চাঁদপুর: চাঁদপুর ও আশপাশের জেলার চিকিৎসার জন্য একমাত্র ভরসাস্থল হচ্ছে ২৫০ শয্যা চাঁদপুর সরকারি জেনারেল হাসপাতাল। বছর জুড়েই এই হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য গড়ে ভর্তি থাকে ৩৫০ থেকে ৪০০ রোগী। অতিরিক্ত রোগীদের সেবা দিতে সব সময় চিকিৎসক ও কর্তৃপক্ষের হিমশিম খেতে হয়। হাসপাতালের পরিবেশ সু-শৃঙ্খল করার পাশাপাশি চিকিৎসা সেবাকে আধুনিকায়ন ও রোগীদের ভোগান্তি কমাতে কর্তৃপক্ষ পরিকল্পিত উন্নয়ন কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছেন এবং এতে যোগ হয়েছে বিভিন্ন যন্ত্রপাতি। এখন জটিল অনেক চিকিৎসা সেবা এখানে নেয়া সম্ভব। বিশেষ করে এই হাসপাতালে ৮০ভাগ ডেলিভারি নরমাল হচ্ছে। মাতৃ মৃত্যুর হার এখন শূন্যের কোটায়।
বেশ কয়েকদিন হাসপাতালের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ ও সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে এক সময় পিছিয়ে থাকা হাসপাতালের উন্নয়ন এবং রোগীদের জন্য চিকিৎসা সেবার নানা সুবিধার কথা বেরিয়ে আসে। বর্তমানে প্রতিদিন এই হাসপাতালের আউটডোরে প্রায় ৮শ’ থেকে ১হাজার রোগী চিকিৎসা সেবা নিচ্ছে।
হাসপাতাল ঘুরে দেখাগেল-নীচ তলায় জরুরি বিভাগে নতুন টিকিট কাউন্টার, ওয়ান স্টপ ইমারজেন্সি কেয়ার (এটি রোগীদের জন্য বড় নেয়ামক), স্বল্প খরচে ডিজিটাল এক্স-রে সেন্টার, টিকা নেয়ার জন্য আলাদা বিভাগ ও প্রবেশের ব্যবস্থা করা হয়েছে। দ্বিতীয় তলাসহ সবগুলো সেনিটেশন ব্যবস্থা উন্নতকরণ, অপারেশনের রোগীদের জন্য পোস্ট অপারেটিভ ওয়ার্ড, ভিআইপি ও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য পৃথক বেডগুলো খুবই উন্নত মানের করা হয়েছে।

হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়কের কার্যালয় সূত্রে জানাগেছে, গত দুই বছরে বর্তমান তত্ত্বাবধায়কের পরিকল্পনা ও স্থানীয় সাংসদের সহযোগিতায় এই হাসপাতালে লিকুইড মেডিকেল অক্সিজেন প্লান্ট, ১০ বেডের ওয়ান স্টপ ইমারজেন্সি কেয়ার, ৪ বেডের আইসিইউ স্থাপন, মারাত্মক অসুস্থ নবাজতকের জন্য শেখ রাসেল স্ক্যানু, অক্সিজেন জেনারেটর ও ডিজিটাল এক্স-রে মেশিন স্থাপন করা হয়েছে।
সদরের লক্ষ্মীপুর ইউনিয়ন থেকে হাসপাতালে দেড় বছর বয়সী শিশু সামিয়াকে শিশু ওয়ার্ডে ঠান্ডা জনিত রোগের চিকিসা নিতে আসা মায়মুনা বেগম জানান, বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে অনেক খরচ। সামর্থ না থাকায় সরকারি হাসপাতালে এসেছি। খুব ভালো চিকিৎসা পাচ্ছি। রোগী বেশি থাকায় বেড না পেয়ে মেঝেতে থাকতে হচ্ছে।
শহরের পুরাণবাজার পূর্ব শ্রীরামদী থেকে আসা নাজমা বেগম জানান, হাসপাতালে আগে জটিল রোগের ওষুধ দেয়া হত না। এখন উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসের ওষুধ পাওয়া যায়। ওষুধ পেয়ে আমাদের গরীবদের জন্য অনেক সুবিধা হয়েছে। অনেকেই এখন হাসপাতাল থেকে ওষুধ নিচ্ছেন।
