ঈদে শুধু চাঁদপুর শহরেই ২০০ কোটি টাকার লেনদেনের আশা ব্যবসায়ীদের

ইদের কেনাকাটা। ছবি: সংগ্রহীত।

চাঁদপুর: দেশের অন্যতম প্রবাসী অধ্যুষিত জেলা চাঁদপুর। প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্সের উপর ভর করেই এ জেলার অর্থনৈতিক কর্মকান্ড পরিচালিত হয়। তাদের পাঠানো অর্থে জমজমাট হয়ে উঠেছে চাঁদপুরের ঈদের বাজার।

ব্যাংক কর্মকর্তারা বলছেন, ঈদ উৎসবকে কেন্দ্র করে বছরের অন্যান্য সময়ের তুলনায় রেমিটেন্স আসছে দ্বিগুন হারে। যা ঈদের বাজারকে চাঙ্গা করার পাশাপাশি অবদান রাখছে দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে। এদিকে ঈদ উৎসবকে ঘিরে যেকোন অনাকাঙ্খিত ঘটনা এড়াতে শপিং সেন্টারগুলোতে নিরাপত্তা জোরদার করেছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী।

প্রবাসীদের সংখ্যায় দেশে চাঁদপুর জেলার অবস্থান ষষ্ঠ। মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশে^র বিভিন্ন দেশে চাঁদপুরের প্রায় সাড়ে ৪ লক্ষ মানুষ প্রবাসী জীবন কাটাচ্ছেন। বছরে এসব প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্সের পরিমান প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা। বছরের অন্যান্য সময়ে চাঁদপুর জেলায় যেখানে মাসে ১০০ থেকে দেড়শ’ কোটি টাকার রেমিটেন্স আসে, সেখানে ঈদের মাসে তা প্রায় ২০০ কোটি ছাড়িয়ে যায়।

চাঁদপুর সদর উপজেলার সফরমালী এলাকার সৌদি আরব প্রবাসী মো. আতিকের স্ত্রী লাকী বেগম। বিদেশ থেকে স্বামীর পাঠানো টাকায় সন্তানকে সাথে নিয়ে শহরের পূরবী মার্কেটে ঈদের কেনাকাটায় ব্যস্ত তিনি। ঈদের খুশি বাড়িয়ে দিতে সন্তান আর স্বজনদের পাশাপাশি পছন্দের জামা-কাপড় কিনছেন নিজের জন্যও।

লাকী বেগম বলেন, ঈদ যেন সুন্দরভাবে উদযাপন করতে পারি সেজন্য বিদেশ থেকে টাকা পাঠিয়েছে স্বামী। তা দিয়ে নিজের, মেয়েরসহ স্বজনদের জন্য শপিং করেছি। আশাকরি নতুন পোষাক পরে পরিবারের সবাই মিলে ঈদ আনন্দ ভাগাভাগি করতে পারবো।

আরেক প্রবাসীর বাবা আব্দুল মোতালেব। বাগাদী এলাকার এই বাসিন্দা ব্যাংকে এসেছেন ছেলের পাঠানো রেমিটেন্সের টাকা তুলতে। ঈদ উদযাপনে বিভিন্ন দোকান ঘুরে আনন্দচিত্তে পরিবারের সদস্যদের জন্য পছন্দের জিনিস কিনছেন তিনিও।
আব্দুল মোতালেব বলেন, আমার দুই ছেলে সৌদি আরবে থাকে। ঈদ করতে বাড়িতে টাকা পাঠিয়েছে। এই টাকা দিয়ে নতুন জামাকাপড় কেনার পাশাপাশি নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনবো। ছেলেদের পাঠানো টাকায় ঈদের আনন্দ দ্বিগুন হয়েছে আমাদের।

শুধামাত্র এসব ক্রেতারাই নন, এমন হাজারো ক্রেতা তাদের প্রবাসী স্বজনদের পাঠানো টাকায় ঈদের কেনাকাটায় ব্যস্ত সময় পার করছেন বিপনী বিতানগুলোতে। এক দোকান থেকে অন্য দোকান ঘুরে ঘুরে নিজেদের পছন্দের জিনিস কিনে বাড়ি ফিরছেন খুঁশি মনে। তবে গত বছরের তুলনায় এবছর জামাকাপড়ের দাম কিছুটা বেশি বলেই জানাচ্ছেন তারা।

শহরের প্রফেসর পাড়া এলাকার বাসিন্দা আবুল কালাম বলেন, জামা কাপড়ের দাম গেল বছরের তুলনায় অনেক বেশি। স্বাদ আর স্বাধ্যের সমন্বয় করতে অনেক কষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তবুও পরিবারের সদস্যদের মন খুশি করতে ঘুরে ঘুরে দেখছি। বাজেটের মধ্যে পেলে কিনছি পছন্দের জিনিস।

