।। আলী হাবিব।। স্বাধিকার আন্দোলন থেকে স্বাধীনতা অর্জন, সব আন্দোলন-সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়ে যে দলটি একটি জাতির অগ্রযাত্রায় সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে একই সমান্তরালে পথ হেঁটেছে-সেই দলের নাম বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠা। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী হন পাকিস্তান কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের কনভেনর। মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ছিলেন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সভাপতি।
জনকল্যাণের ব্রত নিয়ে ঢাকার রোজ গার্ডেনে যে দলটির আত্মপ্রকাশ, ১৯৭১ সালে এই দলটির নেতৃত্বেই স্বাধীন হয় বাংলাদেশ। বাঙালি জাতিকে সংগঠিত করে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে গেছে দলটি। স্বাধীনতা অর্জনের পর আত্মনির্ভরশীল হওয়ার কঠিন লড়াইয়েও বাঙালির ঐক্য ধরে রাখার কাজটি করেছে এই দল। অর্জন করেছে জনমানুষের আস্থা।
শুরুতে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ নামে প্রতিষ্ঠা পেলেও অসাম্প্রদায়িক চেতনায় ১৯৫৫ সালে কাউন্সিলের মাধ্যমে দলের নাম থেকে ‘মুসলিম’ শব্দ বাদ দেওয়া হয়। নতুন নামকরণ হয় পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ। ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দিয়ে দলকে একটি অসাম্প্রদায়িক দলে রূপান্তর করা হয়। তখন এটি নিঃসন্দেহে ছিল একটি সাহসী সিদ্ধান্ত। নয়াদিল্লির ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব সোশ্যাল সায়েন্স রিসার্চের সিনিয়র ফেলো শ্যামলী ঘোষ লিখেছেন, “১৯৫৫ সালের কাউন্সিল অধিবেশনে দলের নাম থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাহার করা হলে ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে সকলের জন্য দলের সদস্য পদ লাভের পথ উন্মুক্ত হয়। ১৯৫৩ সালের জুলাই মাসে কাউন্সিল অধিবেশনে সর্বপ্রথম বিষয়টি উত্থাপিত হলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য ভাসানী কর্তৃক জনমত যাচাই না হওয়া পর্যন্ত প্রশ্নটি অমীমাংসিত থাকে। …যুক্ত নির্বাচনের জন্য আওয়ামী লীগের যে দাবি ছিল তারই অনুসরণে দলের ধর্মনিরপেক্ষতাকরণে বিষয়টি ছিল একটি পদক্ষেপ। ” (‘আওয়ামী লীগ ১৯৪৯-১৯৭১’ : শ্যামলী ঘোষ, পৃষ্ঠা ২২)। অসাম্প্রদায়িক প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক দল হিসেবে আওয়ামী মুসলিম লীগ থেকে আওয়ামী লীগের নতুন যাত্রা নিঃসন্দেহে একটি বড় রাজনৈতিক উত্তরণ।
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ একটি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান। শুদ্ধ রাজনীতিচর্চার মধ্য দিয়ে দলটির পথচলা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে বারবার রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের কথাই বলেছেন। তিনি লিখেছেন, “…কোথায়ও হল বা জায়গা না পেয়ে শেষ পর্যন্ত হুমায়ুন সাহেবের রোজ গার্ডেন বাড়িতে সম্মেলনের কাজ শুরু হয়েছিল। …সকলেই একমত হয়ে নতুন রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান গঠন করলেন; তার নাম দেওয়া হলো ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ’। …আমি মনে করেছিলাম পাকিস্তান হয়ে গেছে, সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের দরকার নেই। একটা অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান হবে, যার একটা সুষ্ঠু ম্যানিফেস্টো থাকবে। ” (‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’, পৃষ্ঠা ১২১ ও ১২২)।
বাঙালির নিজস্ব রাজনৈতিক দল তথা পাকিস্তানের প্রথম বিরোধী দল হিসেবেই আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠা পায়। ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা তথা সকল ধর্মের স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ ও অসাম্প্রদায়িক রাজনীতি। ’-এগুলোই হচ্ছে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের মূলনীতি। লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হচ্ছে-১. গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংহত করা এবং রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতা সমুন্নত রাখা। ২. প্রজাতন্ত্রের মালিক জনগণ। জনগণের সাংবিধানিক অধিকার প্রতিষ্ঠা ও সংরক্ষণ করা। ৩. রাষ্ট্রের সব নাগরিকের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তি এবং কল্যাণ নিশ্চিত