
।। খোরশেদ আলম বিপ্লব।। তাঁকে আমৃত্যু মুক্তিযোদ্ধা বলা যায় নির্দ্বিধায়। কখনই তাবেদারি করেছেন দেখিনি, জানিনি। বিক্রি হওয়া যেখানে নিয়ম সেখানে তিনি সারাজীবন স্রোতের বিপরীতে অনিয়মই করে গেছেন। রেখে যাচ্ছেন দলান্ধ, ধান্ধাবাজ, প্রগতিশীলতার ভান ধরা কিংবা ধর্মকে ঢাল করা মুখস্ত বুদ্ধিজীবীদের। যাদের আগামীকালের কার্যক্রম আজকে সহজেই অনুমান করা যায়। অন্ধদের সমাজের একজন মেরুদণ্ডী মানুষ। সে কোনো দলের, পক্ষের ছিলো না। ন্যায়ের পক্ষে বলেছে সবারই শত্রু হিসেবে গণ্য হয়েছে। কেউ সুচতুর কৌশলে নিজেদের পক্ষে টেনেছে। আদতে সে নির্ভেজাল। তিনি আর কেউ নন, তিনি হলেন প্রিয় “গরীবের ডাক্তার” খ্যাত মানুষ বীর মুক্তিযোদ্ধা ডা.জাফরুল্লাহ চৌধুরী।
জাফরুল্লাহ চৌধুরী ১৯৪১ সালের ২৭ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম জেলার রাউজানে জন্মগ্রহণ করেন। দশ ভাই-বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়। ঢাকার বকশী বাজারের নবকুমার স্কুল থেকে মেট্রিকুলেশন এবং ঢাকা কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাস করেন। ১৯৬৪ সালে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ থেকে এমবিবিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ছাত্র ইউনিয়নের মেডিক্যাল শাখার সাধারণ সম্পাদক হিসেবে ছাত্র অবস্থায় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের দুর্নীতির বিরুদ্ধে করেছিলেন বহুল আলোচিত সংবাদ সম্মেলন।
১৯৬৪ সালে ডিএমসি থেকে এমবিবিএস ও ১৯৬৭ সালে বিলেতের রয়্যাল কলেজ অব সার্জনস থেকে জেনারেল ও ভাস্কুলার সার্জারিতে এফআরসিএস প্রাইমারি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। কিন্তু চূড়ান্ত পর্ব শেষ না করে মা মাটি ও শিকড়ের অস্তিত্ব রক্ষার্থে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে দেশে ফিরে আসেন। তিনি ছিলেন ব্রিটেনে প্রথম বাংলাদেশি সংগঠন বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের (বিডিএমএ) প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক । পরবর্তীতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হলে তিনি এফআরসিএসের চূড়ান্ত পর্ব শেষ না করে লন্ডন থেকে সরাসরি ভারতে চলে আসেন। মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে আগরতলার মেলাঘরে প্রশিক্ষণকেন্দ্র থেকে গেরিলা প্রশিক্ষণ নেন এবং সেখানেই ৪৮০ শয্যাবিশিষ্ট ‘বাংলাদেশ ফিল্ড হাসপাতাল’ প্রতিষ্ঠা করেন। তার অভূতপূর্ব সেবাপদ্ধতি পরে বিশ্ববিখ্যাত জার্নাল পেপার ‘ল্যানসেট’-এ প্রকাশিত হয়।
যুদ্ধকালীন সময়ে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর নির্মমতার প্রতিবাদে লন্ডনের হাইড পার্কে যে কয়েকজন বাঙালি পাসপোর্ট ছিঁড়ে আগুন ধরে রাষ্ট্রবিহীন নাগরিকে পরিণত হয়েছিলেন তাদের মধ্যে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী অন্যতম । তারপর বৃটিশ স্বরাষ্ট্র দপ্তর থেকে ‘রাষ্ট্রবিহীন নাগরিকের’ প্রত্যয়নপত্র নিয়ে সংগ্রহ করেন ভারতীয় ভিসা। শহীদ জননী জাহানারা ইমাম তাঁর কালজয়ী সৃষ্টি ‘একাত্তরের দিনগুলিতে লিখেছেন, – চেনা হয়ে উঠেছে ড. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, ডা. এমএ মোবিন। এরা দুজনে ইংল্যান্ডে এফআরসিএস পড়ছিল। ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করে বিলেতে চার বছর হাড়ভাঙা খাটুনির পর যখন এফআরসিএস পরীক্ষা মাত্র এক সপ্তাহ পরে, তখনই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ শুরু। ছেলে দুটি পরীক্ষা বাদ দিয়ে বাংলাদেশ আন্দোলনে অংশ নিলো, পাকিস্তানি নাগরিকত্ব বর্জন করলো, ভারতীয় ট্রাভেল পারমিট যোগাড় করে দিল্লিগামী প্লেনে চড়ে বসলো। উদ্দেশ্য ওখান থেকে কলকাতা হয়ে রণাঙ্গনে যাওয়া। প্লেনটা ছিল সিরিয়ান এয়ারলাইন্স-এর। দামাস্কাসে পাঁচ ঘণ্টা প্লেন লেট, সবযাত্রী নেমেছে। ওরা দুইজন আর প্লেন থেকে নামে না। ভাগ্যিস নামেনি। এয়ারপোর্টে এক পাকিস্তানি কর্নেল উপস্থিত ছিল ওই দুইজন ‘পলাতক পাকিস্তানি নাগরিককে’ গ্রেপ্তার করার জন্য।
