শিক্ষার পরিবেশ উন্নয়নের পূর্বশর্ত শৃঙ্খলা

ড. মো. নাছিম আখতার। ছবি: সংগ্রহীত।

।। ড. মো. নাছিম আখতার।। সম্প্রতি এক তরুণ আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন। তাঁকে দেখে আমি চিনতে পারলাম। মাস ছয়েক আগে তিনি আমার কাছে চাকরির অনুরোধ নিয়ে এসেছিলেন। একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা বিষয়ে প্রথম শ্রেণিতে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করে অনার্স ও মাস্টার ডিগ্রি লাভ করেছেন।

মনে পড়ল, তখন তাঁকে আমি বলেছিলাম, চাকরির বিজ্ঞাপন দিলে আবেদন করবেন। এত দিন পরে দেখা করতে আসার কারণ জানতে চাইলে বললেন, তিনি নতুন এক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সেকশন অফিসার হিসেবে চাকরি পেয়েছেন। খবরটা আমাকে জানাতে এসেছেন। লক্ষ করলাম, শুভ সংবাদ দিলেও মুখটা তাঁর মলিন। আমি তাঁকে জিজ্ঞাসা করলাম, চাকরি পেয়েছেন অথচ খুশি নন কেন? তিনি বললেন, চাকরি পেয়ে তিনি যথেষ্ট খুশি হয়েছিলেন। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ কর্মপরিবেশে তিনি বর্তমানে মানসিকভাবে হতাশ। আমি আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞাসু দৃৃষ্টিতে তাকালে তিনি ঘটনাটি খুলে বললেন, তাঁর অধস্তন একজন কর্মচারীকে কোনো একটি কাজ করতে বলায় তিনি মুখের ওপর কাজ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। এই অসদাচরণের জন্য তিনি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করায় কর্তৃপক্ষ অসহায় বোধ করেছে। তারা অধস্তন কর্মচারীর দোষ না দিয়ে বরং তাঁকেই এ পরিস্থিতির জন্য দায়ী বলে মন্তব্য করে। এই ঘটনার পরে ওই কর্মচারী তাঁকে দেখলে সালাম দেওয়া তো দূরের কথা, বরং অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে বসে থাকেন। তাঁর ভাষ্যমতে, এর পর থেকে কর্মস্থলে থাকলেই তিনি অসুস্থ বোধ করেন। রাগে, দুঃখে, ক্ষোভে তাঁর ব্লাড প্রেসার নাকি উচ্চমাত্রায় পৌঁছেছে। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, কর্মচারী এহেন দুঃসাহস পেল কী করে? তিনি বললেন, ঘটনার পরে খোঁজ নিয়ে দেখেছেন ওই কর্মচারী অত্যন্ত প্রভাবশালী ব্যক্তির স্বজন। তাই তাঁর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের জন্য অস্বস্তিকর।

সম্প্রতি একটি জাতীয় পত্রিকার খবরের শিরোনাম হয়েছিলেন কোনো একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিস সহায়ক। খবরে প্রকাশ, তাঁর প্রহারে একটি বিভাগের পাঁচজন শিক্ষক আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এসব ঘটনার একমাত্র প্রতিকার সুষ্ঠু বিভাগীয় তদন্তের মাধ্যমে দোষী ব্যক্তিকে চিহ্নিত করে তাঁর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা। কিন্তু আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে কাজটি অত্যন্ত দুরূহ। আমার এক পরিচিতজন মোংলা বন্দরে বড় পদে চাকরি করতেন। তিনি তাঁর অভিজ্ঞতায় বলেছিলেন, দৈনিক হাজিরাভিত্তিক একজন কর্মচারীকে অসদাচরণের কারণে বাদ দিতে তাঁর বেশ বেগ পেতে হয়েছিল। বহু প্রভাবশালী ব্যক্তির ফোন ছিল তাঁকে যাতে কাজ থেকে বাদ দেওয়া না হয়।

একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগকৃত জনবল দুই শর কাছাকাছি। কিন্তু এর মধ্যে সঠিক ও নির্ভুলভাবে চিঠি লেখার লোক খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। আবার এ বিষয়ে কাউকে কিছু বলাও যায় না। বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে গেলে তাঁরা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কাছে ধরনা দেন। জাতীয় দৈনিকে দেখেছিলাম একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে আগের উপাচার্য মাস্টার রোল এবং অ্যাডহকে কোনো অনুমোদন ছাড়াই নিয়োগ দিয়েছেন। বর্তমান উপাচার্য লিখিত এবং মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে তাঁদের নিয়োগ স্থায়ী করার জন্য মতামত প্রকাশ করেন। এতে সংক্ষুব্ধ হয়ে ওই কর্মচারীরা উপাচার্যকে ৫২ ঘণ্টা অবরুদ্ধ রাখেন। তাঁদের দাবি ছিল কোনো লিখিত পরীক্ষা নয়, শুধু মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে তাঁদের চাকরিতে স্থায়ী নিয়োগ দিতে হবে। এমন অবাস্তব ও আইনবহির্ভূত দাবিতে কিছু স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করলেও তাদের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয় না। এ অবস্থা চলতে থাকলে সত্যিকার অর্থেই জাতির উন্নয়নের পাদপীঠ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অনেকাংশেই অকার্যকর হয়ে পড়বে।

kalerkanthoআরেকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেকট্রিশিয়ান পদের একজন কর্মচারীর কথা বলছি। তিনি আবার সহকারী অধ্যাপকের নিচের পদমর্যাদার কাউকে স্যার বলে সম্মোধন করেন না। প্রভাষক পদমর্যাদার সবাই নাকি তাঁর কাছে নিতান্তই অল্প বয়সী। তাই তাঁদের সঙ্গে ‘স্যার’ শব্দটি উহ্য রেখে ‘জি, হ্যাঁ, করে দিচ্ছি’ ইত্যাদি বলেই কাজ চালিয়ে নেন। শৃঙ্খলাবোধে আমরা শিক্ষকরাও কোনো কোনো ক্ষেত্রে অনেক পিছিয়ে আছি। নিজের ওপর অর্পিত দায়িত্ব-কর্তব্য পালনে আমরা অনেকেই আন্তরিক নই, যা বিশিষ্টজনদের বক্তব্যে প্রায়ই ফুটে ওঠে।

কেন এমনটি ঘটছে? আমার বিবেচনার কারণ, স্থানভেদে জীবনধারণের জন্য চাকরি যাঁদের অপরিহার্য নয়, তাঁরাও চাকরির জন্য মরিয়া। আমার এক পরিচিত ব্যক্তি অঢেল সম্পদের মালিক। তিনটি পাঁচতলা বাড়ি রয়েছে তাঁর। আমার কাছে ছেলের চাকরির অনুরোধ নিয়ে এসেছিলেন। আমি বললাম, আপনি এত টাকার মালিক, ছেলেকে কিছু একটা করে দেন। ব্যবসা-বাণিজ্য করে প্রতিষ্ঠিত হোক। তিনি প্রত্যুত্তরে বললেন, শুধু বাড়ি-গাড়ি দিয়ে হচ্ছে না। ছেলেকে বিয়ে দিতে হলে সরকারি চাকরি দরকার। চাকরি না থাকলে নাকি ভালো পাত্রী পাওয়া যাচ্ছে না। চাকরিকে যাঁরা জীবনের শুধু অলংকার হিসেবে চান, তাঁরা চাকরি পেলে প্রতিষ্ঠানের কি কোনো উন্নয়ন সাধিত হবে?

বেশ কয়েক বছর আগে আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভিডেন্ট ফান্ডের ৮০ শতাংশের বিপরীতে ব্যাংক লোন দেওয়ার সম্ভাব্যতা যাচাই কমিটির সদস্য ছিলাম আমি। সেখানে আমার মন্তব্য ছিল কর্মচারীরা প্রভিডেন্ট ফান্ডের ৮০ শতাংশের ওপর লোন নিয়ে যদি বেতনের বেশির ভাগই লোনের কিস্তিতে জমা দেন, তবে তাঁরা সব সময় হতাশার মধ্যে থাকবেন। কাজে মনোনিবেশ করা তাঁদের জন্য কঠিন হয়ে পড়বে। আশঙ্কাটির বাস্তবতা আমি নিজ চোখে দেখেছি। বিভাগীয় প্রধান থাকা অবস্থায় দেখেছি এমন লোনের কিস্তি কেটে আমাদের নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের হাতে বেতনের পাঁচ থেকে ছয় হাজার টাকা থাকত, যা স্বাস্থ্যকর কর্মপরিবেশ নিশ্চিতের জন্য মোটেও সহায়ক নয়।

প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সরকারি চাকরি বিধিমালা ঔপনিবেশিক আমলের না রেখে যুগোপযোগী করা উচিত। শিক্ষাগত যোগ্যতার সঙ্গে ভদ্রতা, ধৈর্য, সহিষ্ণুতা ও কর্তব্যবোধ চাকরি পাওয়ার মাপকাঠি হওয়া উচিত। পরিবারের সবাই যদি নিজের অর্পিত দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করি, তাহলে শিক্ষার উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি ঘটবেই। উইলিয়াম জেমস ডুরান্ট আমেরিকার স্বনামধন্য লেখক, ইতিহাসবিদ ও গবেষক। তাঁর একটি উক্তি দেশের সমৃদ্ধি ও উন্নয়নের ধারাবাহিকতা রক্ষায় বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেছেন, ‘বাইরের বর্বর আক্রমণে একটি সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যায় না, হয় যখন ভেতরকার বর্বরতা বহুগুণে বেড়ে যায়। ’

লেখক : উপাচার্য, চাঁদপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

সংগ্রহীত।

ফোকাস মোহনা.কম