
ছবি: সংগ্রহীত।
।। মোহাম্মদ ওমর ফারুক দেওয়ান ।। ১৯৭৯ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, বীর উত্তম চাঁদপুর সফর করেন। সফরকালে আমার প্রিয় গ্রামের পশ্চিম দিক দিয়ে বয়ে যাওয়া প্রায় দীর্ঘ দশ কিলোমিটার খাল খননের উদ্বোধন করেন যা কালের স্বাক্ষী হয়ে আজও ক্ষীণকায় বয়ে চলেছে। ডাকাতিয়া নদীর পানি দিয়ে শুষ্ক মৌসুমে চাঁদপুর সদর ও মতলবের কৃষকদের পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে এ খাল খনন করা হয়।
খাল খননের কাজে জিয়াউর রহমানের আগমন ও সে সময়ের অনুভূতি নিয়ে বিএনপির স্থানীয় নেতা শাহজালাল দেওয়ানের পিতা ও আমার ছোট দাদা প্রয়াত মুসলিম দেওয়ানের কাছে একবার জানতে চাইলাম। কারণ তিনি এবং আমার পিতা তখন টগবগে যুবক। তাছাড়া দাদা তখন স্থানীয় মাতাব্বর। দাদা তখন স্থানীয় পর্যায়ে গ্রামের মানুষের দুঃখ দুর্দশার কথা তুলে ধরে বললেন, মানুষ তিনবেলা খেতে পেতো না। কিন্তু জিয়াসাব যখন খাল কাটনের ঘোষণা দিলেন এলাকার মানুষের মনে আনন্দ আসলো, কারণ মানুষ কাজ পাবে। ঘরে চাল নিতে পারবে। দূরদূরান্ত থেকে মানুষ দলে দলে এসেছিল কাজ করতে। বাবা তখন চাচার ভাতিজা। মাতাব্বরির কমতি কি?
কয়েক মাস ধরে কাজ চলতে থাকে। খাল খনন ও রাস্তা নির্মাণ। খেয়াল করলে দেখবেন কিছু রাস্তা খালসহ প্রায় সোজা হয়ে চলে গেছে। এর অধিকাংশ গুলোই সে সময়ে নির্মাণ-খনন করা হয়েছে। এ রাস্তাগুলো একাধিক গ্রাম ইউনিয়ন পেরিয়ে উপজেলার প্রধান সংযোগ সড়কে পরিণত হয়েছে। এ রাস্তাগুলো তখন গ্রামে নতুন উদ্দীপনা ও উন্নয়নের স্মারক হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। নদী-শাখানদী থেকে কৃষি মৌসুমে পানি আসছে, বর্ষাকালে ব্যবসায় পণ্য বোঝাই বড় বড় নাও আসছে, নদী থেকে বড় বড় মাছ আসছে- বোয়াল, আইড়, বাইলা, পাঙাস, চাপিলা, চিংড়িসহ বিভিন্ন ধরনের মাছ।
মাছগুলো পল্লীর খোলা পুকুর, খোলা জলাভূমি ভরিয়ে দিয়ে সারা বছরের আমিষের যোগান দিচ্ছে। আবার বর্ষা শেষে জমির পানি দ্রুত নিস্কাশন করে জমিগুলোকে চাষের উপযুক্ত করতে খালগুলো অনবদ্য ভূমিকা রেখেছে। এভাবে এ খালগুলো শুধু জলাধার হিসেবে না থেকে গ্রামীণ উন্নয়নের সক্রিয় অংশীদার হয়ে গেছে।
সে সময়ে রামচন্দ্রপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ছিলেন প্রয়াত আবুল কালাম পাটোয়ারী। মেম্বার ছিলেন কুমারডুগীর রশিদ খান, আলুমুড়ার মুসলিম দেওয়ান। নেতৃত্ব দিয়েছেন মান্নান তালুকদার, মুসলিম দেওয়ান, মতিন গাজী, জলিল মুন্সি, সাহাবুদ্দিন খান, আমির খান, গোলাপ খান, শহীদ খান,ফাজিল খান মৌলভী,আউয়াল হাওলাদার, ইলিয়াস পাটোয়ারী, সিদ্দিক পাটোয়ারী প্রমুখ। লেবার সর্দার ছিলেন আলিম উদ্দিন গাজী, কালাম পাটোয়ারীসহ অনেকে। প্রতিদিন ৫০-৬০ জন লোক কাজ করেছেন এবং তাদের জনপ্রতি ৭-১০ কেজি গম দেওয়া হতো প্রতিদিন।