প্লেনের মধ্য থেকে কাউকে গ্রেপ্তার করা যায় না, কারণ প্লেন হলো ইন্টারন্যাশনাল জোন। দামাস্কাসে সিরিয়ান এয়ারপোর্ট কর্মকর্তা ওদের দুইজনকে জানিয়েছিল- ওদের জন্যই প্লেন পাঁচ ঘণ্টা বিলম্ব। এমনিভাবে ওরা দুজন বিপদের ভেতর দিয়ে শেষ পর্যন্ত মে মাসের শেষে সেক্টর টু রণাঙ্গনে গিয়ে হাজির হয়েছেন।
বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প আজ স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং একইসাথে রপ্তানিযোগ্য পণ্য হিসেবে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের হাতিয়ার হিসেবে শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে ১৯৮২ সালে ওষুধ নীতি প্রণয়নের পেছনে তাঁর অবদান আমরা আজীবন শ্রদ্ধাভরে স্মরণ রাখবো। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসায় ভারতের ত্রিপুরায় বাংলাদেশ ফিল্ড হাসপাতাল গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা ছিল ডা.জাফরুল্লাহ চৌধুরীর। যুক্তরাজ্যে অবস্থানরত চিকিৎসকদের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সংগঠিত করা, হাসপাতালের জন্য ঔষুধ সহ চিকিৎসা সরঞ্জাম সংগ্রহ করার ক্ষেত্রেও তাঁর বড় ভূমিকা ছিল অপরিসীম। যাদের আগে কোনো প্রশিক্ষণ ছিল না এমন নারীরা কয়েক দিনের প্রশিক্ষণ নিয়েই হাসপাতালে সেবার কাজ করেছিলেন।
ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী একজন ভাস্কুলার সার্জন। তিনি মূলত একজন জনস্বাস্থ্য চিন্তাবিদ। ১৯৮২ সালের ওষুধ নীতি দেশকে ওষুধে প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ করে, এই নীতি প্রণয়নের অন্যতম কারিগর ছিলেন জাফরুল্লাহ চৌধুরী। বহির্বিশ্বে তাঁর পরিচয় বিকল্প ধারার স্বাস্থ্য আন্দোলনের একজন পরিপূর্ণ সমর্থক ও সংগঠক হিসেবে। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে অনন্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ১৯৭৭ সালে স্বাধীনতা পুরস্কার লাভ করেন।পরবর্তীকালে স্বাধীন বাংলাদেশে স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা হাসাপাতাল হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায় তাঁর গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র। দেশের সেবায় ট্রাস্টি বোর্ড করে ১৯৭২ সালে সাভারে গড়ে তুলেছিলেন এই প্রতিষ্ঠান। নিজেকে নিয়োজিত করেন গণমানুষের স্বাস্থ্যখাতের উন্নয়নে। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নারীদের করেছেন প্রাথমিক স্বাস্থ্যকর্মী। প্রথম উদ্যোগ নিয়েছেন জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের। জনকল্যাণধর্মী চিকিৎসানীতির মাধ্যমে দেশে ঔষুধের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখার নীতি প্রণয়ন, জাতীয় শিক্ষা কমিটির সদস্য হিসেবে অগ্রসর শিক্ষা নীতি প্রণয়ন ও নারী উন্নয়নে রাখেন যুগান্তকারী ভূমিকা।
ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী সত্যকে নিজের ভেতর লালন ও পালন করে বাংলার জণগণের অধিকার আন্দোলনে সকল রক্তচক্ষু ও ভয়ভীতি উপেক্ষা করে নিজেকে সোচ্চার রেখেছিলেন। এই মহান নির্লোভ মানুষটি অসুস্থ শরীরেও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পক্ষে এই স্বাধীন বাংলার বুকে টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া চষে বেড়িয়েছেন, অংশ নিয়েছেন বিভিন্ন কর্মসূচিতে। বৈশ্বিকভাবে বিকল্প স্বাস্থ্য আন্দোলন গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও জাফরুল্লাহ চৌধুরীর ভূমিকা রয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রতি বছর ওয়ার্ল্ড হেলথ অ্যাসেম্বলি আয়োজন করে। এর বিকল্প হিসেবে কয়েক বছর পর পর আয়োজন করা হয় পাবলিক হেলথ অ্যাসেম্বলি বা জনগণের স্বাস্থ্য সম্মেলন। এটা আয়োজন করে পিপলস হেলথ মুভমেন্ট নামের একটি বৈশ্বিক সংগঠন। এই সংগঠনের নির্বাহী পরিষদের সদস্য ডা.জাফরুল্লাহ চৌধুরী।
