হত্যার বিচারের দাবী ফরিদগঞ্জের শহীদ মানিক পরিবারের

ছবি: সংগ্রহীত।

চাঁদপুর: গেল বছর ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর রাজধানীর উত্তরা পূর্ব থানার সামনে বিজয় মিছিলে গিয়ে শহীদ হন বিক্রয় কর্মী আবদুল কাদির মানিক (৪৩)।

তিনি চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলার বালিথুবা পূর্ব ইউনিয়নের পূর্ব মানিকরাজ গ্রামের বাইনের বাড়ির মৃত নুর মোহাম্মদের ছেলে। গুলিতে মানিকের মাথার একাংশ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এই হত্যাকান্ডের বিচার দাবী করেছেন শহীদ মানিকের পরিবার।

ফরিদগঞ্জ-চান্দ্রা সড়কের পাশে শহীদ মানিকদের গ্রাম। ইটের সড়ক দিয়ে যাওয়া হয় তার বাড়িতে। বাড়ির পাশের পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়েছে। বাড়িতে থাকেন মানিকের মা, স্ত্রী ও সন্তানরা। পৈত্রিক ভিটা তিন শতক জমির উপর মানিকের ঘর। এর বাইরে তার আর কোন সম্পত্তি নেই।

শহীদ আবদুল কাদির মানিক পেশায় একজন বিক্রয় কর্মী। বেশ কয়েক বছর রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছেন। সর্বশেষ রাজধানীর উত্তরা দিয়া বাড়ী শাহী স্ট্রীল নামের প্রতিষ্ঠানে বিক্রয় কর্মী হিসেবে কর্মরত ছিলেন। মানিক তাদের গ্রাম মানিকরাজ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে ৫ম শ্রেনী ও স্থানীয় চান্দ্রা ইমাম আলী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ৮ শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশোনা করছে। এরপর আর আর্থিক অনটনের কারনে লেখা পড়া করতে পারেনি।

স্বজনদের সাথে কথা বলে জানাগেল, মানিকের বাবা নুর মোহাম্মদ ১২ বছর আগে মারাগেছেন। তিনি পেশায় ছিলেন কৃষক। মানিকের ৫ ভাই ও ৩ বোন। ভাই বোনদের মধ্যে মানিক তৃতীয়। বড় ভাই মিজানুর রহমান (৫০) বিয়ে করে হাজীগঞ্জ অলিপুর গ্রামে শশুর বাড়িতে থাকেন। পেশায় তিনি কৃষক। বাকী ছোট ভাই ইয়াছিন আলম (৪১), খোরশেদ আলম (৩৯) ও জাকির হোসেন (৩৭) কৃষি কাজ করেন। বোন আয়েশা আক্তার (৪৭), কুলসুমা( ৩৫) ও রাহিমা আক্তার সীমার (৩৩) বিয়ে হয়েছে। তারা শশুর বাড়িতে থাকেন। মানিকের মা তার বাবার ঘরে থাকেন একা। মানিকের স্ত্রী রাহিমা আক্তার থাকেন স্বামীর তৈরী করা আরেকটি টিনের ঘরে।

শহীদ মানিক সামাজিক ও পারিবারিকভাবে ২০০৫ সালে বিয়ে করেছেন পাশবর্তী রাজাপুর গ্রামের খলিফা বাড়িতে। তার শশুর আরশাদ খলিফা। তিনি পেশায় কৃষক। শশুড়ি আনোয়ারা বেগম গৃহিনী। মানিকের তিন সন্তান। বড় মেয়ে জোহরা আক্তার মানিকরাজ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পঞ্চম শ্রেনীতে পড়ে। বয়স (১১)। একই বিদ্যালয়ে প্রথম শ্রেণীতে পড়ে ছোট মেয়ে জান্নাতুল মাওয়া (৭)। আর একমাত্র ছেলে মোস্তাকিম হোসেন। তার বয়স ৫বছর।