হাজীগঞ্জ বাজারের পূর্ব পাশে ব্রিজের নিচ দিয়ে বয়ে যাওয়া বোয়ালজুড়ি খালের দুই কিলোমিটার খালও তখন কাটা হয়। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান মাটি কেটে দক্ষিণ মুখী হয়ে বসে বিশ্রামরত ছিলেন। তখন তোলা হয় তাঁর বিখ্যাত সেই ছবি যেখানে দেখা যায় তিনি একাকী ঘর্মাক্ত শরীরে বসে আছেন।
গ্রামের এ খালগুলো কালের কষাঘাতে প্রায় ম্রিয়মান হয়ে গেছে দখলে-দুষণে। স্থানীয় ব্রিজগুলো রাস্তা সমান উচ্চতায় করার ফলে বর্ষাকালে নৌকা চলাচল করতে পারে না। বড়বড় রাস্তাগুলো দুপাশ দখল করে মাটি ভরাট করে সরু নালায় পরিণত হয়েছে। আবার খালগুলো বাঁধ দিয়ে মাছ চাষ করা হচ্ছে। ফলে সেই প্রাণচঞ্চল, গ্রামের অর্থনীতির ভিত খালগুলো আর সেই অবস্থায় নেই।
গ্রামের মানুষ ছয়মাস আগেও ভাবতে পারে নি সেই খালগুলো আবার পুনরুজ্জীবিত করা হবে। এটাও ভাবতে পারে নি সরকার ক্ষমতায় এসেই এতো দ্রুত এ খালগুলো পুনঃখননে হাত দিবেন। এ কাজটাই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান হাতে নিলেন যা তাঁকে গ্রামের মানুষের কাছে ‘জিয়াউর রহমানের যোগ্য উত্তরসূরী’ হিসেবে গ্রহণযোগ্য করেছে। কৃষি কার্ড জনাব তারেক রহমানকে ‘কৃষকের নেতা’ হিসেবে মনে স্থান করে দিয়েছে। কৃষক নতুন স্বপ্ন দেখছে। তারা মনে করছে জনাব তারেক রহমান পিতার মতই প্রজ্ঞাবান, ‘বাপ কা ব্যাটা’।
রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শুরু করা ঐতিহাসিক খাল খনন কর্মসূচির আওতায় সারা দেশে ঠিক কতগুলো খাল খনন হয়েছে বা কত কিলোমিটার বলা মুসকিল। একটা তথ্যসূত্র অনুযায়ী, ১৯৭৯ থেকে ১৯৮১ সালের মধ্যে ২৭৯টি প্রকল্পের মাধ্যমে প্রায় ৩,৬৩৬ মাইল (মতান্তরে ২,২০০ মাইল বা ৩,৫৫০ কিলোমিটার) খাল খনন করা হয়। এ খনন কাজ হয় কাজের বিনিময়ে খাদ্য বা কাবিখা প্রকল্পের মাধ্যমে। এর ফলে ১৯৮০-এর দশকের শুরুতেই খাদ্য উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। এই কর্মসূচিটি গ্রামীণ অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত করতে এবং কৃষিতে জলাবদ্ধতা দূর করে উৎপাদন বাড়াতে বড় ভূমিকা রেখেছিল। তাই সবাই এ কর্মসূচিকে “সবুজ বিপ্লব” বলে আখ্যায়িত করেছেন।
১৯৭৬ সালের ১ নভেম্বর উলাশী থেকে যদুনাথপুর পর্যন্ত খালের মাধ্যমে এই কার্যক্রমের সূচনা হয়, যা পরে দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয়ভাবে এ খালগুলো “জিয়া খাল” বা “স্বনির্ভর খাল” নামে পরিচিতি পায়।
জিয়াউর রহমান কৃষকের পাশে দাঁড়িয়ে নিজ হাতে মাটি কেটে এই কর্মসূচির উদ্বোধন করতেন, যা সাধারণ মানুষকে উৎসাহিত করে। কৃষকের, ফসলের প্রকৃত অবস্থা দেখতে মাইলের পর মাইল হেঁটে যেতেন, এটা ছিল তাঁর অসাধারণ কারিশমা। এর মাধ্যমে তিনি গ্রামের প্রকৃত চিত্র, চাহিদা, সরবরাহ, সমস্যা, সম্ভাবনা, ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা ঠিক করতে পারতেন। মানুষ সরাসরি তাঁকে দেখতে পেতো, কথা বলতে পারতো।
প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান পিতার মতই নিজ হাতে কোদাল তুলে নিয়েছেন। দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ছুটে যাচ্ছেন কৃষকের কাছে ঠিক পিতার মতই। তবে খাল খননের কারণ কিছু কমবেশি হয়েছে।
