
চাঁদপুর: যেখানে লাখো মানুষ জীবনে একবার হজ পালনের সৌভাগ্য অর্জনের স্বপ্ন দেখেন, সেখানে চাঁদপুরের শাহরাস্তির এক যুবক টানা এক যুগ ধরে পবিত্র মক্কায় আল্লাহর ঘরের মেহমানদের সেবায় নিয়োজিত রয়েছেন। তিনি শাহরাস্তি উপজেলার পশ্চিম চিতোষী ইউনিয়নের আয়নাতলী গ্রামের পাটোয়ারী বাড়ির সন্তান হাফেজ মুহাম্মদ হাসান মানছুর আল-মাক্কী।
জানা গেছে, বর্তমানে তিনি পবিত্র মসজিদ আল হারামে “আল হাইয়াতুল আম্মাহ লিল ইনাইয়া বি-মসজিদ আল হারাম ওয়াল মসজিদ আন নববী”-এর অধীনে মুতারজিম মুরশিদ (অনুবাদক গাইড) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। মসজিদে হারামের ভেতরে মাকাতিব আশ শায়েখদের ফতোয়ার অনুবাদ, হারাম শরীফ সংলগ্ন পুলিশ অফিস ও পাবলিক প্রসিকিউশন অফিসে ভাষাগত সহায়তা এবং হাজীদের হজ ও উমরাহ সংক্রান্ত দিকনির্দেশনা দিয়ে থাকেন তিনি।
বিগত তিন বছরে আল হারামাইন কর্তৃপক্ষের পরিসংখ্যানে তার মাধ্যমে তিন লাখের বেশি হাজী সেবা গ্রহণ করেছেন বলে জানা গেছে। প্রতিদিন দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করলেও ক্লান্তি অনুভব করেন না তিনি। মুঠোফোনে হাফেজ মানছুর বলেন, আমি আল্লাহর ঘরের মেহমানদের সেবা করছি এই অনুভূতিই আমাকে মানসিক প্রশান্তি দেয়। এটি আমার কাছে ইবাদতের মতো।
তিনি বাংলা ছাড়াও আরবি, ইংরেজি, উর্দু, হিন্দি ও বারমাউয়ি ভাষাভাষী হাজীদের হজ ও উমরাহ পালন সংক্রান্ত দিকনির্দেশনা, গাইডিং এবং বিভিন্ন ফতোয়ার মৌখিক অনুবাদ করে থাকেন।
হাফেজ মানছুর ২০১৪ সালে সৌদি আরব সরকারের পূর্ণ স্কলারশিপ নিয়ে মক্কার জামেয়া উম্মুল কুরা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। সেখানে আরবি ভাষা ডিপ্লোমা, আরবি ভাষা ও সাহিত্য বিষয়ে অনার্স এবং আশ-শরিয়াহ অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ থেকে হাইয়ার ডিপ্লোমা সম্পন্ন করেন। প্রতিটি পর্যায়েই তিনি প্রথম বিভাগ অর্জন করেন।
লেখাপড়ার পাশাপাশি ২০১৫ সাল থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ হজ মিশন, মক্কা শাখার অধীনে বিভিন্ন হজ মৌসুমে অসুস্থ বাংলাদেশি হাজীদের সেবায় কাজ করেছেন তিনি। কিং আব্দুল আজিজ হাসপাতাল, কিং ফয়সাল হাসপাতাল, কিং আব্দুল্লাহ হাসপাতাল, আন নূর হাসপাতাল ও আজইয়াদ হাসপাতালসহ বিভিন্ন চিকিৎসাকেন্দ্রে তিনি দোভাষী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। রোগীদের চিকিৎসা, ওষুধ গ্রহণ এবং চিকিৎসকদের সঙ্গে যোগাযোগে ভাষাগত সহায়তা প্রদান করেন।
বর্তমানেও মক্কায় কোনো বাংলাদেশি হাজী বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা বা পরামর্শের জন্য যোগাযোগ করলে সাধ্য অনুযায়ী সহযোগিতা করে যাচ্ছেন বলে জানান তিনি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও হাজী সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন হাফেজ মানছুর। “হাফেজ মুহাম্মদ মানছুর আল-মাক্কী” নামের ফেসবুক আইডি থেকে নিয়মিত হাজীদের বিভিন্ন দিকনির্দেশনা ও সতর্কতামূলক পোস্ট প্রকাশ করেন। তার দাবি, চলতি ২০২৬ সালের হজ মৌসুমে তার সচেতনতামূলক পোস্টগুলো প্রায় ১০ লাখ মানুষ দেখেছেন। পোস্টগুলো হাজারো বার শেয়ার, কমেন্ট ও লাইক হয়েছে।
হাফেজ মানছুর বলেন, পবিত্র কাবা সংলগ্ন মসজিদ আল হারামে আমি ছাড়াও আরও কয়েকজন অভিজ্ঞ বাংলাদেশি অনুবাদক রয়েছেন। আমরা আরাফাতের খুতবা, জুমার খুতবা ও আল হারামাইনের গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনাগুলো বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদ করে হাজীদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করি।
শাহরাস্তির চিতোষী পশ্চিম ইউনিয়নের বাসিন্দা ও গণমাধ্যম কর্মী ফয়সাল আহমেদ বলেন, মানছুরের এই সেবাকর্ম শুধু শাহরাস্তির জন্য নয়, পুরো দেশের জন্যই গর্বের। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তার কাছ থেকে অনুপ্রেরণা পাবে।
মানছুরের প্রতিবেশী ও ন্যাশনাল ইনস্টিউট অব কিডনি ডিজিজেস এন্ড ইউরোলজির চিকিৎসক ডা. মো. আবু নাছের শাকিল জানান, মানছুর যে কাজ করছেন সেটি সেবার পাশাপাশি একটি ইবাদত। অত্যন্ত সৌভাগ্যবান না হলে এমন সুযোগ জুটে না।
চিতোষী পশ্চিম ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. জোবায়েদ কবির বাহাদুর বলেন, মানছুরের মতো যুবকেরা দেশের বাইরে থেকেও বাংলাদেশের সুনাম ছড়িয়ে দিচ্ছেন। এটি আমাদের জন্য অত্যন্ত গর্বের বিষয়।
নুনিয়া ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসার অধ্যক্ষ মাওলানা মো. দেলোয়ার হোসেন মোল্লা বলেন, সে অত্যন্ত আন্তরিক, ধৈর্যশীল ও ধর্মপ্রাণ। হাজীদের সেবা করা নিঃসন্দেহে অনেক বড় সওয়াবের কাজ।
ধর্মানুরাগীদের মতে, পবিত্র মক্কায় হাজীদের সেবা শুধু একটি দায়িত্ব নয়, বরং এটি একটি মহান ইবাদত। নিজের নিষ্ঠা, আত্মত্যাগ ও ধর্মীয় দায়িত্ববোধ দিয়ে হাফেজ মুহাম্মদ হাসান মানছুর আল-মাক্কী আজ চাঁদপুরের তরুণ সমাজের সামনে অনুকরণীয় এক দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছেন।
ফম/এমএমএ/



