চাঁদপুর : চাঁদপুরের মতলব উত্তর- মতলব দক্ষিণ উপজেলার সীমান্তবর্তী ধনাগোদা নদীতে নৌকা বাইচে বৈঠার তালে তালে যেন প্রাণ ফিরে পেয়েছে। এ সময় নদীর দুপার আনন্দ ও উল্লাসে মেতে উঠেন নানা বয়সী নারী-পুরুষ ও শিশু।
শুক্রবার (১৪ আগস্ট) বিকেলে ধনাগোদা নদীতে এ নৌকা বাইচ অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিযোগিতা শুরুর আগেই নদীর দুই তীরে নারী, পুরুষ ও শিশুসহ বিভিন্ন বয়সী মানুষের ভিড় জমে। আশপাশের এলাকা ছাড়াও দূর-দুরান্ত থেকে নৌকা ও বিভিন্ন যানবাহনে করে দর্শনার্থীরা ছুটে আসেন প্রতিযোগিতা দেখতে।
নৌকা বাইচ উপলক্ষে সকাল থেকেই দূর-দূরান্ত থেকে আসতে থাকেন দর্শনার্থীরা। মতলব ব্রিজ থেকে আধা কিলোমিটার দূরে কদমতলী বালুরঘাট পর্যন্ত নৌকা বাইচ দেখতে স্থানীয় লোকজনের পাশাপাশি দূর-দূরান্ত থেকেও অনেকে ছুটে আসেন। অনেকে নদীর তীরে জায়গা না পেয়ে পাশের ভবনের ছাদে নয়তো গাছের ডালে ওঠেন।
মোট ৯ টি দলের অংশগ্রহণে আয়োজিত একদিনের এ প্রতিযোগিতা দেখতে নদীর দুই পাড়ে জড়ো হন হাজারো দর্শক। নৌকা বাইচকে ঘিরে নদীর দুই পাড়ে সৃষ্টি হয় উৎসবের আমেজ। অনেকে ট্রলার নিয়েও দেখে নৌকা বাইচ। উত্তেজনাপূর্ণ প্রতিযোগিতা শেষে প্রথম স্থান অর্জন করেন চরবাইশপুর গ্রামের জিলানীর দল, দ্বিতীয় হয়েছে পশ্চিম বাইশপুর এলাকার হাশেম খানের দল ও তৃতীয় স্থান অর্জন করেছে চরমুকুন্দী গ্রামের কামাল সওদাগরের দল।
নৌকা বাইচ শুরু হলে ঢাক-ঢোল, করতালি ও দর্শকদের উচ্ছ্বাসে মুখর হয়ে ওঠে নদীর দুই পাড়। প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া নৌকাগুলো নদীর বুক চিরে দ্রুতগতিতে ছুটে চললে দর্শকদের মধ্যে দেখা দেয় ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা। প্রিয় দলের নৌকাকে উৎসাহ দিতে অনেকেই স্লোগান ও করতালিতে মাতিয়ে তোলেন পুরো এলাকা।
স্থানীয় বাসিন্দা রবিউল আলম বলেন, আজ থেকে ৭ বছর আগে ধনাগোদা নদীতে নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। আনন্দ উদ্দীপনার সাথে ধনাগোদা নদীতে নৌকা বাইচ হয়েছে৷
নৌকা বাইচ আমাদের গ্রামবাংলার ঐতিহ্যের অংশ। এমন আয়োজন দেখতে পেরে আমরা আনন্দিত। পরিবার নিয়ে নৌকা বাইচ দেখতে এসেছি।আমরা চাই প্রতিবছর এই ধনাগোদা নদীতে নৌকা বাইচ হোক৷
দর্শক আকরামুল ইসলাম ফাহিম বলেন, নৌকা বাইচ দেখতে নদীর দুই পাড়ে অনেক মানুষের সমাগম হয়েছে। প্রতিবছর এমন আয়োজন হলে নতুন প্রজন্মও আমাদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হতে পারবে।
স্থানীয়রা আরও জানান, গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচকে ঘিরে উৎসবের আমেজ তৈরি হয়। কর্মব্যস্ত জীবনের বাইরে এমন আয়োজন স্থানীয় মানুষের পাশাপাশি দূর-দূরান্তের দর্শনার্থীদেরও আনন্দ দেয়। বিশেষ করে ধনাগোদা নদীর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সঙ্গে নৌকা বাইচের দৃশ্য দর্শনার্থীদের বাড়তি আকর্ষণ তৈরি করে।
আয়োজকেরা বলেন, নতুন প্রজন্মের কাছে বাংলার ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচকে পরিচিত করা এবং গ্রামীণ সংস্কৃতিকে ধরে রাখতেই এ আয়োজন। ভবিষ্যতেও এমন আয়োজন অব্যাহত রাখার প্রত্যাশা তাঁদের।
নৌকা বাইচকে কেন্দ্র করে নদীর পাড় ও মতলব সেতুতে উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি হওয়ায় স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মধ্যেও প্রাণচাঞ্চল্য দেখা যায়। নদীর দুই পাড়ে বসে বিভিন্ন অস্থায়ী দোকান ও খাবারের স্টল। সব মিলিয়ে নদীর তীরজুড়ে ছিল উৎসবের আবহ।
নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহবায়ক নূরে আলম মিয়াজীর সভাপতিত্বে প্রধান অতিথির বক্তব্য বিসিবির পরিচালক ও ড্যাব কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি অধ্যাপক ডাঃ সরকার মাহবুব আহমেদ শামীম বলেছেন, বর্তমানে মাদক থেকে যুব সমাজকে দূরে রাখতে ও কিশোর গ্যাংয়ের অবসান ঘটাতে এ নৌকা বাইচ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। যুবসমাজ খেলাধুলা ও এমন কর্মকান্ডে জড়িত থাকলে অপরাধ থেকে দূরে থাকতে সহজ হবে।
তিনি আরও বলেন,নদীর নাব্যতা ফেরাতে গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতা অনেক বড় ভূমিকা রাখবে। আমরা মনে করি নদী বাঁচলে পরিবেশ বাঁচবে। তাই এই নদী সংরক্ষণে আমাদের সবার সচেতন হতে হবে।
আরও বক্তব্য রাখেন ক্রীড়া সংগঠক ও কেন্দ্রীয় যুবদলের সহ- ক্রীড়া সম্পাদক মেজবাহ উদ্দিন মেজু, জেলা ছাত্রদলের যুগ্ম আহবায়ক ইদ্রিস সরকার মুন্না, ছাত্রদল নেতা রাজা ফয়সাল
প্রমুখ।
নৌকা বাইচ বিজয়ী দলকে ট্রফিসহ একটি ফ্রিজ, দ্বিতীয় স্থান অর্জনকারী দলকে ৩২ ইঞ্চি একটি রঙিন টিভি ও তৃতীয় স্থান অর্জনকারী দলকে ২৪ ইঞ্চি রঙিন টিভি দিয়ে পুরস্কৃত করা হয়।
ফম/এমএমএ/



