
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। সংগ্রহীত ছবি।
।।এস ডি সুব্রত।। ইতিহাসের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে রচিত উপন্যাসে ঐতিহাসিক তথ্যের বিকৃতি ঘটানো কাম্য নয়। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বিখ্যাত উপন্যাস ‘আনন্দমঠ’ এ ঐতিহাসিক তথ্যের বিকৃতি ঘটেছে। সেখানে ঐতিহাসিক বাস্তবতার বিকৃতি ঘটানো হয়েছে। উপন্যাসে ঔপন্যাসিকের মতাদর্শ সক্রিয় থাকে। উপন্যাসের বিষয়বস্তু নির্মাণে এই মতাদর্শ ও বাস্তবতার রাসায়নিক মিশ্রণ ঘটে থাকে। কিন্তু সেই মতাদর্শের প্রতিফলন শিল্পের শর্তকে লঙ্গন করে নয়। লেখক জীবন ও জগতকে কোন দৃষ্টিকোণ থেকে এবং কোন অবস্থান থেকে পর্যবেক্ষণ করেছেন এবং বাস্তবতাকে উপস্থাপন করেছেন সেটা উপন্যাসে প্রস্ফুটিত হয় । ‘আনন্দমঠ’ পর্যালোচনায় এ উপপাদ্য প্রস্ফুটিত যে, হিন্দুমন বা হিন্দু জাতীয়তাবাদ এবং মুসলিম বিদ্বেষী হিন্দু সাম্প্রদায়িকতা ‘আনন্দমঠ’ এর মৌল মতাদর্শিক ভিত্তি। একজন লেখকের মতাদর্শ হিসেবে হিন্দু জাতীয়তাবাদকে লালন করাটা কোনো দোষের বিষয় নয়, কিন্তু সেটা যখন সাম্প্রদায়িকতার রূপ ধারণ করে তখনই সেটা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠে ।‘আনন্দমঠ’-এর হিন্দু জাতীয়তাবাদ-এর ক্ষেত্রে তাই ঘটেছে।
আনন্দমঠ লিখেছেন বঙ্কিম চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, ১৮৮২ সালে । ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৮৮০-১৯৮১ সালে মাসিক ‘বঙ্গ দর্শন’ সাময়িকীতে এবং বই আকারে প্রকাশিত হয় ১৮৮২ সালে। সে সময় ভারতীয় উপমহাদেশের সামাজিক-অর্থনৈতিক বাস্তবতা ছিল বিদ্রোহ ও অস্থিরতায় আক্রান্ত। তৎকালীন বড়লাট লর্ড লিটনের কৃষি সচিব অ্যালান হিউস পর্যন্ত স্বীকার করেছেন যে, ভারত উপমহাদেশের সামগ্রিক বাস্তবতা এক ভয়ঙ্কর অভ্যুত্থানের মুখোমুখি। সমগ্র ভারতবর্ষ ছিল একটা জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরি। যে-কোনো মুহূর্তে এটা বিস্ফোরিত হতে পারে। দেশের বেশিরভাগ নিম্নবর্গের মানুষ প্রচলিত ব্যবস্থার ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলেছিল এবং ব্যবস্থার পরিবর্তনের জন্য সশস্ত্র অভ্যুত্থানের বিষয়ে ভাবতে শুরু করেছিল। অনেক স্থানে সশস্ত্র বিদ্রোহ শুরু হয়েছিল। এই সময়ের পরিধিতে দুটো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটেছিল। একটি হলো মনন্তর এবং অপরটি হলো ফকির ও সন্ন্যাস বিদ্রোহ। তৎকালীন সময়ের অগ্নিগর্ভ পরিবেশ ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসটি লেখা হয়। এখানে ছিয়াত্তরের মনন্তরের প্রেক্ষাপটে সন্ন্যাসী বিদ্রোহকে উপস্থাপন করা হয়েছে। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ১৭৫৭ সালে পলাশীযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলার শাসন ক্ষমতা দখল করে। প্রথমে নিজেরা শাসন ক্ষমতা হাতে নেয়নি। প্রথমে তারা পুতুল নবাব মসনদে বসায়। কিন্তু নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে রেখে দেয়। ব্রিটিশ বেনিয়া গোষ্ঠী ১৭৬৫ সালের ১২ আগস্ট দিল্লির সম্রাট শাহ আলমের কাছ থেকে বাংলার দেওয়ানী বা রাজস্ব আদায়ের আনুষ্ঠানিক ফরমান আদায় করেন। এর ফলে এখানে দ্বৈত কর্তৃত্বের সৃষ্টি হয়। রাজনৈতিক ক্ষমতা নবাবের নিকট আর আর্থিক ক্ষমতা বা রাজস্ব আদায়ের ক্ষমতা কোম্পানির হাতে এসে যায়। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘আনন্দমঠ’ এ উপস্থাপিত সন্ন্যাসী বিদ্রোহ ছিল কার্যত বাংলা ও বিহারের কৃষকদেরই বিদ্রোহ। বিহার ও বাংলার বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে ১৭৬৩ সাল থেকে প্রায় চল্লিশ বছর ধরে এই বিদ্রোহ ছিল। একটি কেন্দ্রীভূত একক নেতৃত্ব, সংগঠন ও বাহিনীর উপর ভিত্তি করে পরিকল্পনা মাফিক এই বিদ্রোহ সংঘটিত হয়নি। বহু কেন্দ্রিক নেতৃত্ব ও সংগঠনের অধীনে এ বিদ্রোহ চলেছিল। এই বিদ্রোহের মূল শত্রু ছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। ব্যাপক গ্রামীণ কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষ বিভিন্নভাবে এ বিদ্রোহকে সহযোগিতা ও সমর্থন করেছিল। বাস্তবত এই বিদ্রোহী দলে ছিল মোঘল সাম্রাজ্যের বেকার ও ক্ষুধার্ত সৈন্যগণ, গৃহ ও ভূমিহারা কৃষক ও তাঁতিশ্রেণি এবং সন্ন্যাসী ও ফকির বাহিনী। তারা বিদ্রোহ করেছিলেন কৃষক ও তাঁতী হিসেবে কোম্পানির শোষণ থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য এবং ফকির ও সন্ন্যাসী হিসেবে ধর্মানুষ্ঠান ও প্রচলিত অধিকারের উপর বিদেশী বেনিয়া শাসকদের হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে। এই বিদ্রোহীরা সাধারণ সম্পত্তি লুট ও তাদের উপর যাতে অত্যাচার না হয় সেদিকে কঠোর দৃষ্টি রেখেছিলেন।
এই বিদ্রোহীরা কোন রকম সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ছড়াননি। অথচ ‘আনন্দমঠ’ ও উপস্থাপিত সন্ন্যাসী বিদ্রোহ বাস্তবতার বিকৃত ঘটনাপ্রবাহ। এই উপন্যাসে অষ্টাদশ শতাব্দীর ব্রিটিশ বিরোধী একটি ব্যাপক ও মহান গণঅভ্যুত্থানকে চিত্রিত করা হয়েছে ব্রিটিশ সমর্থক একটি হিন্দু সাম্প্রদায়িক অভ্যুত্থান হিসেবে। ‘আনন্দমঠ’ এর সন্তানেরা বিদ্রোহ করেছিল মুসলিম শাসকদের বিরুদ্ধে।