মানিকের মা ফাতেমা বেগম বলেন, ‘গুলিতে আমার ছেলের মাথার একাংশ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে রে বাপ, কি বলবো, আমার ভদ্র ও শান্ত ছেলে আন্দোলনে গিয়ে গুলি খাই মরলো।’ ছেলে আমার ছুটি পেলে বাড়িতে আসত। সর্বশেষ গত ঈদুল আজহার ছুটিতে এসে ১২ দিন বাড়িতে ছিল। এরপর কর্মস্থলে চলে যায়। ৫ আগস্ট দুপুর ১২টার দিকে আমার সাথে কথা হয় ফোনে। আমার শারিরীক অবস্থার খোঁজ খবর নেন। ওই দিন কি কারণে আমার ছেলে ফোনে বার বার বলেছে মা আমার ছেলেকে দেখে রাইখেন। এরপর আর কথা হয়নি ছেলের সাথে। এখন এই অবুঝ সন্তানদের কি হবে বলে কাঁদতে থাকেন তিনি।

মানিকের মেয়ে জোহরা ও জান্নাতুল মাওয়া বলেন, বাবা আমাদের সাথে প্রায়দিনই কথা বলতেন। পড়ার জন্য বলতেন। বলতেন আমরা যেন মায়ের কথা শুনি। এই দুই অবুঝ শিশুর সাথে কথা বলে বুঝাগেল তারা এখনো বাবার শূন্যতা অনুভব করতে পারেনি। একমাত্র ছেলে মোস্তাকিম ওই সময় ঘরে ঘুমিয়ে ছিলো।

মানিকের স্ত্রী রাহিমা আক্তার কান্না জড়িত কন্ঠে বলেন, আমার স্বামী খুব ভদ্র ও বিনয়ী মানুষ ছিলেন। ৫ আগস্ট মোবাইল ফোনে সকাল সাড়ে ৭টায় একবার এবং ১০টায় আরেকবার কথা হয় তার সাথে। ১০টায় ফোন দিয়ে তিনি বলেন-বিকাশে ২ হাজার টাকা দিয়েছেন, উঠিয়ে যেন বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করি। এরপর আর কথা হয়নি। বিকাল ৩টার দিকে খবর পান তিনি উত্তরা পূর্ব থানার সামনে বিজয় মিছিলে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলে মারাগেছেন। ৬ আগষ্ট ভোরে ওই এলাকার লোকজন তার লাশ গাড়িতে করে বাড়িতে নিয়ে আসেন। দুপুর ১২টার দিকে বাড়িতে নামাজে জানাজা শেষে পারিবারিক কবর স্থানে দাফন করা হয়।

তিনি আরো বলেন, আমার স্বামীর দাফনের পরে কর্মস্থল এলাকা থেকে লোকজন ফোন করে যাওয়ার জন্য। সেখানে গেলে জামায়াতের লোকজন ১ লাখ টাকা আর্থিক সহায়তা দেয়। আর স্থানীয় এসএম জাহাঙ্গীর নামে ব্যাক্তি হত্যার ঘটনায় মামলা করার জন্য বলে। তার সহযোগিতায় থানায় হত্যা মামলা রুজু করা হয়েছে।

রাহিমা বলেন, ফরিদগঞ্জ উপজেলা বিএনপির এমএ হান্নান সাহেব ৫০ হাজার, দলীয় আরেক নেতা ১০ হাজার এবং সাবেক এমপি লায়ন হারুনুর রশিদ ২০ হাজার টাকা সহযোগিতা করেন। এর বাইরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে ১০ টাকা ও কিছু ফল দিয়েগেছেন। এছাড়াও জুলাই ফাউন্ডেশন থেকে ৫ লাখ, জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ২লাখ এবং সর্বশেষ জুলাই ফাউন্ডেশন থেকে ১০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র দেয়া হয়েছে।

মানিকের ছোট ভাই আলম বলেন, গেল বছর সেপ্টেম্বর মাসে থানা থেকে পুলিশ এসেছে। তাদের সাথে কয়েকজন ছাত্রও ছিলো। পুলিশ এসে আমাদের নানা বিষয়ে খোঁজ খবর নিয়েছে এবং আমার ভাবি এবং মায়ের সাথে কথা বলেছে। তার কয়েকদিন পরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার অফিস থেকে লোক আসছে খোঁজ নিতে।

শহীদ মানিকের মা ফাতেমা বেগম ও তার স্ত্রী রাহিমা সহ পরিবারের সদস্যরা এই হত্যার তদন্তপূর্বক বিচার দাবী করেন।
ফম/এমএমএ/

সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট | ফোকাস মোহনা.কম