শহরের প্রফেসর পাড়ার বাসিন্দা সুরাইয়া রহমান জানান, তার হাত-পায়ে অনেক ব্যথা ছিল। এই হাসপাতালের চিকিৎসায় তিনি অনেকটা সুস্থ্য। প্রতি সপ্তাহে এসে ঔষধ নিচ্ছেন।
সদরের রামপুর ইউনিয়নের অবসরপ্রাপ্ত সেনা সদস্য আব্দুস সাত্তার জানান, তিনি ঢাকায় সিএমএসে চিকিৎসা নিতেন। এখন শারীরিকভাবে অসুস্থ হওয়ার ঢাকায় যেতে পারেন না। যার কারণে সরকারি হাসপাতালে কয়েক মাস পর পর আসেন। পরীক্ষাসহ হাসপাতালের সেবায় তিনি সন্তুষ্ট।

খোঁজ নিয়ে জানাগেছে, এই হাসপাতালে মঞ্জুরীকৃত চিকিৎসকের পদ ৬৭। বর্তমানে আছে ৪৭জন। ২০টি পদই শূন্য রয়েছে। এছাড়া ২০২১ সাল থেকে সিনিয়র কনসালটেন্ট (গাইনী), ২০১৯ সালের জুন মাস থেকে জুনিয়র কনসালটেন্ট (রেডিওলজী), একই সময় থেকে জুনিয়র কনসালটেন্ট (চক্ষু) চিকিৎসক নেই। স্টাফদের মধ্যে সিনিয়র স্টাফ নার্স ৩, ষ্টাফ নার্স ৬ ও সহকারী নার্স ২টি পদ শূন্য রয়েছে।
এদিকে হাসপাতালের গাইনী এন্ড অবস বিভাগ থেকে জানাগেছে, সিনিয়র নার্সদের উন্নতমানের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে মাতৃ ও শিশু মৃত্যুর হার শূন্যের কোটায় এসেছে। চলতি বছরের নভেম্বর মাস পর্যন্ত এই বিভাগ থেকে সেবা নিয়েছে ৯৯৭১জন। এর মধ্যে সিজারিয়ান প্রসব হয়েছে ৪৮২ এবং নরমাল ডেলিভারি হয়েছে ২১৩৫জন। নরমাল ডেলিভারির বিষয়টি প্রত্যন্ত অঞ্চলের লোকজনের মধ্যে জানাজানি হলে সেবাগ্রহীতার সংখ্যা আরো বৃদ্ধি পাবে বলে জানালেন নার্সরা।
হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডাঃ এ.কে.এম. মাহবুবুর রহমান জানান, হাসপাতালের দায়িত্বে আসার পর থেকে পরিবেশটাকে উন্নত করার চেষ্টা করেছি। কারণ রোগীদের জন্য পরিবেশটা ভাল থাকা খুবই জরুরি। এরপর রোগীদের সর্বোচ্চ সেবা নিশ্চিত করার জন্য স্থানীয় সাংসদ ডাঃ দীপু মনি, চাঁদপুর পৌরসভার মেয়র মো. জিল্লুর রহামনের সহযোগিতায় অনেক উন্নন কাজ সম্পন্ন হয়েছে। হাসপাতাল ঘুরে দেখলে এসব চোখে পড়বে। বিশেষ করে হাসপাতালের সামনের অংশ শৃঙ্খল রাখার জন্য ১০জন আনসার নিয়োগ করা হয়েছে।
তিনি আরো জানান, চিকিৎসক ও স্টাফদের সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করার জন্য নিয়মিত তত্ত্বাবধান করা হচ্ছে। রোগীদের অভিযোগও আমরা গুরুত্বসহকারে দেখছি। সাধ্যমত চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করাই আমাদের লক্ষ্য। বিশেষ করে ১০ শয্যা বিশিষ্ট আইসিইউ এবং ২০ শয্যা বিশিষ্ট আইসোলেশন ইউনিট নির্মাণের জন্য উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিকট প্রেরণ করা হয়েছে।
ফম/এমএমএ/



