সততা ন্যায়পরায়ণতা ও আদর্শবাদিতা ঢাকা পড়ে চলছে নীতিহীনতার জয়জয়কার

।। মোঃ মহসিন হোসাইন ।। মানুষ শব্দের দ্বিতীয় ক্রিয়াপদ ‘মানুষ হওয়া।’ মানুষ হওয়া মানে সত্য বলা, কারও ক্ষতি না করা, প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা, বিপদে-আপদে অন্যকে সাহায্য করা ও সদাচরণ ইত্যাদি। এমন গুণসম্পন্ন মানুষ সমাজে বিরল নয়, আবার সুলভও নয়। বস্তুত মানুষ হিসেবে ভুল-ত্রুটি নিয়েই আমাদের জীবন, ভালো-মন্দ মিলিয়েই আমাদের বেঁচে থাকা। তার পরও এই সমাজে রয়েছে মানুষের নানা রূপ। ক্রমান্বয়ে বেড়ে যাচ্ছে মিথ্যার জোয়ার। যেন মিথ্যা ছাড়া কিছুই বুঝেনা তারা।

তবে ভালো-মন্দের ধারণা অনেকটা আপেক্ষিক। আমার কাছে যা ভালো, অন্যজনের কাছে তা ভালো নাও হতে পারে। আমার কাছে যা মন্দ তা আরেকজনের কাছে মন্দ নাও হতে পারে। তারপরও নৈতিকতার সার্বজনীন গ্রহণযোগ্য একটা সংজ্ঞা আছে। ওই সংজ্ঞার আলোকে বলা যায়, ‘নিজের বিবেককে কাজে লাগিয়ে যে ব্যক্তি তার নৈতিক দায়িত্বগুলো যথাযথভাবে পালন করেন, চরিত্রের ভালো উপাদানগুলো গ্রহণ ও মন্দ উপাদানগুলো বর্জন করেন তিনিই প্রকৃত অর্থে ভালো মানুষ।’

আমরা সবাই ভালো মানুষ হতে চাই, এমনকি সমাজের চিহ্নিত সন্ত্রাসী কিংবা দুষ্টু প্রকৃতির লোকটিও কথায় কিংবা আলাপচারিতায় ভালো মানুষের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। এভাবে সমাজের সবাই ভালো মানুষ হতে চায়। কারণ, ভালো মানুষের সুফল সমাজের সবাই ভোগ করেন। এখন প্রশ্ন হলো, স্বপ্নের সেই ভালো মানুষ কোথায়? তারা হলেন, আপনি, আমি, সে, তারা। মনে রাখতে হবে, ভালো মানুষ আকাশ থেকে আসবে না। এই সমাজ থেকে ভালো মানুষের দেখা মিলবে। তাহলে ভালো মানুষ হওয়ার জন্য কী কী প্রয়োজন? তার জন্য কোনো টাকার দরকার হয় না। আমার-আপনার মনের সুপ্ত ইচ্ছাশক্তি, দৃঢ় চেতনা মনোবলই পারে ভালো মানুষ বানাতে। কিন্তু সে মনেবালটা আমাদের মধ্য থেকে দিনদিন হারিয়ে যাচ্ছে। শুরু হচ্ছে মানুষের কষ্টের হাহাকার।

কিন্তু বর্তমানে সততা ন্যায়পরায়ণতা আদর্শবাদিতা এসব শব্দ এখন দিনদিন হারিয়ে যাচ্ছে। সমাজের সর্বত্র চলছে নীতিহীনতার জয়জয়কার। আগে পাঠ্যপুস্তকে নীতিকথা ছিল। নীতিকথা থাকা মানে হচ্ছে, ব্যক্তিজীবনে তা অনুসরণ করা। কেবল পাঠ্যপুস্তকে নয়- গুরুজন বা অভিভাবকরা শিশু-বয়স থেকেই শেখান এবং সাবধান করে দেন, সন্তানরা যাতে অসৎ পথে না চলে। ব্যক্তি সৎ ন্যায়নিষ্ঠ কর্তব্যপরায়ণ বলেই তার প্রভাব পড়ে পরিবার, সমাজে। ব্যক্তির চরিত্র ও মানস গঠনে সততা এক অপরিহার্য শর্ত।

