পথচারীদের ফুটপাত দখলে মহামায়া বাজারের ব্যবসায়ী ও যান চালকরা

চাঁদপুর: চাঁদপুর সদর উপজেলার ঐতিহ্যবাহী বাণিজ্যিক কেন্দ্র হচ্ছে মহামায়া বাজার। চাঁদপুর-কুমিল্লা আঞ্চলিক মহাসড়কের কোল ঘেঁষা এ বাজারটিতে দীর্ঘ এক যুগের মতো ব্যবস্থাপনা কমিটির নির্বাচন না হওয়ায় বর্তমানে তা অভিভাবক শূন্য। শতবর্ষী এ বাজারটির দিকে তাকালে মুখ ফিরিয়ে নিতেই ইচ্ছে করবে যে কারো।
শনিবার (২৫ এপ্রিল) সরেজমিনে গিয়ে বাজারটি ঘুরে দেখা যায়, ঐতিহ্যবাহী এ বাজার ব্যবসায়ীদের মনগড়া সিদ্ধান্তে চলে ব্যবসা বাণিজ্য। সিএনজি-অটো চালক ও ব্যবসায়ীদের দখলে পথচারীদের ফুটপাত, বাজারের ভেতরে যানজট, আর প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তা মিলিয়ে সাধারণ মানুষের জীবন হয়ে উঠেছে দুর্বিষহ। মহামায়া বাজারে প্রতিদিন হাজারো মানুষ আসা-যাওয়া করে। কিন্তু ফুটপাতগুলো এখন আর পথচারীদের নয়- সেগুলো দখল করে রেখেছে বিভিন্ন ব্যবসায়ী ও অটো-সিএনজি চালকরা। ফলে মানুষকে বাধ্য হয়ে সড়কে হাঁটতে হয়, যা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিয়েছে। সেই সাথে বাজার ব্যবসায়ীদের বর্জ্য ফেলার জন্য নেই কোন নির্দিষ্ট ডাস্টবিন। এতে করে যে যার মত এদিক সেদিক ময়লা ফেলে পরিবেশ নষ্ট করছেন ব্যবসায়ীরা। ড্রেনগুলো থেকে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে বাজারের ভিতর। স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়ছেন ক্রেতা-বিক্রেতাসহ বাজারে আগত জনসাধারণ।
গত কয়েক বছর এ বাজারটি থেকে সরকার লাখ লাখ টাকা রাজস্ব নিলেও উন্নয়ন হয়নি এক টাকারও। উন্নয়নহীন এ বাজারের শৌচাগারে গেলে দম বন্ধ হয়ে আসে নোংরা পরিবেশ আর দুর্গন্ধে। এই শৌচাগারটিতে যেতে চান না বেশিরভাগ ব্যবসায়ী কিংবা জনসাধারণ। সন্ধার পরে উক্ত স্থানটিতে হয়ে উঠে মাদকসেবীদের এক অভয়াশ্রম। এছাড়াও বাজারে বর্তমানে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যে, কোন দোকানে অগ্নিকান্ড ঘটলে বাজারের আশেপাশে কোন পানি না থাকায় ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা এসেও বিপাকে পড়তে হয়। এতে চরম ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে ঐ ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীদেরকে। এদিকে নির্দিষ্ট কোন পরিচালনা কমিটি না থাকায় ব্যবসায়ীরাও তাদের সমস্যার কথা জানাতে পারছেন না কারো কাছে। অস্থায়ী দু চারজন ব্যবসীকে দিয়ে চালিয়ে নিচ্ছেন বাজারের আয় ব্যায় হিসাব। এ নিয়ে চাঁদপুরের স্থানীয় ও জাতীয় গণমাধ্যমে বহুবার সংবাদ প্রকাশ হলেও নেয়া হয়নি কোন ব্যবস্থা। পদাধিকার বলে শাহমাহমুদপুর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যানদেরকে বাজার ব্যবসায়ীরা জোড় দাবী জানালেও কোন ব্যবস্থা নিতে পারেননি তারা।
