
মধুসূদন রায়। ছবি: সংগ্রহীত।
চাঁদপুর: ব্রিটিশ সরকার থেকে রায় বাহাদুর খ্যাতাব প্রাপ্ত মধূ সূদন রায় বর্ণাঢ্য জীবনের অধিকারী ছিলেন। জীবদ্দশায় তিনি ছিলেন চাঁদপুর পৌরসভার দীর্ঘ মেয়াদী চেয়ারম্যান, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী, পুরাানবাজার মধুসুদন উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষক, চাঁদপুর-লাকসাম রেলপথের মধুরোড স্টেশেনের প্রতিষ্ঠাতা।
চাঁদপুর ঐতিহ্যবাহী পৌরসভার ১২৫ বছরের এবছর পর্দাপণ করছে। পৌরসভার এ ঐতিহাসিক সময়ে জনহিতৈষী, শিক্ষক এ মহানপ্রাণ ব্যক্তিত্বকে স্মরণ করছি। চাঁদপুর পৌরসভার ইতিহাসে তিনি সবচাইতে বেশী সময় ২৪/৯/১৯২৬ থেকে ২৯/৯/১৯৪২ পর্যন্ত সুদীর্ঘ ১৬ বছর চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। পৌরসভার প্রথম নির্বাচিত চেয়ারম্যান রমনী মোহন রায়ের পরে দ্বিতীয় নির্বচিত চেঢারম্যান হিসেবে মধুসুদন রায় বাহাদুর পৌরবাসীর সেবা করেছেন। সেসময়ে পৌরসভার ভোটার হতে হলে এসএসসি পাশ হতে হতো পৌর নাগরিকগণকে। সেসকল শিক্ষিত নাগরিকের ভোটের মাধ্যমে পৌরসভার চেঢাম্যান নির্বাচিত হতো। পৌরসভার চেয়ারম্যান থাকাকালীন সময়ে সনাতন ধর্মালম্বীদের শেষ ঠিকানা ইচলি শ্মশান ঘাটের ৪ একর সম্পত্তি বন্দোবেস্ত করে যান। তিনি জমিদাতা সাধু পোদ্দারকে সাথে নিয়ে এ জনহিতৈষী কাজটি সেসময়ে সম্পন্ন করেন।
উল্লেখ্য ১৮৯৬ সালের ১ অক্টোবর চাঁদপুর পৌরসভা`গ` শ্রেণির পৌরসভা হিসেবে যাত্রা শুরু করে। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ সুদীর্ঘ সময়ে পৌরসভার নাগরিকগণদের সেবা করেছেন যে সকল চেয়ারম্যান ও মেয়রগণ হলেন: প্রথম নির্বাচিত চেয়ারম্যান শ্রী রমনীমোহন রায় (৪ জুন ১৯২০ থেকে ২৩ সেপ্টেম্বর ১৯২৬ পর্যন্ত), দ্বিতীয় নির্বাচিত চেয়ারম্যান শ্রী মধুসূদন রায় (২৪ সেপ্টেম্বর ১৯২৬ থেকে ২৯ সেপ্টেম্বর ১৯৪২ সাল পর্যন্ত সদীর্ঘ ১৬ বছর), শ্রী অক্ষয় কুমার দে সরকার (৩০ সেপ্টেম্বর ১৯৪২ থেকে ১২ অক্টোবর ১৯৪৬ সাল পর্যন্ত), শ্রী ক্ষিরোদ চন্দ্র ঘোষ (১২ অক্টোবর ১৯৪৬ থেকে ১২ অক্টোবর ১৯৫২ সাল পর্যন্ত), মোঃ আব্দুস সালাম (১৫ নভেম্বর ১৯৫২ থেকে ৯ নভেম্বর ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত), মোঃ আব্দুল করিম পাটওয়ারী (২৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৪ থেকে ১৭ অক্টোবর ১৯৮২ সাল পর্যন্ত), মোঃ সামছুদ্দিন আহমেদ বিএ (৮ মার্চ ১৯৮৪ থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত), মোঃ নুরুল হক বাচ্চু মিয়াজী (১৪ মার্চ ১৯৮৯ থেকে ৩০ ডিসেম্বর ১৯৯১ সাল পর্যন্ত), মোঃ ইউছুফ গাজী (৭ মার্চ ১৯৯৫ সাল থেকে ৭ নভেম্বর ২০০০ সাল পর্যন্ত), মোঃ সফিকুর রহমান ভূঁইয়া (৭ নভেম্বর ২০০০ সাল থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত), মোঃ নাছির উদ্দিন আহমেদ ( ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০০৬ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত চেয়ারম্যান পরবর্তীতে ১৪ মে ২০০৮ সাল থেকে প্রথম মেয়র হিসেবে ২০২০ পর্যন্ত মেয়রের দায়িত্ব পালন করেন) বর্তমান মেয়র জিল্লুর রহমান জুয়েল ২০২০ সাল থেকে পৌর পিতার দায়িত্ব পালন করছেন।