করা। ৪. মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় একটি অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থা গড়ে তোলা। ৫. বাংলাদেশকে একটি উন্নত রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বে তুলে ধরা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে দলটি গড়ে ওঠে অসাম্প্রদায়িক সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক দল হিসেবে। আর তাঁর কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দলটি মডার্ন ও সেক্যুলার ডেমোক্রেটিক পার্টি। যেকোনো সংকটে আওয়ামী লীগের ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তি আছে এবং নেতৃত্ববিহীন অবস্থায় নতুন নেতা তৈরির সক্ষমতা আছে। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর চরম নেতৃত্বহীন অবস্থায়ও দলটি নতুন নেতৃত্ব তৈরিতে সক্ষমতা দেখিয়েছে। হাসিনা-নেতৃত্ব উঠে এসেছে।
বাংলাদেশে যখনই আওয়ামী লীগ নির্বাচনে জয়লাভ করে সরকার গঠন করেছে, তখনই বাংলাদেশের মানুষ লাভবান হয়েছে। ২০০৯ থেকে ২০২২, গত ১৪ বছরে অভূতপূর্ব আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের কারণে বাংলাদেশ বিশ্বের দৃষ্টি কেড়েছে। বাংলাদেশ এখন সারা বিশ্বে একটি উন্নয়নের রোল মডেল। কভিড পরিস্থিতি মোকাবেলার পর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট বৈশ্বিক মন্দাও কাটিয়ে উঠতে চলেছে। আর এই অর্জনের পেছনে অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে গঠিত সরকার। আর এই দলের নেতৃত্বে আছেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা।
জনসমর্থন হচ্ছে রাজনৈতিক দলের শিকড়। আওয়ামী লীগ সম্পর্কে বলা চলে, এই দলটির ইতিহাসই হচ্ছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাস।
বঙ্গবন্ধুর লক্ষ্য ছিল সোনার বাংলা গড়া। শেখ হাসিনা সেই লক্ষ্যের উত্তরণ ঘটিয়েছেন ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে। বাংলাদেশকে শুধু উন্নয়নশীল দেশ নয়, একটি উন্নত দেশে উন্নীত করার লক্ষ্য তাঁর।
বঙ্গবন্ধু অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছেন। দেশের মানুষের দুঃখ-দুর্দশা লাঘব করে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন শোষিতের গণতন্ত্র। সেই অসাম্প্রদায়িক উন্নত বাংলাদেশ গড়ার পাশাপাশি দেশের মানুষের সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতেই বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কোনো বিকল্প নেই। দুটি কারণও তুলে ধরা যেতে পারে। একটি অর্থনৈতিক, অন্যটি রাজনৈতিক। আন্দোলন-সংগ্রামের পথে ইতিবাচক আলো ফেলেছে বাঙালির রাজনৈতিক বাতিঘর ঐতিহ্যবাহী বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ।
আজকের বাংলাদেশ এক বদলে যাওয়া বাংলাদেশ। নিঃসন্দেহে এই বদলে যাওয়া বাংলাদেশের রূপকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত স্বাধীনতা ছিল বাঙালির মহত্তম অর্জন। স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উন্নয়নশীল দেশে বাংলাদেশের উত্তরণ নিঃসন্দেহে আলাদা তাৎপর্য বহন করে। বাঙালির এই অর্জনে যিনি নেতৃত্ব দিয়েছেন, তিনি বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তাঁর নেতৃত্বেই রাজনৈতিক দল হিসেবে ভূমিকা রাখছে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। দলে তাঁর নেতৃত্ব নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই। তাঁর বিকল্পও তিনি নিজে। বিদেশি পর্যবেক্ষকরাও বিভিন্ন সময়ে উল্লেখ করেছেন যে দক্ষিণ এশিয়ায় শেখ হাসিনার নেতৃত্ব অতুলনীয়।
জনগণের জন্য, জনগণ দ্বারা প্রতিষ্ঠিত এই দলটির প্রতি জনগণের আস্থা আছে। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ বহতা নদীর মতো। চলার পথে দলটির গতি বাধাগ্রস্ত হয়েছে, বাঁকবদল হয়েছে, কর্মসূচিতে পরিবর্তন এসেছে, কিন্তু লক্ষ্য থেকে সরেনি দলটি। আওয়ামী লীগ অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ২২তম জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে আজ। সম্মেলনের স্লোগান হচ্ছে, ‘উন্নয়ন অভিযাত্রায় দেশরত্ন শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের উন্নত, সমৃদ্ধ ও স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়।
আজকের সম্মেলন থেকে অসাম্প্রদায়িক উদারনৈতিক আদর্শে প্রাণিত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ গণমুখী ইতিবাচক রাজনীতির পথে নতুন যাত্রা শুরু করবে, এটাই প্রত্যাশা।
লেখক : সাংবাদিক, ছড়াকার, habib.alihabib@gmail.com