চাঁদপুর সদর, হাজীগঞ্জ, মতলব দক্ষিণ ও ফরিদগঞ্জ উপজেলার মানুষের জনসমাগম ঘটে এ বাজারটিতে। উৎপাদন কারখানা, আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আর্থিক প্রতিষ্ঠান সহ জনগুরুত্বপূর্ণ সরকারি ও বেসরকারি কয়েকটি প্রতিষ্ঠান এই এলাকায় থাকায় এই বাজারের গুরুত্ব দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এছাড়াও এই বাজারের চতুর্দিকে রয়েছে মাদ্রাসা, ব্যাংক-বীমা, এনজিও সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এ সকল প্রতিষ্ঠান থাকার কারণে এই এলাকায় ঘনবসতি দিন দিন বেড়েই চলছে। তাদের কেনা কাটার নির্ভরযোগ্য বাজার হচ্ছে মহামায়া। এ বাজারে প্রতিনিয়ত দূর-দূরান্ত থেকে বাজার করতে আসে শত শত মানুষ। বাজারটি আশপাশের মধ্যে সবচেয়ে বড় হওয়ায় ক্রেতা-বিক্রেতা সমাগমও ঘটে ব্যাপক। কিন্তু সবচেয়ে সমস্যার বিষয় হচ্ছে, মহামায়া বাজারে নেই কোন শৃঙ্খলা, ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রিক। তাই প্রাথমিক ভাবে একটি উচ্ছেদ অভিযানের মাধ্যমে বাজারের সার্বিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা ও একটি সুষ্ঠু নির্বাচন দিয়ে বাজারের নিত্যদিনের সমস্যাগুলি সমাধান হওয়া জরুরি বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
বাজারের কয়েকজন ব্যবসায়ী অভিযোগ করে বলেন, আমরা বাজারের ব্যবসায়ী হয়ে কোন সুযোগ সুবিধা পাইনি। দীর্ঘ কয়েক বছর যাবত এ বাজারে কমিটি না থাকায় বাজারের এখন বেহাল অবস্থা। অনিশ্চিত নিরাপত্তায় লাখ লাখ টাকার মালামাল রেখে বাড়িতে যেতে হয়। অসংখ্য সমস্যায় জর্জরিত ঐতিহ্যবাহী এ বাজারটি। ব্যস্ততম এ বাজারের একটি সুষ্ঠু নির্বাচন দিয়ে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে প্রশাসনের সু দৃষ্টি কামনা করছি। কয়েকজন পথচারী বলেন, বাজারের প্রায় সবগুলো গলি যে যার মতো করে দখল করে রেখেছে ব্যবসায়ীরা। ফলে গলির ভিতর দিয়েও হাঁটা চলা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। এমনকি চাঁদপুর-কুমিল্লা আঞ্চলিক সড়কের উপর দিয়েও চলাচল করতে হয় অত্যন্ত ঝুঁকি নিয়ে। কারন পথচারীদের ফুটপাত এখন বিভিন্ন ব্যবসায়ী ও অটো-সিএনজি চালকদের দখলে। বাজারে কোনো কমিটি নেই, নেই কোনো কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা। ব্যবসায়ী ও চালকরা নিজেদের মতো করে জায়গা দখল করে বসে থাকেন। অত্যন্ত জটিল কষ্টকর মানুষের চলাফেরা। বিকল্প ব্যবস্থা করে দিয়ে দ্রুত বাজারের সুন্দর পরিবেশ ফিরিয়ে আনা জরুরি।
এ বিষয়ে বাজার ইজারাদার আবু তাহের খোকন বলেন, বাজারের পরিবেশ আসলেই বেহাল। আমরা কয়েকবার ব্যবসায়ীদেরকে অবগত করেছি ফুটপাত খালি করে দেয়ার জন্য। বেশিরভাগ ব্যবসায়ী বিষয়টি আমলে নেন নি। প্রশাসনিক কোন সাপোর্ট না থাকায় জোড়ালোভাবে কোন ব্যবস্থা নিতে পারিনি। তারপরও কিছু কিছু জায়গা খালি করে দিয়েছি। পদাধিকার বলে বাজার ব্যবস্থাপনা কমিটির সাবেক সভাপতি ও শাহমাহমুদপুর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান স্বপন মাহমুদ বলেন, বাজারের একটি সুন্দর পরিবেশ গঠনে প্রশাসনের সর্বাত্মক সহযোগিতা প্রয়োজন। আমরা দলীয় লোকজন দিয়ে কয়েকবার চেষ্টা চালিয়েছি। তারপর আবার যেই সেই হয়ে যায়।
এ বিষয়ে চাঁদপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম এন জামিউল হিকমা বলেন, মহামায়া বাজারের উন্নয়নে প্রাথমিকভাবে অত্যাধুনিক বাথরুম ও সিসি ক্যামেরা স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বাকী সমস্যাগুলো পর্যায়ক্রমে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
ফম/এমএমএ/

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট | ফোকাস মোহনা.কম