চাঁদপুর পৌরসভা ১৮৮৬ সালে প্রতিষ্ঠার পর প্রথমে ৯ জন সদস্য নিয়ে (৪ জন ইংরেজ ও ৫ স্থানীয় গণ্যমান্য নাগরিক) পৌর পরিষদ গঠিত হয়। তাদের সবাই ইংরেজ ভাইসরয় কর্তৃক নিযুক্ত হতেন। পরবর্তী সময়ে শুধুমাত্র হোল্ডিং ট্যাক্স প্রদানকারীগণের সরাসরি ভোটে পৌর পরিষদ নির্বাচিত হতো। তার কিছু সময় পর হোল্ডিং-এ বসবাসকারী আবাসিকদের মধ্যে যারা নূন্যতম এন্ট্রাস (এসএসস) পাশ ছিলেন তারা ভোটার তালিকায় অন্তর্ভূক্ত হন এবং ভোটনপ্রদান করতে পারতেন। ১৯২০ সালের পূর্বে কোন ভোটের ব্যবস্থা ছিল না। পৌর পরিষদ ইংরেজ ভাইসরয় কর্তৃক নিযুক্ত হতো। ১৯২০ সালে শ্রী রমনীমোহন রায় প্রথম চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ২০০৮ সালে চেয়ারম্যান পদবী পরিবর্তন করে মেঢর নামকরন করা হয়। প্রথম মেয়র নির্বাচিত হন নাছির উদ্দিন আহমেদ।
চাঁদপুর শহরের ঐতিহ্যবাহী বাণিজ্যিক কেন্দ্র পুরানবাজারে অবস্থিত মধুসুদন উচ্চ বিদ্যালয়লটি ১৯২১ সালে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার পর থেকে ১৯৫০ সাল পর্যস্ত দীর্ঘ ২৯ বছর প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষক হিসেবে অত্যন্ত সুনাম ও দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করেন মধু সূদন রায় বাহাদুর।
সেসময়ে অত্র অঞ্চলে শিক্ষার আলো ছড়াতে মধু সুদন রায় ব্যাপক ভূমিকা পালন করেছিলেন।
চাঁদপুর সদর উপজেলার রামপুর ইউনিয়নে ১৯২২ সালে মধু সূদন রায় বাহাদুর এর নামে মধু রোড ষ্টেশনটি নামকরন করা হয়। শুধু তাই নয় স্টেশনটি ঘিরে যে ৪ একর সম্পত্তি রয়েছে তা তিনি দান করেন। মধু রোড স্টেশন থেকে শুরু করে ছোট সুন্দর বাজারে যাওয়ার পথের প্রায় ৯ একরের অধিক সম্পত্তির মালিক ছিলেন মধু সুদন রায়ে। মধু বাবুর বাড়ি বলে খ্যাত এ স্থানে বর্তমানে তার পূর্ব পুরুষের একটি পাকা সমাধিস্থল রয়েছে।
উল্লেখ্য ১৮৯২ সালে ইংল্যান্ডে গঠিত আসাম বেঙ্গল রেলওয়ে কোম্পানি বাংলাদেশে রেলপথ নির্মাণের দায়িত্ব নেয়। ১৮৯৫ সালের ১ জুলাই চট্টগ্রাম থেকে কুমিল্লা ৬৯ কিমি মিটারগেজ লাইন এবং লাকসাম থেকে চাঁদপুর পর্যন্ত ৫২ কিমি রেললাইন জনসাধারণের জন্য খোলা হয়।
রামপুর ইউনিয়নের ছোট সুন্দর বাজারের প্রবীন ব্যবসায়ী (৯২ বছর) রমেশ চন্দ্র রায় মধু সুদন রায় সম্পর্কে বলেন, আমি ছোট বেলা থেকে মানে বুঝের পর থেকে মধুরোড স্টেশনটি দেখতেছি। মধু বাবু এ সেটশনের জন্য জমি দান করেছেন তার নামেই এ স্টেশনটির নামকরন করা হয়। তিনি পুরানবাজারের একজন বড় ব্যাবাসীয় ছিলেন। ওনার চালের কারবার, বরফকল ও লবনের মিল ছিল। ওনি অনেক দানশীল ব্যাক্তি ছিলেন। আমি ওনার আত্মীয় হওয়ার সুবাদে ছোট বেলায় আমার ওনাকে দেখার সৌভাগ্য হয়। তিনি আমাদের গ্রামে জন্মগ্রহন করেন তবে বেশী সময় কাজের জন্য চাঁদপুর শহরের নতুন বাজার ও পুরানবাজারের বাড়িতে থাকতেন। তার পাঁচটি মেয়ে কোন ছেলে সন্তান নেই, মেয়েরা সকলে ভারতের কলকাতায় বসবাস করেন। ওনার মেয়েরা সকলে উচ্চ শিক্ষিত।
