মেঘনা নদীতে ফের সক্রিয় অপরাধচক্র

নৌযানে চাঁদাবাজি, অবৈধ বালু উত্তোলন ও চোরাই জ্বালানি বেচাকেনার অভিযোগ

চাঁদপুর: মেঘনা নদীর চাঁদপুর নৌ সীমানায় জাহাজে সাত খুনের ঘটনার পর প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তৎপর হয়ে উঠলেও কিছুদিন পর সেই তৎপরতা অনেকটাই থেমে গেছে। এর সুযোগে নৌযানে চাঁদাবাজি, অবৈধভাবে বালু উত্তোলন, চোরাই জ্বালানি কেনাবেচাসহ নানা অপরাধে ফের সক্রিয় হয়ে উঠেছে একটি সংঘবদ্ধ চক্র। এসব কর্মকাণ্ডে চিহ্নিত বালু ব্যবসায়ী, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও নৌ পুলিশের কিছু সদস্যের জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে।

সরেজমিনে মেঘনা নদীর উপকূলীয় এলাকা ঘুরে এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে দিনের বেলায় মেঘনা নদীতে একটি জাহাজে সাতজনকে হত্যার ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নদীতে তৎপরতা বাড়ালেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা কমে আসে। ফলে নদীকেন্দ্রিক অপরাধী চক্র আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

হাইমচর থেকে মতলব উত্তর উপজেলার ষাটনল পর্যন্ত মেঘনা নদীর বিভিন্ন এলাকায় রাতের আঁধারে গোপনে চলছে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন। একই সঙ্গে নোঙর করা নৌযান থেকে টোল আদায়ের আড়ালে বিভিন্ন নৌযান থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগও রয়েছে।

চাঁদপুর নৌ সীমানায় হরিণা থেকে দক্ষিণে হাইমচর, বড় স্টেশন থেকে হরিণা এবং চাঁদপুর লঞ্চঘাট থেকে মতলবের ষাটনল পর্যন্ত—এই তিন অংশে নোঙর করা নৌযান থেকে টোল আদায়ের জন্য ইজারা দেওয়া হয়েছে। তবে অভিযোগ রয়েছে, ইজারার আওতায় না থাকা চলমান নৌযান থেকেও চাঁদা আদায় করা হচ্ছে।

মতলব উত্তর অংশে মহসীন নামে এক ব্যক্তি টোল আদায়ের ইজারা নিয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, সেখানে লাইটার জাহাজ কিংবা অন্য কোনো নৌযান নোঙর না করলেও চলমান নৌযান থেকে চাঁদা আদায় করা হয়। স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, বিগত বছরগুলোতে বালুবাহী বাল্কহেডসহ বিভিন্ন নৌযান থেকে চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে মারধর ও গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে।

এদিকে মতলব উত্তর উপজেলার ষাটনল থেকে চাঁদপুর সদর এলাকার চরাঞ্চল এবং মুন্সীগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় রাতের বেলায় ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে। ষাটনল ইউনিয়নের নদীর পাড়ে দিনের বেলায় বেশ কিছু ড্রেজার এনে রাখা হয়। রাত হলে সেগুলো নির্দিষ্ট এলাকায় নিয়ে বালু উত্তোলন করা হয়।

স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব ড্রেজারের কয়েকটি বিভিন্ন অভিযানে মোহনপুর নৌ পুলিশ ফাঁড়ির আওতায় জব্দ করা হলেও অন্য ড্রেজারগুলো দিনের বেলায় প্রকাশ্যেই এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় স্থানান্তর করা হচ্ছে।

একই এলাকায় দিন-রাত চলছে চোরাই জ্বালানি কেনাবেচা। অভিযোগ রয়েছে, নোঙর করা নৌযান থেকে অবৈধভাবে জ্বালানি কিনে একটি সংঘবদ্ধ চক্র নদী এলাকায় তা বিক্রি করছে। এ কাজে কালাকান্দা ইউনিয়নের প্যানেল চেয়ারম্যান মেহেদীর সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে টোল ইজারাদার মহসীনের বিরুদ্ধেও এই ব্যবসায় জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে।