এবার খাল খননের কারণ হিসেবে যুক্ত হয়েছে প্রতিবেশি একটি দেশের নদীর পানি নিয়ে ন্যায্য হিস্যার পরিবর্তে ছেলেখেলা প্রতিরোধ হিসেবে।
খাল খনন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৭৯ সালে একাধিকবার চাঁদপুর জেলা সফরের তথ্য পাওয়া যায়। এর মধ্যে ১৯৭৯ সালের ১৭ জুলাই তারিখে চাঁদপুরে আসার খবর পাওয়া যায় দৈনিক ইত্তেফাক ও দৈনিক বাংলাতে। দৈনিক বাংলার প্রথম পৃষ্ঠার লিড নিউজে ছাপা হয়, “বৃহত্তর স্বার্থে জাতীয়তাবাদী শক্তির ঐক্য দরকার।” খবরে বলা হয়, তাঁর সরকার বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে জনগণকে তাদের নিজস্ব মতাদর্শ দিতে অঙ্গীকারাবদ্ধ। বিদেশী মতাদর্শ জনগণ প্রত্যাখ্যান করেছে। তারা আজ বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদকে একটি বড় ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত করতে বদ্ধপরিকর। তিনি বরেছেলেন, যথাযথভাবে গ্রামের উন্নয়ন না করে দেশের উন্নয়ন সাধন করা সম্ভব না। উন্নয়নের গতি ত্বরান্বিদত করতে দলীয় কর্মীদের প্রতি তিনি প্রত্যেক গ্রামের স্থানীয় কমিটি গঠনের আহ্বান জানান। প্রসঙ্গত তিনি ‘স্বনির্ভর গ্রাম সরকার’ প্রবর্তনের উল্লেখ করেন এবং এ জন্য দেশকে যারা আন্তরিকভাবে ভালবাসেন এমন সৎ ও দক্ষ লোকদের দিয়ে কমিটি গঠনের আহ্বান জানান।
সবগুলো খাল পুনঃখনন করা গেলে একটা নতুন ম্রিয়মান ইতিহাস সক্রিয় হবে। আগামী পাঁচ বছরে বিশ হাজার কিলোমিটার খাল পুনঃখননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গ্রামের অর্থনীতির উন্নয়নে এটা একটা মাইলফলক হয়ে থাকবে।
আমার গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে চলা এ খাল ধরেই দাদাকে দেখেছি পাট বোঝাই নৌকা নিয়ে মতলব বাজারে যেতে। পাট বিক্রি করে প্রয়োজনীয় সদাই করে বাড়ি ফিরতেন রাত দশটার পরে। মতলব বাজারের তরতাজা ইলিশের ভাজা খেতে ওইদিন রাত আমরা একটু বেশি সময় পড়ার টেবিলে ঝিমুতাম। শাহতলী বাজার প্রসিদ্ধ হয়েছে ডাকাতিয়া খাল আর এ খালের সংযোগ স্থলে অবস্থানের কারণে। চাঁদপুর-হাজীগঞ্জ সড়ক বা বাবুরহাট- মতলব সড়কের পাশের খালগুলো আবার জেগে উঠতে পারে কর্তৃপক্ষের একটু সচেতন দৃষ্টি পেলে।
এর চেয়ে বড় কথা খালগুলোর নামকরণ করা হোক “জিয়া খাল” নামে যাতে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের অবদান নতুন প্রজন্ম জানতে পারে।
জিয়াউর রহমানের স্বপ্ন বেঁচে থাকুক প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে। তাঁরই যোগ্য উত্তরসূরী প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হাত ধরে এগিয়ে যাক এদেশের গ্রামীণ অর্থনীতি। গ্রামের মানুষগুলোর মুখে ফুটে উঠুক অকৃত্রিম সোনালী হাসি। কৃষকের গোলা আবার ভরে উঠুক। খালবিল ভরে যাক মাছ-ফসলে, এই হোক প্রত্যাশা।
লেখক: মোহাম্মদ ওমর ফারুক দেওয়ান।

লেখক: মোহাম্মদ ওমর ফারুক দেওয়ান।


