জসীমউদ্দীন মোল্লা থেকে পল্লীকবি জসীমউদ্দীন

।। এস ডি সুব্রত।। ফরিদপুর জেলার তাম্বুলখানা গ্রাম। জেলা শহর থেকে মাত্র ১০ কিলোমিটার দূরে। জসীমউদ্দীনের মায়ের বাবার বাড়ি। আর স্বামীর বাড়ি ফরিদপুর জেলা শহর থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরে গোবিন্দপুর গ্রাম। তাম্বুলখানা গ্রামে আমিনা খাতুন ওরফে রাঙাছুটুর গর্ভে জন্ম হয় জসীমউদ্দীনের। ১৯০৩ খ্রিস্টাব্দে ১ জানুয়ারি। পুরো নাম জসীমউদ্দীন মোল্লা। এই জসীমউদ্দীন মোল্লাই একদিন হয়ে উঠেন সবার প্রিয় পল্লীকবি জসীমউদ্দীন। বাবার নাম আনসার উদ্দীন মোল্লা যিনি পেশায় ছিলেন শিক্ষক। নইমুদ্দীন মোল্লা বাড়ির হালটে কুস্তি, হাডুডু খেলা, পদ্মা চরের লাঠিখেলা, কার্তিক মাসের গাস্বীর উৎসব দেখে বড় হওয়া জসীমউদ্দীন মোল্লার শখ ছিল ঝড়ের মধ্যে আম কুড়ানো, কলাগাছের ভেলায় চড়া। ছোটবেলায় তালি দেওয়া জামা পড়া, মায়ের ভাতের হাড়ি, ডালের হাড়ি ভেঙে দেওয়া জসীমউদ্দীন মোল্লাই পরবর্তীতে হয়ে উঠেছিলেন আমাদের সবার পরিচিত পল্লীকবি জসীমউদ্দীন। ফরিদপুর হিতৈষী স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষা আর ফরিদপুর জিলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিক এবং রাজেন্দ্রপুরে কলেজ থেকে আইএ পাশের পর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে এমএ পাশ করেন পল্লীকবি জসীমউদ্দীন।
কিস্তি টুপি মাথায় দিয়ে মনসুর মৌলভীর কেতাব, কোরআন কাঁদে ঝুলিয়ে দাওয়াত খেতে খেতে স্বপ্ন দেখতেন মৌলভী হওয়ার। আবার শ্মশানের সন্ন্যাসীর  সঙ্গ পেয়ে মাছ মাংস পেয়াাজ রসুন ছেড়ে মগ্ন হতেন ধ্যানে। সন্ন্যাসীর সঙ্গে হিমালয় যাওয়ার স্বপ্ন দেখতেন জসীমউদ্দীন। বয়স যখন তের চৌদ্দ, নবম শ্রেণির ছাত্র তখন সাধু সন্ন্যাসী হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। কবি হওয়ার স্বপ্ন তখনো জাগেনি। পরোপকারে জীবন বিলিয়ে দিতে চেয়ছিলেন জসীমউদ্দীন। একবার রেলস্টেশনে এক বৃদ্ধ লোকের ব্যাগ বইতে গিয়ে ধরা পড়েছিলেন বাবার কাছে। বাড়ি বাাড়ি গিয়ে রোগী খুঁজে বের করে সেবা করা তার অন্যতম নেশা ছিল। যক্ষ্মা আর কলেরা রোগীদের সেবা দিতেন নিঃসংকোচে। কবি গান শুনে কবিয়াল হওয়ার ইচ্ছা জাগে মনে। নিজে নিজে বোল রচনা করতে থাকেন। বাড়িতে সবাইকে কবি গান গেয়ে শুনাতেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক থাকাকালীন বাড়ি গেলে বিভিন্ন গ্রামে গিয়ে কবি গান করতেন। এভাবেই কবি গানের কবিয়াল থেকে জন্ম হয়েছিল পল্লীকবি জসীমউদ্দীনের।
কবি হওয়ার জন্য গিয়েছিলেন কলকাতা। কলকাতা গিয়ে অভাবের তাড়নায় পত্রিকার হকারগিরি করেছেন। কবি মোজাম্মেল হকের পরামর্শে কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে দেখা করলে নজরুল তার কবিতা ছাপার আশ্বাস দেন। মুসলেম ভারত পত্রিকার যে সংখ্যায় নজরুলের বিদ্রোহী কবিতা ছাপা হয় সে সংখ্যায় জসীমউদ্দীনের মিলন- গান কবিতা ছাপা হয় নজরুলের সহযোগিতায়। পত্রিকায় ছাপা এটিই জসীমউদ্দীনের প্রথম কবিতা। সেটি ১৯২১ সালের দিকে।