প্রাচীন একটি দৃষ্টান্ত এখানে দেওয়া জরুরি, সচেতন পাঠকমাত্রই এ ঘটনা জানেন। বর্তমান ইরানের জিলান অ ল থেকে বাগদাদমুুখী এক কাফেলা পথিমধ্যে মরুদস্যুদের কবলে পড়ল। কাফেলার সদস্যদের সঙ্গে দস্যুদলের সংঘর্ষ হলো। কিন্তু অল্পক্ষণেই তারা দস্যুদের কাছে পরাজিত হলো। এরপর শুরু হলো লুটপাট। একে একে কাফেলার সবাই তাদের অর্থ, মূল্যবান জিনিসপত্র দস্যুদের হাতে তুলে দিতে বাধ্য হলো। দস্যুদের কয়েকজন এক পাশে শান্তভাবে উপবিষ্ট সাধারণ চেহারা এক বালকের কাছে এসে জিজ্ঞাসা করল- ‘তোমার কাছে কি কোনো কিছু আছে?’ বালক উত্তর দিল, ‘হ্যাঁ, আমার কাছে ৪০টি দিনার আছে।’ দস্যুরা এ কথা শুনে বালকের কাপড়-চোপড়, বিছানা তন্নতন্ন করে অনুসন্ধান করল। কিন্তু কিছুই পেল না। তারা ভাবল, বালকটি তাদের বোকা বানিয়েছে তারা অন্যদের তল্লাশি করতে চলে গেল। তল্লাশি শেষ করে এবং লুটের মালামাল এক জায়গায় জড়ো করে দস্যুরা অদ্ভুত বালকটির কথা তাদের সরদারকে জানাল। বালককে সঙ্গে সঙ্গে সরদারের কাছে উপস্থিত করা হলো। সরদার তাকে জিজ্ঞাসা করল- ‘তুমি নাকি বলেছ, তোমার কাছে ৪০টি দিনার আছে?’ বালক নির্ভীকচিত্তে জবাব দিল, ‘হ্যাঁ আছে।’ সরদার পুনরায় জানতে চাইল, ‘তাহলে দিনারগুলো কোথায়?’ বালক সঙ্গে সঙ্গে তার জামার ভেতরের দিকে একটি অংশ খুলে দিনারগুলো বের করলে দস্যুরা বিস্মিত হলো। সরদার তাকে পুনরায় জিজ্ঞাসা করল, ‘কিন্তু তুমি তোমার মূল্যবান অর্থের কথা ফাঁস করে দিলে কেন? তুমি অন্যভাবে বললে তো কেউ তোমাকে সন্দেহ করত না।’ বালকটি উত্তর দিল, ‘আমার মা যিনি দিনারগুলো জামার ভেতর সেলাই করে দিয়েছেন, তিনি আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন কখনো মিথ্যা কথা না বলার জন্য।’ বালকের অদ্ভুত ব্যবহারে দস্যু সরদার হতবাক হয়ে গেল, বালকটি বিপদের মধ্যে পড়েও তার মায়ের ইচ্ছা পূরণ করেছে। তার জন্য এটা ছিল এক মহান অভিজ্ঞতা এবং তার জীবনের মোড় পরিবর্তনের জন্য অনিবার্য ছিল। সরদার জানাল, ‘এই ছোট্ট বালক তার মায়ের প্রতি কত অনুগত, আর আমি সৃষ্টিকর্তারও অবাধ্য।’ সরদারের হৃদয় বিষাদে ভরে গেল এবং তার চোখ দিয়ে অশ্র ঝরতে লাগল। সরদার কাফেলার সদস্যদের তাদের কাছ থেকে লুণ্ঠিত মালামাল ফেরত দেওয়ার জন্য দস্যুদের নির্দেশ দিয়ে দস্যুবৃত্তির ঘৃণ্য জীবন চিরতরে পরিত্যাগ করল। এই বালকের নাম আবদুল কাদের। যিনি ইসলামী বিশ্বের বিখ্যাত সাধকে পরিণত হয়েছিলেন তিনি এবং সারা মুসলিম বিশ্বে ‘বড়পীর’ হিসেবে খ্যাত।

এই গল্পটা বলার অর্থ এই যে, সমাজে এমনও মানুষ রয়েছে, যিনি মিথ্যা, প্রতারণা, ছলচাতুরী এসবের মধ্যে নেই। সংখ্যায় কম হলেও সৎ ও ন্যায়পরায়ণ মানুষ সমাজে এখনো রয়েছে। একজন মানুষ যদি কেবল সত্য কথা বলে তাহলে তার পক্ষে কোনো অন্যায় কাজ করাই সম্ভব নয়। আমাদের নবী করিম (সা.) আল-আমিন খেতাব পেয়েছিলেন। সেজন্য কাফেররাও তাদের মূল্যবান মালামাল গচ্ছিত রাখত। কেউ কেউ এও বলেন সমাজে ন্যায়পরায়ণতা ও সততা রয়েছে বলে সমাজ এখনো টিকে আছে। প্রশ্ন হচ্ছে- বর্তমান সমাজ কতটা সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত। একজন রিকশাচালক বললেন, ‘ঢাকা শরের সবাই খালি মিথ্যা কথা কয়।’ এর সরল অর্থ হচ্ছে নাগরিকজীবন মিথ্যার ওপর প্রতিষ্ঠিত। মিথ্যা বলে অসততার আশ্রয় নিয়ে দুর্নীতি মানুষ, দখল, চাঁদাবাজির মাধ্যমে মানুষ টাকার পাহাড় গড়ে তুলেছে।

