।। এস ডি সুব্রত।। রোজা হচ্ছে ফারসি শব্দ। এর আরবী অর্থ হচ্ছে সওম।বহুবচনে যা সিয়াম। সওম বা সিয়ামের বাংলা অর্থ হচ্ছে বিরত থাকা। ইসলামী শরীয়ত অনুযায়ী সওম বা রোজা হল আল্লাহর নির্দেশ পালনের উদ্দেশ্যে নিয়তসহ সুবেহ সাদিকের পর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার ও স্ত্রী সহবাস থেকে বিরত থাকা। রোজা রাখার নিয়ম সবযুগেই প্রচলিত ছিল।আদি মানব সর্ব প্রথম নবী হজরত আদম ( আ.) থেকে শুরু করে সর্ব শেষ নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) পর্যন্ত নবী রাসুলগণ রোজা পালন করেছেন।
রোজা কেবল নবী করীম ( সা)এর প্রতি ফরজ করা হয়নি, পূর্ববর্তী নবী রাসুল দের প্রতিও ফরজ করা হয়েছিল। হজরত আদম ( আ) থেকে হজরত নুহ(আ) পর্যন্ত চান্দ্র মাসের ১৩,১৪ ও ১৫ তারিখ রোজা ফরজ ছিল যাকে ‘ আইয়ামে বিজ’ বলা হতো। ইসলামের প্রাথমিক যুগে তিন দিন রোজা রাখার নিয়ম ছিল। হজরত মুসা( আঃ) তুর পাহাড়ে আল্লাহর কাছে থেকে তাওরাত প্রাপ্তির আগে ৪০ দিন পানাহার ত্যাগ করেছিল।হজরত ঈসা(আ) তার ধর্ম প্রচারের শুরুতে ইঞ্জিন পাওয়ার আগে ৪০ দিন রোজা রেখেছিলেন। খ্রিস্টানদের উপর মুসলমানদের মতো রোজা রাখার ফরজ ছিল।
বাইবেলে রোজা ব্রত পালনের মাধ্যমে আত্মশুদ্ধি ও কঠোর সংযম সাধনার সন্ধান পাওয়া যায়। এছাড়া অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের মাঝেও রোজা পালনের ধারা অব্যাহত ছিল। সনাতন ধর্মে রোজা বা উপবাস পালনের বিখ্যাত উৎসব হচ্ছে বৈকুণ্ঠ একাদশী যা দেবতা বিষ্ণুর সাথে সম্পর্ক। বৌদ্ধ ধর্মে সপ্তাহে একদিন অষ্টবিধান অনুসরন করতে বলা হয়েছে যাতে দুপুর থেকে পরদিন সকাল পর্যন্ত উপবাস বা রোজা র বিধান রয়েছে। কোরআন ও হাদিসের গবেষণা থেকে রোজার যতটুকু ইতিহাস থেকে রোজার যতটুকু ইতিহাস জানা যায় ,মহান আল্লাহ তায়ালা হজরত আদম (আ)কে জান্নাতে প্রেরণ করে একটি গাছের ফল খেতে নিষেধাজ্ঞা জারি করে বিশেষ এক ধরনের রোজা রাখার নির্দেশ প্রদান করেন।
এ ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালা মহাগ্রন্থ আল কোরআনে ইরশাদ করেছেন…. হে আদম! তুমি এবং তোমার স্ত্রী জান্নাতে বসবাস করতে থাক এবং সেখান থেকে যা চাও পরিতৃপ্তি সহ খেতে থাক। কিন্তু তোমরা এ গাছের কাছে যেওনা । যদি যাও বা তার ফল ভক্ষণ কর তাহলে জালিমদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে।( সুরা বাকারা,আয়াত ৩৫) ।মুফাসসিরে কেরাম বলেন ,এটাই ছিল মানব ইতিহাসের প্রথম রোজা। হজরত আদম (আ.) ও হজরত হাওয়া (আ.) শয়তানের প্ররোচনার শিকার হয়ে ঐ গাছের ফল ভক্ষণ করেছিল এবং পরিনামে মহান আল্লাহ তায়ালা তাদের ভূপৃষ্ঠে পাঠিয়ে দেন। অতঃপর তারা উক্ত ভুলের জন্য যারপরনাই অনুতপ্ত হন । তওবা ইস্তিগফার করেন এবং এর কাফকাস্বরুপ ধারাবাহিক চল্লিশ বছর রোজা রেখেছিলেন।