নজরুলের সঙ্গে নানা স্মৃতি নিয়ে জসীমউদ্দীন লিখেছেন গল্পগ্রন্থ ‘যাদের দেখেছি’। কলকাতায় গিয়ে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্র সহায়তায় দীনেশ চন্দ্র সেনের সঙ্গে দেখা করলে দীনেশ চন্দ্র সেন জসীমউদ্দীনকে বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রাম্য গাঁথা সংগ্রাহক হিসেবে মাসে ৭০ টাকা বেতনের চাকরি দেন। সাহিত্য পত্রিকা কল্লোলে জসীমউদ্দীনের কবিতা ছাপা হলে এটি পড়ে দীনেশ চন্দ্র সেন মুগ্ধ হন। ১৯২৫ সালে যখন জসীমউদ্দীন বিএ  ক্লাসের ছাত্র তখন দীনেশ চন্দ্র সেন তাকে চিঠিতে জানান তার কবিতা ম্যাট্রিক ক্লাসে পাঠ্য হয়েছে। দীনেশ চন্দ্র সেনের ভাষায় আইএ ক্লাসে লেখা বিএ ক্লাসে থাকা অবস্থায় জসীমউদ্দীনের কবিতা ম্যাট্রিক ক্লাসে পাঠ্য হয়েছে। এমন দৃষ্টান্ত শুধু বাংলায় নয়, সারা পৃথিবীতে বিরল।
১৯২৭ সালে পাঁচটি গানসহ ১৮টি কবিতা নিয়ে জসীমের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘রাখালী’ প্রকাশিত হয়। ১৯২৯ সালে প্রকাশিত হয় ‘নকসী কাঁথার মাঠ’। ১৯৩৯ সালে নকসী কাঁথার মাঠ কবিতাটি ইএম মিলফোর্ড ‘The Field Of Embroidered Quilt’ নামে ইংরেজি অনুবাদ করেন। পরবর্তীতে এটি চেক, রুশ ও মান্দারিন ভাষায় অনুদিত হয়।
১৯৩৩ সালে তার দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘সোজন বাদিয়ার ঘাট’ প্রকাশিত হয়। এ বইটি ইউনেস্কোর উদ্যোগে ১৯৬৯; Gypsy wharf  নামে ইংরেজিতে অনূদিত হয়।
কবিতার সঙ্গে সমান তাৎপর্য তার গান। তার গানের বই ‘রঙিলা নায়ের মাঝি’ জারী গান, মুর্শিদী গান। আব্বাসউদ্দীন, আব্দুল আলীম সহ বিখ্যাত শিল্পীরা তার গান গেয়েছেন। তার বিখ্যাত ও জনপ্রিয় গানের মধ্যে- উজান গাঙের নাইয়া, বাবু সেলাম বারেবারে, নিশিতে যাইয়ো ফুলবনে, নদীর কুল নাই কিনারা নাই ইত্যাদি।
জসীমউদ্দীন শিশুদের খুব ভালোবাসতেন। ছোটদের জন্য লিখিত ১১টি বইয়ের মধ্যে হাসু, এক পয়সার বাঁশী ও ডালিম কুমার অন্যতম। জসীমউদ্দীনকে আমরা চিনি কবি হিসেবে; প্রধানত পল্লীকবি হিসেবে। তিনি একজন বড় গদ্য শিল্পীও ছিলেন। গদ্যে তার অসামান্য অবদান ‘জীবন কথা’ আত্মাজীবনী গ্রন্থ, উপন্যাস ‘বোবা কাহিনী’ এবং ভ্রমণ কাহিনী ‘চলো মুসাফির’। জসীমউদ্দীনের বিখ্যাত নাটক ‘মধুমালা’, ‘বেদের মেয়ে’ ও পল্লী বন্ধু। জসীমউদ্দীন ছিলেন বাঙালি সংস্কৃতির সংগ্রাহক ও প্রচারক। দীনেশ চন্দ্র সেন সম্পাদিত পূর্ব বঙ্গ গীতিকার অন্যতম সংগ্রাহক ছিলেন জসীমউদ্দীন।
পাকিস্তান আমলে ১৯৫৮ সালে পেয়েছেন প্রাইড অব পারফরম্যান্স পুরস্কার, ১৯৭৪ সালে পেয়েছেন বাংলা একাডেমি পুরস্কার, ১৯৭৬ সালে একুশে পদক, ১৯৭৮ সালে স্বাধীনতা পদক, ১৯৬৫ সালে ইউনেস্কো পুরস্কার। ১৯৭৬ সালের ১৪ মার্চ মৃত্যুবরণ করেন ৭৩ বছর বয়সে। নিজ গ্রাম গোবিন্দপুরে দাদীর  কবরের পাশে ডালিম গাছের তলে শায়িত আছেন এক সময়ের জসীমউদ্দীন মোল্লা আমাদের পল্লীকবি জসীমউদ্দীন।
লেখক: কবি ও প্রাবন্ধিক, সুনামগঞ্জ।
০১৭৭২২৪৮২২৪
sdsubrata2022@gmail.com

ফোকাস মোহনা.কম