নিরাপদ সড়ক : সমন্বিত কৌশল দরকার

বাড়ছে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা

নিরাপদ সড়কের দাবিতে যত আন্দোলন হয়েছে, যত আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে, যত সুপারিশ এসেছে, সম্ভবত আর কোনো বিষয়ে তা হয়নি। শিক্ষার্থীদের ব্যাপক আন্দোলনের মুখে সাত বছর ঝুলে থাকার পর ‘সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮’ পাস হয়। কিন্তু এতে সড়ক যে নিরাপদ হয়নি তার প্রমাণ আমরা প্রতিনিয়ত পাচ্ছি। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত নভেম্বর মাসে সারা দেশে ৪৬৩টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৫৫৪ জন নিহত হয়েছে।

এসব দুর্ঘটনায় অন্তত ৭৪৭ জন আহত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ১৯৪টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে ২২৯ জন, যা মোট নিহতের ৪১.৩৪ শতাংশ। মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার হার ৪১.৯০ শতাংশ। হিসাব অনুযায়ী নভেম্বর মাসে দুর্ঘটনা বেড়েছে ৮.৪৩ শতাংশ এবং প্রাণহানি বেড়েছে ১৪.৯৩ শতাংশ। নভেম্বর মাসে প্রতিদিন গড়ে নিহত হয়েছে ১৯ জন।

গত জুলাই মাসে রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের প্রতিবেদনে বলা হয়, জুন মাসে সারা দেশে ৪৬৭টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৫২৪ জন নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে ৮২১ জন। নিহতের মধ্যে ৬৮ নারী, ৭৩ শিশু ও ৭৮ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। সবচেয়ে বেশি মারা গেছে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায়। গত সেপ্টেম্বর মাসে শুধু মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১৬৯ জন নিহত হয়েছে। একটি বেসরকারি সংস্থার তথ্য বলছে, মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় বছরে স্থায়ীভাবে পঙ্গু হচ্ছে এক হাজার ২০০ মানুষ।

বিশেষজ্ঞরা মোটরসাইকেলকে অভিশাপ বলছেন। গবেষক ও পরিবহন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, মোটরসাইকেল বাহন হিসেবে আকর্ষণীয় হলেও ঝুঁকিপূর্ণ। আর সেই ঝুঁকির শীর্ষে রয়েছে দেশের তরুণসমাজ। দেশের পাবলিক পরিবহন ব্যবস্থার সীমাহীন ব্যর্থতা, অদক্ষতা ও দুর্বলতা ঝুঁকির মাত্রা কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু সেই ঝুঁকি মোকাবেলায় সরকারি-বেসরকারি কোনো উদ্যোগ নেই। বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো দেশের গণপরিবহন ব্যবস্থা ব্যর্থ হলে সেখানে ব্যক্তিগত পরিবহন ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীলতা বাড়ে। আর পরিবহন ব্যবস্থায় ব্যক্তিগত পরিবহন যখন বেশি হারে বাড়ে, তখন দুর্ঘটনার সংখ্যাও বাড়ে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তা-ই ঘটছে। যানবাহন বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে দুর্ঘটনা যেমন বাড়ছে, তেমনি মোটরসাইকেল বৃদ্ধির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে দুর্ঘটনা ও হতাহতের সংখ্যাও। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের সড়ক ও সড়ক ব্যবস্থাপনাও মোটরসাইকেল ব্যবহারের উপযোগী নয়।

সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির দিক থেকে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান প্রথম দিকের ১৫টি দেশের মধ্যে। জাতিসংঘে বাংলাদেশ অঙ্গীকার করেছিল, ২০১১ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনা অর্ধেকে নামিয়ে আনবে। কিন্তু দুর্ঘটনা ও হতাহতের ঘটনা কমছে না।

সরকারের এখানে অনেক করণীয় আছে। পাশাপাশি নিরাপদ সড়কের জন্য সমন্বিত একটি কার্যকর কৌশল প্রণয়নে সংশ্লিষ্ট সবার দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা দরকার। সড়ক নিরাপত্তার জন্য আরো অনেক ক্ষেত্রেই নজর দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। দুর্ঘটনা কমাতে পদক্ষেপ নেওয়ার পাশাপাশি আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। এতে সড়কে শৃঙ্খলা ফিরে আসবে এবং মৃত্যু কমে আসবে, এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

লেখা: সংগ্রহীত।

ফোকাস মোহনা.কম