তবে মেহেদী অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘‘এই এলাকায় নদী থেকে টোল আদায় করেন মহসীন। তাঁর নামেই ইজারা রয়েছে।’’

নদীতে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের ঘটনায় কাজী মতিন ও কিবরিয়া মিজির নামও স্থানীয়ভাবে আলোচিত। তাঁদের বিরুদ্ধে বালু উত্তোলনকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ ও প্রাণহানির ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। এসব ঘটনায় মামলাও হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে।

অভিযোগের বিষয়ে কাজী মতিন বলেন, ‘‘বালু উত্তোলনের কাজে আমি জড়িত। তবে চাঁদপুরে নয়। অন্য জায়গায় আমাদের এই ব্যবসা রয়েছে। আমার বিরুদ্ধে যারা তথ্য দিয়েছে, সেসব তথ্য সঠিক নয়। আপনারা তথ্য যাচাই করে দেখতে পারেন।’’

নদীর অপরাধ নিয়ন্ত্রণে একাধিক নৌ পুলিশ ফাঁড়ি ও থানা থাকলেও এসব কর্মকাণ্ডে জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান অভিযান না থাকার অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, নৌ পুলিশের কিছু অসাধু কর্মকর্তা ও সদস্য এসব অপরাধীর কাছ থেকে নিয়মিত অনৈতিক সুবিধা নেন।

মোহনপুর নৌ পুলিশ ফাঁড়ির এএসআই রুহুল আমিনের বিরুদ্ধে নদীর অপরাধচক্রের কাছ থেকে নিয়মিত চাঁদা আদায়ের অভিযোগও রয়েছে। তবে এএসআই রুহুল আমিন অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

মোহনপুর নৌ পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ পুলিশ পরিদর্শক মো. রহুল আমিন বলেন, নদীতে চাঁদাবাজি হয়—এমন বিষয় তাঁর জানা নেই। নদীতে বালু উত্তোলনের ঘটনা একবার জানতে পেরেছিলেন, তবে বর্তমানে কেউ বালু উত্তোলন করছে না বলে দাবি করেন তিনি।

তবে তাঁর অধীনস্থ এএসআই রুহুল আমিনের ছোটখাটো টাকা উত্তোলনের বিষয়টি তিনি স্বীকার করেছেন। একই সঙ্গে বিষয়টি জানাজানি না করার জন্য অনুরোধ করেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

স্থানীয় একাধিক সূত্রের অভিযোগ, মতলব উত্তর অংশে মেঘনা নদীতে চলা বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা নিয়মিত মোহনপুর নৌ পুলিশ ফাঁড়িতে যাতায়াত করেন এবং সেখানে অনৈতিক সুবিধা দিয়ে থাকেন। নদী থেকে এএসআই রুহুল আমিন যে টাকা উত্তোলন করেন, সেসব অর্থও ফাঁড়িতে জমা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে এসব অর্থ ওপরের বিভিন্ন পর্যায়ে ভাগাভাগি হয় বলেও অভিযোগ স্থানীয়দের।

তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে নৌ পুলিশ চাঁদপুর অঞ্চলের পুলিশ সুপারের বক্তব্য জানতে তাঁর কার্যালয়ে গিয়ে তাঁকে পাওয়া যায়নি। পরে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। ফোন রিসিভ না করায় ক্ষুদেবার্তার মাধ্যমে বক্তব্য জানতে চাওয়া হয়। বার্তাগুলো দেখা হলেও তিনি কোনো জবাব দেননি।

এদিকে চাঁদপুর বন্দর ও পরিবহন কর্মকর্তা মো. কামরুজ্জামান বলেন, চাঁদপুর নৌ সীমানায় গত সাত থেকে আট বছর ধরে নোঙর করা নৌযান থেকে টোল আদায়ের জন্য তিন ভাগে ইজারা দেওয়া হয়েছে। তবে নোঙর করা ছাড়া কোনো নৌযান থেকে টোল আদায়ের সুযোগ নেই।

নদীপথে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত অভিযান এবং অবৈধ বালু উত্তোলন, চাঁদাবাজি ও চোরাই জ্বালানি ব্যবসার বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া হলে মেঘনা আবারও অপরাধীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থলে পরিণত হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।

ফম/এমএমএ/

সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট | ফোকাস মোহনা.কম