অনিয়মের আখড়া মতলব দক্ষিণ উপজেলা সাব-রেজিষ্ট্রার অফিস

ঘুষ ও দুর্নীতিতে জড়িত সিন্ডিকেট

চাঁদপুর : চাঁদপুরের মতলব দক্ষিণ উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে সেবা নিতে গিয়ে পদে পদে ভোগান্তি ও অতিরিক্ত অর্থ গুনতে হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন সেবাগ্রহীতারা। নির্ধারিত সরকারি ফির বাইরে বিভিন্ন কাজে অতিরিক্ত টাকা নেওয়া, সময়মতো দলিলের নকল সরবরাহ না করা এবং একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেটের মাধ্যমে নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে সরকারি এ কার্যালয়ের বিরুদ্ধে। দীর্ঘদিন ধরে এসব অনিয়ম চলে আসায় তা অনেকটা নিয়মে পরিণত হয়েছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।

সরেজমিন পরিদর্শন ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এসব অভিযোগের চিত্র পাওয়া গেছে। একাধিক দলিল লেখক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, তাঁরা দীর্ঘদিন ধরে এ পেশায় যুক্ত। কিন্তু কার্যালয়ের কিছু অনিয়ম এখন নিয়মে পরিণত হয়েছে। ফলে অনেক সময় সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকেও অতিরিক্ত অর্থ নিয়ে কাজ সম্পন্ন করতে হয়।

অভিযোগ রয়েছে, দলিল সম্পাদনের সময় ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ের ‘ফিঙ্গারিং’ সম্পন্ন করতে জনপ্রতি ২০০ টাকা করে নেওয়া হয়। এই অর্থ সাব-রেজিস্ট্রারের খাস কামরায় নেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, ওই কক্ষের বাইরে আঙুলের কালি দিয়ে কালো হয়ে থাকা অংশও এর একটি দৃশ্যমান প্রমাণ।

এ ছাড়া দলিলের নকল (সার্টিফায়েড কপি) নিতে গেলে সরকারি নির্ধারিত ফির অতিরিক্ত অর্থ দিতে হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। অতিরিক্ত অর্থ দেওয়ার পরও নির্ধারিত সময়ে দলিলের নকল সরবরাহ করা হয় না—এমন অভিযোগও করেছেন কয়েকজন সেবাগ্রহীতা।

শুধু সেবা প্রদানের ক্ষেত্রেই নয়, সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ভুয়া দলিল সম্পাদন এবং সেই দলিল ব্যবহার করে ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগও রয়েছে।

মতলব দক্ষিণের এক প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী অভিযোগ করেন, বড় অঙ্কের একটি দলিল সম্পাদনের জন্য তিনি এ কার্যালয়ে গেলে নির্ধারিত সরকারি রাজস্বের বাইরে তাঁর কাছে আরও ৩ লাখ টাকা দাবি করা হয়। তিনি ওই অতিরিক্ত অর্থ দিতে রাজি না হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে আপত্তি জানান।

ওই ব্যবসায়ীর ভাষ্য, দলিল করতে আসা ব্যক্তির আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনা করে অতিরিক্ত অর্থের অঙ্ক নির্ধারণ করে সিন্ডিকেট। দীর্ঘদিন ধরে এভাবে টাকা নেওয়া হলেও বিষয়টি এখন অনেকের কাছে স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, অতিরিক্ত অর্থের একটি অংশ সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে ভাগ-বাটোয়ারা করা হয়।

অনুসন্ধানে সংশ্লিষ্টরা অভিযোগ করেন, এ কার্যালয়ে দীর্ঘদিন ধরে এক্সট্রা মোহরার পদে কর্মরত সাহিদা আক্তার স্বপ্নাকে ঘিরে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। তিনি স্থানীয় বাসিন্দা হওয়ায় কার্যালয়ে প্রভাব বিস্তার করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তাঁর সহযোগী হিসেবে অফিস সহায়ক মোহাম্মদ ইব্রাহীম ও নাসির হোসেনের নামও এসেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায়সহ বিভিন্ন কাজে এই সিন্ডিকেট সক্রিয়।

অভিযোগ রয়েছে, কার্যালয়ের অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করতে গেলে সাংবাদিকদেরও বিভিন্নভাবে বুঝিয়ে বিদায় করার চেষ্টা করা হয়। এ ক্ষেত্রে অনিয়মের অর্থ ব্যবহার করা হয় বলেও অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। এসব অভিযোগের পক্ষে তথ্য-প্রমাণ সংরক্ষিত রয়েছে বলে জানা গেছে।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে এক্সট্রা মোহরার সাহিদা আক্তার স্বপ্না অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেন। তাঁর বক্তব্য সাব-রেজিস্ট্রার আরিফুর রহমানের কাছে জানানো হলে তিনি বলেন, দলিল সম্পাদনের জন্য সেবাগ্রহীতার কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা চাওয়ার বিষয়টি সাহিদা তাঁর কাছে অস্বীকার করেছেন। তাঁর ভাষ্য, ‘প্রমাণ করতে পারলে করুক। না হলে আমার বিরুদ্ধে যা মন চায় লিখুক।

সাব-রেজিস্ট্রার আরিফুর রহমান বলেন, সরকারি দপ্তর নির্ধারিত নিয়মের মধ্যেই পরিচালিত হয়। নিয়মিত দাপ্তরিক কাজে তাঁকে ব্যস্ত থাকতে হয়। দীর্ঘদিন ধরে কোনো অনিয়ম চলে এলে তা একজনের পক্ষে দ্রুত পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। কোনো অনিয়ম হয়ে থাকলে তা পরিবর্তনে সময় প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

সেবাগ্রহীতাদের অভিযোগ, সরকারি কার্যালয়ে নির্ধারিত ফি দিয়ে সেবা পাওয়ার অধিকার থাকলেও অতিরিক্ত অর্থ না দিলে কাজ বিলম্বিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। ফলে অনেকে বাধ্য হয়ে বাড়তি টাকা দেন। তাঁদের দাবি, এসব অভিযোগ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের সেবাব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা হোক।

ফম/এমএমএ/

সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট | ফোকাস মোহনা.কম