চাঁদপুর : চাঁদপুরের মতলব দক্ষিণ উপজেলা প্রকৌশলী (এলজিইডি) মো. মেহেদী হাসানের বিরুদ্ধে সরকারি বিভিন্ন প্রকল্পের টাকা জনপ্রতিনিধিদের সাথে ভাগভাটোয়ারা করে নেয়া এবং ঠিকাদারদের সাথে যোগসাজসে কাজের অনিয়মে প্রশ্রয় দিয়ে আসছেন। তার নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে মতলব দক্ষিণ উপজেলার এক বাসিন্দা দুর্নীতি দমন কমিশন সমন্বিত জেলা কার্যালয় চাঁদপুরে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। যার অনুলিপি এলজিইডির জেলা কার্যালয় ও গণমাধ্যমে প্রেরণ করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয় তিনি অস্বীকার করে প্রতিহিংসা বলে উড়িয়ে দেন।
সম্প্রতি তার দপ্তরের কাজের বিষয়ে খোঁজ নিয়ে দায়িত্ব অবহেলা ও ঠিকাদারদের সাথে যোগসাজসের সত্যতা পাওয়া যায়। তিনি সরকার ও জনস্বার্থ গুরুত্ব না দিয়ে ঠিকাদারদের কিভাবে সহযোগিতা করা যায়, তা নিয়ে ব্যস্ত এমন বক্তব্য উঠে আসে তার সাথে আলাপচারিতায়।
সম্প্রতি মতলব দক্ষিণ উপজেলার নায়েরগাঁও দক্ষিণ ইউনিয়নের মাছুয়াখাল থেকে চারটভাঙা এবং খর্গপুর থেকে মেহরন সড়কটি বিগত ৪ বছর কাজ রেখে ঠিকাদার লাপাত্তা বিভিন্ন শিরোনামে সংবাদ প্রকাশ ও প্রচার হয়। এই বিষয়ে তার কার্যালয় ঠিকাদারকে চিঠি দিয়েই বসে আছেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন ওই ঠিকাদার দিয়েই কাজ সম্পন্ন করাবেন। এই বিষয়ে মেহেদী হাসানের বক্তব্য হচ্ছে-ঠিকাদার পরিবর্তন করা অনেক সমস্যা। তিনি খুবই আরাম প্রিয় এবং বিলাসী। যে কারণে সরকারি কাজ আদায় করতে শক্ত ভূমিকার কথা মুখেও আনেননি।
উল্লেখিত সড়কটি ভুক্তভোগীদের কারণে গণমাধমে প্রকাশ হয়। কিন্তু এছাড়াও আরো দুটি সড়ক কাজ শুরু করে ঠিকাদার লাপাত্তা। তারাও ৫০ থেকে ৬০ ভাগ কাজ করেছেন এবং কাজের বিলও নিয়েছেন। কিন্তু সড়ক নির্মাণ কাজ বন্ধ। এখনো দুর্ভোগে এলাকাবাসী।
উপজেলা প্রকৌশলী এই প্রতিবেদককে জানান, বর্তমানে সিসিবি প্রজক্টের আওতায় উপজেলার জোড়পুল থেকে হরিদাসপাড়া সড়ক উন্নয়ন কাজও বন্ধ। সোয়া এক কিলোমিটার এই সড়কের জন্য বরাদ্দ রয়েছে ১ কোটি ১৫ লাখ টাকা। ৫০ভাগ কাজ হয়েছে। ঠিকাদার নিয়েগেছে ৭১লাখ টাকা। মতলব দক্ষিণ উপজেলা সদরের কলাদি এলাকার ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান ফরিদা এন্টারপ্রাইজ এই সড়ক উন্নয়নের কাজ পায়।
একই এলাকার পেয়ারী খোলা সড়ক উন্নয়ন কাজও বন্ধ। তবে এটির ওয়ার্ক অর্ডার হয় ২০২৩-২০২৪ অর্থ বছরে (২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল)। সোয়া এক কিলোমিটারের এই সড়কটির ব্যয় বরাদ্দ হচ্ছে ১ কোটি ৪৭লাখ টাকা। ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান মৃধা ট্রেডার্স ৬০ভাগ কাজ করে বিল নিয়েছেন ৬০লাখ টাকা।
উপজেলা প্রকৌশলী মেহেদী হাসান এসব কাজ ঠিকাদার বন্ধ রাখার বিষয়ে যেসব কারণ জানিয়েছেন তা খুবই দুর্বল যুক্তি। ঠিকাদারদের পক্ষ হয়ে তার সকল উপস্থাপনা। ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানই তার কাছে অতি আপন। আর রাষ্ট্র এবং দেশের জনগণের দুর্ভোগের কথা তার মুখে একবারও উচ্চারণ হয়নি।
এদিকে এই উপজেলা প্রকৌশলী ২০২৪ সালে মতলব দক্ষিণ উপজেলায় যোগদেয়ার পর থেকে তার বিরুদ্ধে নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তিনি প্রভাব খাটিয়ে কাজ করেন। তিনি পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নির্বাচিত ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানদের সাথে সমঝোতা করে অর্ধেক অর্ধেক ভাগ করে নিয়েছেন। এডিপির ১৪ কোটি টাকার ৬ কোটি টাকা তিনি আত্মসাৎ করেছেন এমন অভিযোগ তার বিরুদ্ধে।
চলতি অর্থ বছরে বার্ষিক উন্নয়ন তহবিল থেকে ৭০লাখ ২২ হাজার টাকার ৩৯টি প্রকল্প গ্রহন করেন। এখানেও জনপ্রতিনিধি ও ঠিকাদারদের সাথে সমঝোতা করে রেশিও ভাগাভাগি করে নেন। একই অর্থ বছরে উপজেলা উন্নয়ন তহবিলের ১ কোটি ৭৫লাখ টাকার ৬০টি প্রকল্প নিয়ে ভাগাভাগির কাজ সম্পন্ন করেছেন।
এই উপজেলা প্রকৌশলী এলজিইডি কর্তৃক বাস্তবায়িত সকল প্রকল্প কোন রকমের তদারকি ছাড়া নিম্ন-মানের কাজ করে ২০% ঘুষের বিনিময়ে ছাড় করেন। এসব অভিযোগ তার বিরুদ্ধে দুদকে জমা পড়েছে।
এছাড়াও তার বিরুদ্ধে উপজেলায় অতিরিক্ত কক্ষ দখলে রাখা, ঢাকা সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অবৈধভাবে সম্পদ গড়ে তোলার অভিযোগ রয়েছে।
এসব বিষয়ে তিনি বক্তব্য দিতে রাজি হননি। তবে তিনি বলেন, আমার সাথে প্রতিহিংসামূলক এসব অভিযোগ আনা হয়েছে। আর যিনি অভিযোগ করেছেন, তিনিও পরিচিত বলে জানান। কারণ একান্ত কাছের লোক না হলে কিভাবে নির্দিষ্ট করে প্রকল্পের নাম এবং অতিগোপনীয় তথ্য দুদকে জমা পড়ে।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) চাঁদপুর জেলা কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মনোয়ার উদ্দিন এই প্রসঙ্গে বলেন, অভিযোগের বিষয়টি আজকে আমি অবগত হয়েছি। ঈদুল আযহার পরে অভিযোগগুলো দেখা হবে। তার সাথে আমি কথা বলবো।
ফম/এমএমএ/



