ট্রান্সফরমার চুরি, ভোগান্তি গ্রাহকের

চাঁদপুর : চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলায় একের পর এক বৈদ্যুতিক ট্রান্সফরমার চুরি হচ্ছে। চলতি ২০২৬ সালে এ উপজেলায় এখন পর্যন্ত ২৪টি ট্রান্সফরমার চুরি হয়েছে বলে জানিয়েছে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি। এর মধ্যে শুধু জুলাই মাসেই চুরি হয়েছে ১৩টি। আগস্টের প্রথম ১৪ দিনেই চুরি হয়েছে আরও ছয়টি। সর্বশেষ গত বুধবার রাতে ছেংগারচর পৌর এলাকার দুটি স্থান থেকে দুটি ট্রান্সফরমার চুরি হয়েছে।

এতে বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়ছেন শত শত গ্রাহক। চুরি যাওয়া ট্রান্সফরমার দ্রুত প্রতিস্থাপন না হওয়ায় কোনো কোনো এলাকায় কয়েক দিন পর্যন্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকছে। তার ওপর নতুন ট্রান্সফরমার বসাতে গ্রাহকদের কাছ থেকে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। ফলে একদিকে বিদ্যুৎহীনতার ভোগান্তি, অন্যদিকে বাড়তি আর্থিক চাপ—দুই দিক থেকেই বিপাকে পড়েছেন গ্রাহকেরা।

চাঁদপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২-এর মতলব উত্তর জোনাল অফিসের ডিজিএম মো. ওয়াহিদুজ্জামানের হিসাবে, চলতি ক্যালেন্ডার বছরে তাঁর আওতাধীন এলাকায় মোট ২৪টি ট্রান্সফরমার চুরি হয়েছে। এর মধ্যে জুলাইয়ে ১৩টি এবং আগস্টে ছয়টি চুরি হয়। বছরের প্রথম ছয় মাসে চুরি হয়েছিল পাঁচটি।

সর্বশেষ ১২ আগস্ট রাতে ছেংগারচর পৌর এলাকার দেওয়ানজীকান্দি গ্রামের বাইতুননুর জামে মসজিদের পাশের একটি খুঁটি এবং জীবগাঁও গ্রামের দক্ষিণ দিকে ইব্রাহীম আখনের বাড়ির সামনে থেকে আরেকটি ট্রান্সফরমার চুরি হয়। এতে একটি মসজিদসহ আশপাশের অর্ধশতাধিক আবাসিক গ্রাহকের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

এর আগে ৩১ জুলাই রাতে ফতেপুর পশ্চিম ইউনিয়নের নাউরি ও ফৈলাকান্দি এলাকায় এক রাতেই চারটি ট্রান্সফরমার চুরি হয়। গত তিন মাসে ১২টি চুরির খবর প্রকাশের পরও চুরি থামেনি। জাতীয় দৈনিক ইত্তেফাক-এর প্রতিবেদনে ওই চারটি ট্রান্সফরমার চুরির পর কোনো কোনো গ্রাহক ১৫০ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎবিহীন থাকার তথ্য উঠে আসে।

‘চোরেরা বিদ্যুতের কাজ জানে’

চুরির ধরন দেখে পল্লী বিদ্যুৎ কর্মকর্তারা বলছেন, এ কাজে অভিজ্ঞ ব্যক্তিরাই জড়িত। কারণ, কোনো কোনো ক্ষেত্রে লাইনে বিদ্যুৎ থাকা অবস্থায়ও ট্রান্সফরমার খুলে নেওয়া হচ্ছে।

চাঁদপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২-এর মতলব উত্তর জোনাল অফিসের সহকারী জেনারেল ম্যানেজার (চলতি দায়িত্ব) মো. নাঈম বলেন, যারা ট্রান্সফরমার চুরি করছে, তারা বিদ্যুৎ-সংক্রান্ত কাজে অভিজ্ঞ। এ কারণেই লাইনে বিদ্যুৎ থাকা অবস্থায়ও তারা ট্রান্সফরমার খুলে নিয়ে যেতে পারছে।

ডিজিএম মো. ওয়াহিদুজ্জামানের ধারণা, ট্রান্সফরমার চুরির পেছনে সংঘবদ্ধ চক্র রয়েছে। চক্রটি বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে পরিবেশ ও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে প্রত্যন্ত ও নির্জন স্থান থেকে ট্রান্সফরমার চুরি করছে। পরে সেগুলো ভাঙারি পট্টিতে বিক্রি করা হচ্ছে বলে তাঁদের ধারণা।

বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তাদের ধারণা, চোরদের মূল লক্ষ্য ট্রান্সফরমারের ভেতরে থাকা মূল্যবান তামার কয়েল ও তার। ট্রান্সফরমার খুলে তামা বের করে নেওয়ার পর বাকি অংশ ফেলে দেওয়া হচ্ছে।

লোডশেডিংও চোরদের সুযোগ

চলমান তীব্র লোডশেডিংয়ের সুযোগ নিয়ে চোরেরা ট্রান্সফরমার সরিয়ে নিচ্ছে বলে মনে করছেন পল্লী বিদ্যুৎ কর্মকর্তারা। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় গ্রাহকেরা সেটিকে স্বাভাবিক লোডশেডিং মনে করেন। এই সুযোগে চোরেরা নির্জন এলাকার ট্রান্সফরমার খুলে নিয়ে যায়।

ডিজিএম মো. ওয়াহিদুজ্জামান বলেন, দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় অনেক গ্রাহক বিষয়টি গুরুত্ব দেন না। চোরেরা এই সুযোগটি কাজে লাগাচ্ছে। পরিস্থিতিকে তিনি ‘অত্যন্ত অ্যালার্মিং’ বলে উল্লেখ করেন। চুরি ঠেকাতে গ্রাহকদের সচেতন করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

তিনি জানান, প্রতিটি চুরির ঘটনায় মামলা করা হয়েছে। পুলিশ, উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে। গ্রাহকদের সচেতন করতে প্রত্যন্ত এলাকায় মাইকিং, উঠান বৈঠক, বিশেষ সভা ও গণশুনানিও করা হচ্ছে।

চুরির দায়ও পড়ছে গ্রাহকের ওপর

ট্রান্সফরমার চুরির পর বিদ্যুৎ সংযোগ ফিরে পেতে গ্রাহকদের নতুন করে অর্থের জোগান দিতে হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় গ্রাহকদের ভাষ্য, প্রথমবার কোনো ট্রান্সফরমার চুরি হলে নতুন ট্রান্সফরমারের মূল্যের একটি অংশ তাঁদের বহন করতে হয়। নিম্নআয়ের মানুষের জন্য এই অর্থ জোগাড় করা কঠিন হয়ে পড়ে।

জাতীয় দৈনিক নয়া দিগন্ত-এর প্রতিবেদনে বলা হয়, গত তিন মাসে ১২টি ট্রান্সফরমার চুরির ঘটনায় গ্রাহকদের দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎহীন থাকতে হয়েছে। চুরি হওয়া একটি ২৫ কেভিএ ট্রান্সফরমারের পরিবর্তে গ্রাহকদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করে নতুন ট্রান্সফরমার বসানোর তথ্যও ওই প্রতিবেদনে উঠে আসে।

চাঁদপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২-এর জেনারেল ম্যানেজার মো. আতিকুজ্জামান চৌধুরী বলেন, ট্রান্সফরমার চুরি হলে গ্রাহকদের ভোগান্তি চরমে পৌঁছে। প্রতিটি ঘটনায় মামলা করা হয়েছে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে অভিযান চালানো হচ্ছে। এ ধরনের চুরি ঠেকাতে জনগণের আরও সক্রিয় সহযোগিতা প্রয়োজন।

পুলিশের অভিযানেও এখনো সাফল্য নেই

ট্রান্সফরমার চুরির ঘটনায় মামলা হলেও এখন পর্যন্ত চক্রের কাউকে শনাক্ত বা গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি বলে পুলিশ জানিয়েছে।

মতলব উত্তর থানার ওসি মো. কামরুল হাসান বলেন, বৈদ্যুতিক ট্রান্সফরমার চুরির সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে। তবে এখন পর্যন্ত কাউকে শনাক্ত কিংবা গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি।

ফলে প্রশ্ন উঠেছে, একের পর এক চুরি ও মামলা হলেও কেন চোরচক্র শনাক্ত হচ্ছে না। বিশেষ করে বিদ্যুৎ থাকা অবস্থায় ট্রান্সফরমার খুলে নেওয়ার মতো ঝুঁকিপূর্ণ কাজ কীভাবে সংঘবদ্ধভাবে করা হচ্ছে এবং চুরি করা ট্রান্সফরমারের তামা কোথায় বিক্রি হচ্ছে-এসব বিষয় তদন্তের আওতায় আনার দাবি উঠেছে।

ফম/এমএমএ/

সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট | ফোকাস মোহনা.কম