আবার কিছু সংখ্যক মানুষ, যারা ভাব প্রকাশ করে মানুষের কিন্তু কাজকর্ম বেশির ভাগই অমানুষদের মত। তারা সৎ উপায় অবলম্বন করে মানুষের কাছে আসে, যখন সে মানুষের মনের মধ্যে প্রবেশ করে তখনই বেরিয়ে আসে তার আসল চরিত্র। ধীরে ধীরে মানুষের ক্ষতি করতে ব্যস্ত হয়ে পরে। সেও কিন্তু নীতিবান। যদিও সে উপরে নীতিবান, ভিতরে কাল সাপ থেকেও বেশি মারাত্মক। তাই এসব মানুষ থেকেও দূরে থাকাই বুদ্ধিমানের কাজ। যদিও প্রথমে তাদের চেনা যায় না। চিনে যাওয়া মাত্র তাদেরকে কাছ থেকে সরিয়ে দিতে হবে।

এদিকে মিথ্যাকে সব পাপের জননী বলা হয়। একটি মিথ্যা থেকে শতশত পাপের সূত্রপাত হয়। তাই খুব সাধারণ বিষয়েও মিথ্যা কথা বলা ঠিক নয়। এতে করে যে কেউ ধীরে ধীরে মিথ্যা বলায় অভ্যস্ত হয়ে যায়। তখন মিথ্যা কথা বলতে আর দ্বিধাবোধ করে না। যে কোনো বিষয়ে মুখ দিয়ে অকপটে মিথ্যা বের হয়ে আসে।

আমরা যতই তাদের শিক্ষা দিয়ে থাকি, মিথ্যা বলা মহাপাপ কিন্তু নিজেরাই যদি মিথ্যা বলা থেকে বের না হয়ে আসতে পারি, তাহলে তারাও আমাদের থেকে মিথ্যা কথা বলা শিখে যায়। তথ্যপ্রযুক্তির এ যুগে মিথ্যা বলাটা সহজ হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে মোবাইল কল বা মেসেজে। ঘরে অবস্থান করে বলে বাইরে। বাইরে কোথাও ঘুরতে গিয়ে বলা হয় অফিসে বা কর্মস্থলে। ধর্ম-কর্মে মিথ্যার মাধ্যমে ধোঁকাবাজি প্রতিনিয়ত চলছেই। মিথ্যা এতটাই ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে যে, এটা কিছু লোকের অবিচ্ছেদ্য স্বভাবে পরিণত হয়েছে। আমরা মিথ্যার এত কাছাকাছি বাস করছি,

ভালো মানুষ হতে হলে আন্তরিকতা, নিষ্ঠা, সদিচ্ছা থাকাটা আবশ্যকীয়। এ ছাড়া সত্য কথা বলা, পরোপকার করা, ক্ষমা করা, হিংসা-বিদ্বেষ-লোভ ত্যাগ করা, অন্যের হকসমূহ আদায় করা, ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলা, খারাপ অভ্যাস পরিত্যাগ করা, ভালো কাজ করা, ইতিবাচক মনোভাব থাকা, নিজের ভুলের স্বীকৃতি দেওয়াসহ মহান সৃষ্টিকর্তার আদেশাবলি মেনে চলা ও নিষেধাবলি পরিত্যাগ করার মাধ্যমে ভালো মানুষ হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করতে হবে।

ভালো মানুষ হতে হলে আমাদের শরীর বা দেহের ওপর বিবেকের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সরল দৃষ্টিতে ভালো মানুষ হওয়া খুবই কষ্টের। তবে ভালো মানুষ হওয়া যদিও কষ্টের কিন্তু অমানুষ হওয়া মানুষ হওয়ার চেয়ে আরও অনেক বেশি কষ্ট ও লাঞ্ছনার বিষয়। এবার সিদ্ধান্ত নিন, কোনটা আপনি গ্রহণ করবেন

লেখক পরিচিতি : মোঃ মহসিন হোসাইন
লেখক, কলামিস্ট ও সাংবাদিক
কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক- বাংলাদেশ তৃণমূল সাংবাদিক কল্যাণ সোসাইটি
কেন্দ্রীয় সভাপতি- মানবতার ডাক সাহিত্য পরিষদ

ফোকাস মোহনা.কম