চাঁদপুর: চাঁদপুর-ঢাকা নৌপথে যাত্রীবাহী লঞ্চের ডেকের ভাড়া ২০ টাকা বাড়ানো হয়েছে। ২০০ টাকার ভাড়া এখন নেওয়া হচ্ছে ২২০ টাকা। গত দুই দিন ধরে নতুন ভাড়া কার্যকর হলেও যাত্রীদের একটি অংশ বলছেন, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির চাপ শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়ছে সাধারণ মানুষের ওপর।
অন্যদিকে লঞ্চ মালিকদের দাবি, ভাড়া বাড়িয়েও তাঁদের লোকসান কমছে না। যাত্রীসংখ্যা কমে যাওয়ায় প্রতিদিন ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত লোকসান গুনতে হচ্ছে মালিকদের। বিআইডব্লিউটিএ বলছে, সড়কপথে বাসে যাতায়াতের প্রবণতা বাড়ায় চাঁদপুর-ঢাকা নৌপথে আগের তুলনায় লঞ্চের সংখ্যাও কমেছে।
বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) দুপুর থেকে বিকেল পর্যন্ত চাঁদপুর লঞ্চঘাটে অবস্থান করে যাত্রী, লঞ্চ মালিক প্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
২০ টাকা বাড়তি ভাড়ায় ক্ষোভ যাত্রীদের :
ঢাকা থেকে চাঁদপুরে আসা এমভি রহমত লঞ্চের যাত্রী শিক্ষার্থী মো. রাশেদ বলেন, তিনি পড়াশোনার পাশাপাশি হোটেল ব্যবস্থাপনার কাজ শিখছেন। শিক্ষার্থী হিসেবে লঞ্চভাড়া বাড়ানো তাঁর জন্য স্বস্তিদায়ক নয়। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার কারণে ভাড়া বাড়ানোর বিষয়টি বুঝলেও শিক্ষার্থীদের জন্য বাড়তি ভাড়া চাপ তৈরি করছে বলে জানান তিনি।
একই লঞ্চের যাত্রী রাবে আক্তার বলেন, একজন যাত্রীর জন্য ২০ টাকা বাড়তি ভাড়া হয়তো খুব বেশি নয়। কিন্তু একটি পরিবারের কয়েকজন সদস্যকে একসঙ্গে চিকিৎসা বা অন্য প্রয়োজনীয় কাজে যাতায়াত করতে হলে বাড়তি এই খরচ বড় হয়ে দাঁড়ায়।
তিনি বলেন, ‘অনেক মানুষ চিকিৎসার খরচ মেটাতেই কষ্ট করেন। এর মধ্যে যাতায়াতের খরচ বাড়লে তাঁদের ওপর আরও চাপ পড়ে।’
লঞ্চঘাটে থাকা যাত্রী রুহুল আমিন বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার প্রভাব শুধু লঞ্চভাড়ায় সীমাবদ্ধ নেই। এর প্রভাব জীবনযাত্রার প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই পড়ছে। একের পর এক খরচ বাড়লেও সাধারণ মানুষের কথা খুব একটা ভাবা হচ্ছে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
আরেক যাত্রী আক্তার হোসেন বলেন, ‘দুই দিন আগে লঞ্চে গিয়েছিলাম, তখন ভাড়া ছিল ২০০ টাকা। আজ ২০ টাকা বেশি দিয়ে এসেছি। তর্ক করারও সুযোগ নেই। কারণ জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে।’
ভাড়া বাড়িয়েও লোকসান :
লঞ্চ মালিকদের প্রতিনিধি জিল্লুর রহমান বলেন, মূল সমস্যা হচ্ছে যাত্রীসংখ্যা কমে যাওয়া। বর্তমানে যে সংখ্যক যাত্রী নিয়ে লঞ্চ চলাচল করে, তাতে পরিচালন ব্যয় ওঠে না।
তিনি বলেন, ‘লঞ্চের জ্বালানি, শ্রমিক-কর্মচারীসহ অন্যান্য খরচ রয়েছে। কিন্তু যাত্রী কম থাকায় মালিকদের প্রতিদিন ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত লোকসান হচ্ছে।’
তাঁর দাবি, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে লঞ্চ পরিচালনার ব্যয় বেড়েছে। সে কারণে ভাড়া সমন্বয় করা হয়েছে। তবে ভাড়া বাড়ানোর পরও যাত্রীসংখ্যা বাড়েনি।
কমেছে লঞ্চের সংখ্যাও :
চাঁদপুর-ঢাকা নৌপথে লঞ্চ কমে যাওয়ার বিষয়টিও সামনে এসেছে। বিআইডব্লিউটিএ চাঁদপুর নৌ নিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা বিভাগের উপপরিচালক বাবু লাল বৈদ্য বলেন, লঞ্চঘাটের অনেক যাত্রী এখন সড়কপথে যাতায়াত করছেন। লঞ্চের তুলনায় বাসে সময় কম লাগায় যাত্রীদের একটি অংশ সড়কপথকে বেছে নিচ্ছেন।
তিনি বলেন, আগে চাঁদপুর-ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ নৌপথে প্রায় ৪০টি লঞ্চ চলাচল করত। বর্তমানে এ সংখ্যা কমে প্রায় ৩৫টিতে দাঁড়িয়েছে।
বাবু লাল বৈদ্য জানান, বর্তমানে চাঁদপুর থেকে প্রতিদিন প্রায় ১৬টি লঞ্চ ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে যায়। একইসংখ্যক লঞ্চ আবার ঢাকা থেকে চাঁদপুরে ফিরে আসে।
নৌপথে যাত্রী কমার পেছনে সড়কের প্রতিযোগিতা :
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চাঁদপুর-ঢাকা যাতায়াতে নৌপথের পাশাপাশি সড়কপথও গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠেছে। বাসে তুলনামূলক কম সময়ে গন্তব্যে পৌঁছানো যায় বলে অনেক যাত্রী এখন সড়কপথে যাতায়াত করছেন। এতে নৌপথে যাত্রী কমার পাশাপাশি লঞ্চের সংখ্যাও ধীরে ধীরে কমেছে।
এর সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হয়েছে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি। ফলে একদিকে লঞ্চ পরিচালনার ব্যয় বাড়ছে, অন্যদিকে যাত্রী কম থাকায় আয় কমছে। এই পরিস্থিতিতে ভাড়া বাড়িয়েও লোকসান কাটিয়ে উঠতে পারছেন না বলে দাবি লঞ্চ মালিকদের।
অন্যদিকে যাত্রীদের ভাষ্য, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব সামলাতে ভাড়া বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও এতে সাধারণ যাত্রীদের ব্যয় আরও বাড়ছে। বিশেষ করে নিয়মিত যাতায়াতকারী শিক্ষার্থী, নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষ এবং চিকিৎসার প্রয়োজনে পরিবার নিয়ে যাতায়াতকারীদের ওপর এর প্রভাব পড়ছে।
ফম/এমএমএ/