তাদের মৌল আদর্শ ও উদ্দেশ্য ছিল সনাতন ধর্ম তথা হিন্দু ধর্ম প্রতিষ্ঠা। তারা মুসলিম শাসকদেও বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার পাশাপাশি অবাধে লুটতরাজ ও সাধারণ মানুষের উপর বিশেষ করে মুসলমানদের উপর নির্যাতন চালাতো। তারা মুসলমানদের মসজিদ ভেঙ্গে সেখানে গড়তে চেয়েছে হিন্দুদের দেবতা রাধা মাধবের মন্দির। ভগবান বিদ্বেষী মুসলমানদের নিধন করা ছিল তাদের অন্যতম উদ্দেশ্য। মুসলিম রাজত্ব উচ্ছেদ করে ব্রিটিশ শাসন প্রতিষ্ঠা করা ছিল তাদের মৌল অঙ্গীকার। কার্যত টিশ রাজভক্ত বঙ্কিম চট্টোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক মতাদর্শ হিন্দু জাতীয়তাবাদের ধারণা ‘আনন্দমঠ’ এ প্রস্ফুটিতসুমিত সরকারের মতে ‘যে সন্ন্যাসী বিদ্রোহকে ঘিরে আনন্দমঠ রচিত তার মূল লক্ষ্য ছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। অথচ বঙ্কিম সচেতনভাবে তার মনোযোগ নিবন্ধ রেখেছেন মুর্শিদা নবাবের কুকীর্তিগুলোর ওপর, সিতি তখন কার্যত ব্রিটিশদের ক্রীড়নকে পরিণত। বঙ্কিম নিশ্চয় একই সঙ্গে ঘটা ফকির বিদ্রোহের খবরও রাখতেন। কিন্তু সে বিদ্রোহকে অবজ্ঞা করেছেন।’ বস্তুত আনন্দমঠ এ ইতিহাসের তথ্যবিকৃতি বিস্তৃত। অন্যদিকে ঐ সময়ে হিন্দু শিক্ষিত শ্রেণির একটি অংশের মানসিকতায় ইউরোপীয় গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও বৈজ্ঞানিক চেতনার প্রভাবের কারণে প্রাচীন শাস্ত্রীয় অনুশাসন এবং হিন্দুধর্মের গোঁড়ামি ও রক্ষণশীলতার বিরুদ্ধে একটি আন্দোলন গড়ে উঠেছিল। এই সংস্কারবাদী আন্দোলনের স্রোত নব্য হিন্দু পুনরুত্থানবাদী আন্দোলনের লক্ষ্য হয়ে উঠে। এই হিন্দু পুনরুত্থানবাদী আন্দোলনের স্রোতে প্রবাহিত আনন্দ মঠে রয়েছে ধর্মীয় রক্ষণশীলতা ও সাম্প্রদায়িকতা।
‘কমিউনালিজম অ্যান্ড কমিউনাল ভায়োলেন্স’ বইয়ে আসগার আলী ইঞ্জিনিয়ার মন্তব্য করেছেন ‘আর্থ-সামাজিক বা রাজনৈতিক ইহজাগতিক দাবিসমূহ নিছক কোন বিশেষ ধর্মমতে বিশ্বাসী হওয়ার জন্য যখন সেই ধর্মীয় সম্প্রদায় উত্থাপন করতে থাকে তখনই তা সাম্প্রদায়িকতার মূল বিন্দু হয়ে উঠে। এর অভিব্যক্তি বিভিন্ন ধরনের বা বহুবিচিত্র হতে পারে। কিন্তু বিচার্য হলো, ইহজাগতিক দাবিসমূহকে ধর্মীয় সাংস্কৃতিক ভাষায় আবরিত করে উত্থাপন করা হচ্ছে কিনা। সাম্প্রদায়িকতার কেন্দ্রে ইহজাগতিকা, কিন্তু এর বহিরাবরণ ধর্মীয় আর এই বহিরাবরণ প্রায়শ আমাদের প্রতারিত করে। ‘আনন্দমঠ’ এ এই উপপাদ্যই প্রস্ফুটিত। আনন্দমঠ-এর সন্তানেরা একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চায় কিন্তু সেটা হিন্দু রাষ্ট্র। কিন্তু সে রাষ্ট্রে মুসলমানদের কোনো ঠাঁই নেই। হিন্দু জাতীয়তাবাদই এখানে বক্তব্য। আনন্দমঠ-এর প্রথম খন্ডের দশম পরিচ্ছদে ভবানন্দ বলেন এ নেশাকোর নেড়েদের না তাড়াইলে আর কি হিন্দুর হিন্দুয়ানী থাকে?’ সত্যানন্দের বক্তব্য হলো কেবলমাত্র মুসলমানরা ভগবান বিদ্বেষী বলিয়া তাদের সবংশে নিপাত করিতে চাই।’ (দ্বিতীয় খন্ড, চতুর্থ পরিচ্ছদ)। আর সে কারণে সন্তান সম্প্রদায় গ্রামে গ্রামে চর পাঠাইতে লাগিল। চর গ্রামে গিয়া সেখানে হিন্দু দেখে বলেন, ভাই বিষ্ণু পূজা করবি? এই বলিয়া ২০/২৫ জন জড়ো করিয়া, মুসলমানের গ্রামে আসিয়া পড়িয়া মুসলমানদের ঘরে আগুন দেয়। মুসলমানরা প্রাণ রক্ষায় ব্যতিব্যস্ত হয়। সন্তানেরা তাদের সর্বস্ব লুট করিয়া নতুন বিষ্ণু ভক্তদিগকে বিতরণ করে। লোকে দেখিল, সন্তানত্বে বিলক্ষণ লাভ আছে।’ (প্রথম পরিচ্ছেদ, তৃতীয় খন্ড) সন্তানদের অনুপ্রেরণায় গ্রাম্য লোকেরা মুসলমান দেখিলেই তাড়াইয়া মারিতে যায়। কেহ কেহ সেই রাত্রে দলবদ্ধ হইয়া মুসলমান দিগের পাড়ায় গিয়ে তাহাদের ঘরে আগুন দিয়া সর্বস্ব লুটিয়া লইতে লাগিল।’ (প্রথম পরিচ্ছেদ, চতুর্থ খন্ড) । মূলত ‘আনন্দমঠ’-এর সন্তানদের উপরোক্ত বক্তব্যসমূহের মধ্যদিয়ে বঙ্কিম চট্টোপাধ্যায়ের উগ্র হিন্দু জাতীয়তাবাদী মতাদর্শ এবং মুসলিম বিদ্বেষী সাম্প্রদায়িক মানসিকতা প্রকাশিত হয়েছে । ‘আনন্দমঠ’-এর সন্তানেরা মুসলমানদের পরাজিত করে দেশকে মুক্ত করে। যদিও ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠিত হয়। কারণ বঙ্কিমের মতে অধীনতার জোয়াল ব্রিটিশরা চাপায়নি, চাপিয়েছে মুসলমানরাই। বস্তুত তৎকালীন রক্ষণশীল উচ্চবর্ণের বাঙালি হিন্দুরা মনে করত তাদের প্রধান শত্রু দখলকারী ব্রিটিশরা নয়, মুসলমানরাই। তাই মুসলমানদের বিতারণ করা সন্তানদের দায়িত্ব। এই হিন্দুমনই ‘আনন্দমঠ’-এর মতাদর্শগত ভিত্তি।
‘আনন্দমঠ’ এ অঙ্কিত সন্ন্যাসী তথা সন্তানেরা মাতৃভূমি ছাড়া আর কাউকে মা বলে স্বীকার করে না। সমকালীন ভারত বর্ষের দুরাবস্থা বোঝানোর জন্য বঙ্কিম চন্দ্র চট্টোপাধ্যায় দেবী কালীর এক মৌলিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তাঁর মতে দেবী কালী হলেন ভারতবর্ষের মর্যাদাহানির প্রতীক। ভবিষ্যৎ ভারতের মহত্বের বা গৌরবের উপলব্ধি হিসেবে বঙ্কিম চট্টোপাধ্যায় দেবী দুর্গার ব্যাখ্যা করেন এই বলে যে, মাতৃভূমি দেবী দুর্গা বলে তখনই প্রতিভাত হবেন যখন তাঁর সমস্ত সন্তান তাকে মা বলে সম্বোধন করবে। এভাবে দেশ ও জাতীয়তাবাদের সাথে ধর্মের সমন্বয় ঘটিয়েছেন। ‘আনন্দমঠ’-এর আর একটি সমস্যা হলো এর স্ববিরোধী বক্তব্য। এই উপন্যাসের প্রথম সংস্করণে বঙ্কিম চট্টোপাধ্যায়ের সৃষ্ট সন্তান সম্প্রদায় ব্রিটিশ বিরোধী যুদ্ধে সক্রিয় ছিল। কিন্তু দ্বিতীয় সংস্করণে বিদ্রোহের নল ঘুরে যায়। সেখানে মুসলিম শাসন বিরোধী হিসেবে সন্তানেরা আবির্ভূত হয়। ‘আনন্দ মঠ’-এর তৃতীয় সংস্করণের আগে বঙ্কিম চট্টোপাধ্যায় কোথাও বলেননি যে, ব্রিটিশ শাসন বিদ্রোহ এর মূল বক্তব্য নয়। শিশির কুমার দাশের মতে বঙ্কিম চট্টোপাধ্যায় সরকারি কর্মচারী হওয়ার ফলে সরকারি বিধি রক্ষার্থে উপন্যাসের বক্তব্যে এ ধরনের পরিবর্তন আসে। এটা যদি সত্যি হয় তাহলেও এ ঘটনা বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের লেখক সত্ত্বার চারিত্রিক দৃঢ়তা প্রশ্নবিদ্ধ করে নিঃসন্দেহে ।
লেখক: কবি ও প্রাবন্ধিক, সুনামগঞ্জ ।
০১৭৭২২৪৮২২৪
sdsubrata2022@gmail.com