এই মহান মানুষটি কাজের স্বীকৃতি হিসেবে জীবনের নানা পর্বে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কার বা সম্মান পেয়েছেন জাফরুল্লাহ চৌধুরী। ১৯৭৭ সালে তাঁকে স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। ফিলিপাইনের র্যামন ম্যাগসাইসাই পুরস্কার পান ১৯৮৫ সালে। ১৯৯২ সালে সুইডেন থেকে তাঁকে দেওয়া হয় রাইট লাইভলিহুড অ্যাওয়ার্ড। কানাডার ওয়ার্ল্ড অর্গানাইজেশন অব ন্যাচারাল মেডিসিন ২০০৯ সালে দেয় ডক্টর অব হিউম্যানিটেরিয়ান উপাধি। যুক্তরাষ্ট্রের বার্কলি থেকে ২০১০ সালে দেওয়া হয় ইন্টারন্যাশনাল পাবলিক হেলথ হিরোজ অ্যাওয়ার্ড। যুক্তরাজ্যের প্রবাসী বাংলাদেশিদের সংগঠন ভয়েস ফর গ্লোবাল বাংলাদেশিজ ২০২২ সালে জাফরুল্লাহ চৌধুরীকে ‘এনআরবি লিবারেশন ওয়ার হিরো ১৯৭১’ পুরস্কার দেয়। ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী দীর্ঘদিন যাবত কিডনি জটিলতা ও বার্ধক্যজনিত রোগেও ভুগছিলেন। গত বুধবার তাঁকে গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল।
ব্যক্তিগত জীবনে তিনি এতোটাই সাদামাটা ছিলেন যে এক শার্ট পরেছেন ৩০ বছর! সাদা ও হালকা বেগুনি চেকের একটি শার্ট। ডা.জাফরুল্লাহ চৌধুরী মানেই যেন সেই শার্ট। কিন্তু তিনি ছাত্রজীবনে চড়তেন দামি গাড়িতে এমনকি ছিল পাইলটের লাইসেন্স। লন্ডনে পড়াশোনা অবস্থায় রাজকীয় দর্জি তার বাসায় এসে মাপ নিয়ে স্যুট তৈরি করতেন বলে অতিরিক্ত পরিশোধ করতেন ২০ পাউন্ড। অথচ দেশে-বিদেশে কোথাও তার একটি ফ্ল্যাট পর্যন্ত নেই। বোনকে দান করে দিয়েছেন পৈত্রিক সূত্রে পাওয়া জমিজমা। মরণোত্তর দেহদান করায় দাফনের জন্যও প্রয়োজন হবে না জমির।নিজের সেই বহুপরিচিত শার্ট বিষয়ে ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে এক সাংবাদিককে বলেছিলেন, ওই শার্ট তিনি ৩০ বছর ধরে পরে আসছেন। এ ছাড়া আলাপ চলাকালে তার পরনের প্যান্ট তালি দেওয়া বলেও দেখানো হয়। সে দিন ডা.জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, দেশের মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থা দেখে তিনি সাধারণ বেশভূষায় চলতে পছন্দ করেন। তিনি বলেন, লন্ডনে থাকা অবস্থায় সেখানকার রাজ পরিবারের প্রিন্স চার্লস যে টেইলারে স্যুট সেলাই করতেন, তার স্যুটও সেখানকার দর্জি সেলাই করে দিত। এসে তার জামার মাপ নিয়ে যেত।
ডা.জাফরুল্লাহ চৌধুরী দীর্ঘদিন কিডনি জটিলতা ও বার্ধক্যজনিত রোগেও ভুগছিলেন। গত বুধবার তাঁকে গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতালের প্রধান কিডনি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মামুন মোস্তাফী (২৭ ডিসেম্বর ১৯৪১ – ১১ এপ্রিল ২০২৩) ১১, এপ্রিল ২০১৩ মঙ্গলবার রাত ১১টা ৩৫ মিনিটে ডা.জাফরুল্লাহ চৌধুরীর মৃত্যুর খবর আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেন।
স্যালুট! হে মহাপ্রাণ, বীর!!! ওপারে ভালো থাকুন…
সৃষ্টির প্রকৃত দর্শন আপনাকে দেখলেই বোঝা যায়। স্যার আপনি আবার আসবেন.. আবার যদি এই রঙ্গভরা বঙ্গদেশে আসেন তবে সৎ ও সততাকে ঝেড়ে ফেলে আসবেন, চেতনা বেঁচে যারা খায় তারা এর মূল্য দিতে জানে না!! বীর মুক্তিযোদ্ধা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী সৎ ও সততার এক মানুষরুপী জীবন্ত ঈশ্বর! তিনি আমৃত্যু সব অর্জনকে ছাপিয়ে পেয়েছিলেন সকল মানুষের অকৃত্রিম ভালোবাসা। এই মহান মানুষটির জন্য সমগ্র পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের হ্নদয়ে তার না থাকা জুড়ে কষ্টের বাতিটা আজন্মকাল জ্বলবে।
লেখক ও সাহিত্যিক, ঢাকা, বাংলাদেশ।
তথ্য সূত্রঃ – একাত্তরের দিনগুলি পৃষ্ঠা ১৬১-১৬২। – গেরিলা ১৯৭১