চাঁদপুর কালীবাড়ি কোর্ট স্টেশনের জয়নাল স্টোর এর স্বত্তাধিকারী জয়নাল আবেদীন বলেন, বিগত ৫০ বছর ধরে আমি কোর্ট স্টেশনে ব্যবসা করছি। বছর আমার বাড়ি মিশন রোড এলাকায়, যখন আমি কিশোর তখন মধু বাবুকে দেখার সৌভাগ্য হয়। তিনি ভীষন জনপ্রিয় ব্যাক্তি ছিলেন, পৌরসভার চেয়ারম্যান পদ না থাকার পরও তিনি পৌরসভার নাগরিকতের খোঁজ খবর নিতেন। তিনি ফজরের নামাজের পর পর হাফপ্যান্ট পরে মর্নিওয়ার্কে বের হতেন, সসেময়ে প্রতাপ সাহা রোড, আশ্রম এলাকা, ঘোষ পাড়া, গুয়াখোলা এলাকায় ঘুরে ঘূরে মানুষের সমস্যার কথা শুনতেন।
বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠক অজয় কুমার ভৌমিক বলেন, চাঁদপুর পৌরসভার ১২৫ বছর বছর পূর্তিতে পৌরসভার ইতিহাসে দীর্ঘ মেয়াদী চেয়ারম্যান মধু সুদন রায়কে শ্রদ্ধার সাথে স্মরন করছি। তিনি একাধারে ছিলেন জনপ্রতিনিধি, ব্যবসায়ী, শিক্ষক, দানবীর এক মহানপ্রাণ ব্যাক্তি। পৌরসভার প্রথম নির্বাচিত চেয়ারস্যান রমনী মোহন রায়ের পর দ্বিতীয় নির্বাচিত চেয়ারম্যান হিসেবে ভীষণ সুধৃরভাবে পৌরবাসীয়র সেবা করে গেছেন। আমি আমার বাবা ও বয়জেষ্ঠদের কাছ থেকে মধুসুদন রায় বাহাদুর সম্পর্কে বিশদভাবে শুনেছি। তিনি তৎকালীন সময়ে ব্রিটিশ সরেকারে কাছ থেকে রায় বাহাদুর উপধী লাভ করেন। চাঁদপুর শহরে পৌর মহাশ্মশান প্রতিষ্ঠায় মধু বাবুর যথেষ্ট অবদান রয়েছে। সাধু পেদ্দারের দানকৃত ৪ একর সম্পত্তিতে গড়ে ওঠা মহাশ্মশানটি পৌর কর্তৃপক্ষ দেখভাল করবে এ বিষয়টি নিশ্চিত করেন চেয়ারম্যান মধুসুদন রায়। ওনার সময়কালে একটি কাহিনী না বললেই নয়- বেগম ইন্ডাস্ট্রিজ এর মালিক আমজাদ মিয়া একটি প্রতাপ সাহা রোড দিয়ে যাওয়ার সময় ওনাকে ভিমরুলে আঘাত করে তাতে তিনি আহত হন। পৌরসভার নাগরিক হওয়ায় আমজাদ মিয়া সেদিন পৌর কর্তৃপক্ষের অবব্যাস্থপনার নিরিখে পৌরসভার চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে মামলা ঠুকে দেন। আদালত সেসময় আমজাদ মিয়ার আহত হওয়া ও অবব্যবস্থাপনা রয়েছে মর্মে পৌরসভাকে ৫০ টাকা জরিমানা করেন। জরিমানার ৫০ টাকা পৌর কর্তৃপক্ষ আমজাদ মিয়াকে প্রদান করেন। এ বিষঢে তুলে ধরলাম এ জন্য যে, শতবছর পূর্বে পৌরসভা নাগরিক সেবা নিশ্চিত করতে কতটা বদ্ধপরিকর ছিল। সাথে সাথে সেসময়কার পৌর নাগরিকগণ কতটা সচেতন ছিলেন।
বর্ণাঢ্য জীবনের অধিকারী মধু সুদন রায় বাহাদুর চাঁদপুর সদর উপজেলার ৫নং রামপুর ইউনিয়নে চরবাকিলা গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। তিনি ১৯৬৪ সালে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে চলে যান। ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বিভিন্ন সামাজিক কর্মকান্ডে নিজেকে সম্পৃক্ত করেন। পরবর্তীতে এ মানবহিতৈষী এ মহানপ্রাণ ১৯৭০ সালে মৃত্যুবরণ করেন।
লিখেছেন: সাংবাদিক অভিজিত রায়।