রমজান মাসে রোজা ফরজ হওয়া সম্পর্কে পবিত্র কোরআন এ আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন ” ওহে ঈমানদারগন! তোমাদের জন্য রোজা ফরজ করা হয়েছে যেমন তোমাদের পূর্ববর্তী দের উপর ফরজ করা হয়েছিল।যেন তোমরা খোদাভীতি অর্জন করতে পারো।” (সুরা আল বাকারা,আয়াত ১৮৩) । পবিত্র রমজান মাস মুসলমানদের রোজার জন্য নির্ধারিত। রোজার অন্তর্নিহিত তাৎপর্য এই যে , এটা নারী পুরুষের মনকে প্রশিক্ষণ দেয় এবং তাদের নৈতিক মূল্যবোধকে উন্নত করে ।
রোজা সংযমের মাধ্যমে রিপু দমন করে এবং রোজাদারদের দেহমনের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে রোজা নরনারীকে স্বার্থ পরতা ও জাগতিক মন্দ চিন্তা ভাবনা থেকে বিরত রাখে । প্রাথমিক ভাবে রোজা হচ্ছে একটি আত্মিক অনুশাসন ,নিয়মশৃখলাপূর্ণ ইবাদত। রোজার উদ্দেশ্য হচ্ছে আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি অর্জন। রোজার বহুবিধ শারীরিক উপকারিতাও রয়েছে।রোজা রোজাদার কে স্বাস্থ্যের উন্নতি ও দৈহিক সুস্থতা দান করে। মানব পরিপাক অঙ্গের ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। পরিপাকতন্ত্রের বিশ্রামের ফলে কর্মের শক্তি ও ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।রোজায় দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। রোজা কঠিন কাজের দীক্ষা নিতে সহায়তা করে।রোজা রাখার ফলে অর্ধাহারে অনাহারে থাকা মানুষের দুঃখ অনুধাবন হয় এবং এবং রোজাদারদের অন্তরে সাহায্য সহানুভূতি র উদ্রেক করে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন যখন রমজান মাস উপনীত হয় তখন জান্নাতের দরজা সমূহ উন্মুক্ত হয় এবং জাহান্নামের দরজা সমূহ বন্ধ করে দেয়া হয় এবং শয়তানকে জিঞ্জিরা বদ্ধ করা হয়। রোজার চুড়ান্ত লক্ষ্য হচ্ছে স্রষ্টার ঐশী আনন্দ অন্বেষণ করা,তার অনুগ্রহ ক্ষমা দয়া পাওয়া এবং নরকাগ্নি থেকে নিস্কৃতি পাওয়া। মাহে রমজানের রোজা সমগ্র মুসলিম বিশ্বে সাম্য , মৈত্রী,ঐক্য , সংযম ও সহনশীলতা প্রদর্শনের শিক্ষা দেয়। মানুষ কে ত্যাগে উদ্ধদ্ধু করে এবং আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান করে ।
অপর হাদিসে আছে……হজরত সাহ্ন ইবনে সাঈদ (রা) থেকে বর্ণিত।নবী করীম (সা.) এরশাদ করেছেন, “বেহেশত এর ৮ টি দরজা রয়েছে।এর মধ্যে একটি দরজার নাম রাইয়ান। রোজাদার ব্যাতীত আর কেউ ঐ দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে পারবে না” । রাসুল (সা) বলেছেন ….. আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেছেন , রোজা ছাড়া আদম সন্তানের প্রত্যেক টি কাজই তার নিজের জন্য । তবে রোজা আমার জন্য। আমি নিজেই এর পুরস্কার দেব।
লেখক: কবি ও প্রাবন্ধিক।
সুনামগঞ্জ।
০১৭১৬৭৩৮৬৮৮ ।
sdsubrata2022@gmail.com



