কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলবো, যেন তিনি এ ব্যাপারে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করেন।

ফম/এমএমএ/

সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট | ফোকাস মোহনা.কম