অন্যান্য বছরের তুলনায় এবছর জামা-কাপড়ের দাম কিছুটা বেশি তা ব্যবসায়ীরাও স্বীকার করছেন। টাকার বিপরীতে ডলারের মান বৃদ্ধি পাওয়া এবং বেশি দামে কিনতে হয়েছে বলে দাম কিছুটা বেশি বলছেন ব্যবসায়ীরা। প্রবাসীদের স্বজনদের কাছে স্বাচ্ছন্দে বিক্রি করতে পারলেও স্বাধারণ ক্রেতাদের কাছে মাল বিক্রি করে লাভ করা কষ্টকর হয়ে যাচ্ছে। দাম শুনে অনেক ক্রেতাই মাল না নিয়েই চলে যায় বলছেন ব্যবসায়ীরা।

তারা জানান, এবছর মার্কেটে মেয়েদের কাছে ‘নায়রা’ ড্রেসের চাহিদা সব থেকে বেশি। বিবেক, গঙ্গা, রাউন্ড ফ্রগ, সারারা, গারারা এর চাহিদাও রয়েছে বেশ। দেড় হাজার থেকে শুরু করে ১০ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে এসব ড্রেস। তবে ঘন ঘন লোডশেডিং হওয়ায় গরমে ব্যবসায়ী ও ক্রেতাদের বিরম্বনায় পড়তে হচ্ছে বলে জানান তারা।

চাঁদপুর জেলা বস্ত্র ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আনোয়ার হোসেন বাবুল বলেন, করোনা সংকট কেটে যাওয়ায় রেমিটেন্সের পরিমানও বৃদ্ধি পেয়েছে এবার। এর ফলে সকল ধরনের ব্যবসায়ই চাঙ্গা হয়ে উঠেছে। ঈদকে ঘিরে শহরের সহস্রাধিক ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানে প্রায় শতকোটি টাকার বাণিজ্য হবে বলে মনে করছি। এতে ব্যবসায়ীরাও অনেকটা লাভবান হতে পারবেন।
ব্যাংক কর্মকর্তারা বলছেন, ঈদকে কেন্দ্র করে স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে প্রবাসীদের রেমিটেন্স পাঠানোর হার বৃদ্ধি পেয়েছে দ্বিগুন। যা ঈদের বাজারসহ জেলার অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখছে।

বাংলাদেশ ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড চাঁদপুর শাখার ম্যানাজার মো. দাউদ খান বলেন, প্রবাসীদের রেমিটেন্স পাঠানোর অন্যতম একটি আস্থাভাজন মাধ্যম ইসলামী ব্যাংক শাখা। সাধারণ সময়ের চেয়ে ঈদ উপলক্ষে প্রবাসীরা রেমিটেন্স পাচ্ছেন অনেক বেশি। গত মার্চ মাসে আমাদের শাখায় ২০ কোটি টাকার রেমিটেন্স আসলেও ঈদকে কেন্দ্র করে চলতি মাসে তা প্রায় ৪০ কোটি ছাড়িয়ে যাবে বলে আশাকরি।

জনতা ব্যাংক লিমিটেড চাঁদপুর শাখার ম্যানাজার মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, জানুয়ারী থেকে মার্চ পর্যন্ত গত তিন মাসে আমাদের শাখায় যেখানে ৩ কোটি টাকা রেমিটেন্স এসেছে, সেখানে শুধু ঈদকে ঘিরেই এপ্রিল মাসে এসেছে প্রায় তিন কোটি টাকা। প্রবাসীরা যেন বৈধ উপায়ে রেমিটেন্স পাঠায় সেজন্য তাদের উৎসাহ দেয়ার জন্য তাদের সাথে যোগাযোগ করার পাশাপাশি উপহারও দিয়ে থাকি আমরা।

চাঁদপুর জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিসের ভারপ্রাপ্ত সহকারী পরিচালক চাঁদপুর মোহাম্মদ শফিকুর রহমান বলেন, চাঁদপুর জেলার অনেক মানুষ প্রবাসে ভালো অবস্থানে রয়েছে। তাদের পাঠানো রেমিটেন্সের উপর এই জেলার অর্থনীতি অনেকাংশে নির্ভরশীল। প্রবাসীদের সংখ্যায় দেশে চাঁদপুরের অবস্থান ৬ষ্ঠ। ভালো কাজ লাভের পাশাপাশি বেশি অর্থ আয় করতে দক্ষতা অর্জন করে প্রবাসে যাওয়া প্রয়োজন। প্রবাসীদের কষ্টে অর্জিত অর্থ দেশের অর্থনীতিতে আরো বেশি অবদান রাখতে তাদের প্রতি বৈধ উপায়ে রেমিটেন্স পাঠানোর আহ্বান জানাই।

পুলিশ সুপার মিলন মাহমুদ বলেন, ঈদ বাজারকে কেন্দ্র করে আইন-শৃঙ্খলা পরিবেশ স্বাভাবিক রাখতে আমরা তৎপর রয়েছি। ব্যবসায়ী ও ক্রেতাদের আর্থিক লেনদেনের নিরাপত্তার জন্য মার্কেটগুলোতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়নের পাশাপাশি সাদা পোশাকে পুলিশ সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছে। যে কোন অপ্রতিকর ঘটনা এড়াতে আমরা প্রস্তুত।

ফম/এমএমএ/

সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট | ফোকাস মোহনা.কম