সামাজিক অস্থিরতা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ মানুষের নৈতিক অবক্ষয়

মোঃ মহসিন হোসাইন ।। প্রায় মাস পেরিয়েছে। পত্রিকা, পোর্টালে আমার লেখা আসেনি। পেশাগত কাজের ব্যস্ততা, গবেষণাধর্মী কিছু কাজ। সবমিলিয়ে লেখা পাঠাতে পারিনি। আমার আনাড়ি হাতে নস্যি মার্কা লেখাগুলো ধৈর্য্য নিয়ে অনেক সন্মানিত পাঠক পড়েন। কিন্তু লেখায়, ‘আমাকে এতো অনুভব করেন’ সত্যিই জানা ছিল না। লেখা প্রকাশের সপ্তাহ না যেতে, ইনবক্সে, মেইলে আসতে থাকে তাদের আবদার, আদেশ।’ এটা নিয়ে লেখেন’,’ওটা নিয়ে লেখেন’, এভাবে, সেভাবে, আরো কতো কি?

আমি জানি, এখন প্রথিতযশা /গুণীজনের লেখা ও পড়তে পাঠকদের সময় বা আগ্রহ নেই। দৈনন্দিন পারিবারিক ও সামাজিক বহুমুখি চিন্তা, হতাশা, অস্থিরতা, মননীয় ঘাটতি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বহুবিধ ব্যস্ততা, আকাশ সংস্কৃতিতে রীতিমতো উত্তর মেরু, দক্ষিণ মেরু দাপিয়ে বেড়ানোর প্রতিযোগিতা। নাতিদীর্ঘ লেখা ছাড়া বড়ো পরিসর লেখা পাঠকের সংখ্যা শুধু আমাদের দেশে নয়, বিদেশে ও কমে যাচ্ছে। তবে আশাজাগানিয়া সংবাদ, নতুন প্রজন্ম যারা দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার, যারা কমিটমেন্ট বিশ্বাস করে, লালন করে, তারা কিন্তু পঠনশীল ও মননশীল।

মানুষ আদিকাল থেকেই মা, বাবা, আত্মীয়স্বজন ও পরিবার-পরিজন নিয়ে সংঘবদ্ধ হয়ে বিনে সুতায় বাঁধা নামক সমাজে বসবাস করে আসছে। সমাজে বসবাস করতে হলে কিছু বিষয় অবশ্যই প্রত্যেকের পালন করা দায়িত্ব ও কর্তব্যের মধ্য পড়ে যায়। যেমন- বড়রা ছোটদের প্রতি স্নেহশীল ও সৌহার্দপূর্ণ আচরণ করবে, তদ্রুপ বড়দের প্রতি সম্মান দেখানো ও তাদের অবাধ্য না হওয়াটাও ছোটদের সৌন্দর্যের এক দারুণ বহিঃপ্রকাশ। সুন্দর ও সমৃদ্ধশালী জীবন অতিবাহিত করার জন্য প্রয়োজন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, নির্মল বাতাস ও সুষম খাদ্য এবং উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হওয়ার অবাধ স্বাধীনতা যেখানে ছেলে-মেয়ে উভয়ই সমানভাবে একই ছাদের নিচে বসে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারা। সেখানে মা, বাবা ও শিক্ষক, শিক্ষিকা এবং ছাত্র-ছাত্রীর ভেতর থাকবে বন্ধুত্বের সম্পর্ক। এই তিনটা বিষয়ের সমন্বয় হলেই ছেলে-মেয়েরা পড়ালেখা করার অনুকূল পরিবেশ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের সৃজনশীলতা ও বুদ্ধিমত্তা দেখানোর উত্তম সুযোগ পায়। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে, আমরা চাইলেই সবকিছু আমাদের মতো করলে চলবে না। প্রকৃতি তার নিজস্ব গতিতে নিজের স্বকীয়তা নিয়ে যুগ যুগ ধরে চলে এসেছে, এই চলার পথে নিজের মতো করে রূপ বদলিয়ে ভাঙাগড়ার মধ্যে দিয়ে আধুনিক থেকে আধুনিকতার স্পর্শে নিজেকে সুশোভিত করেছে।

একটা কথা না লিখলে মূল প্রসঙ্গে যাওয়া মুশকিল হয়ে যায়, কথাটা হলো প্রকৃতি কখনো মানুষের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলে না বরং মানুষই প্রকৃতির সব ভালো, খারাপ দিকগুলো মেনে নিয়ে এটার সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে তাল ঠিক রেখে চলার চেষ্টা করে। তাহলে এ থেকে বোঝা যাচ্ছে যে প্রকৃতির সঙ্গে সঙ্গে আমরাও পরিবর্তনশীল তা না হলে আমাদের অস্তিত্ব অনেক আগেই পৃথিবী থেকে মুছে যেত।

বর্তমান বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে শিক্ষা-দীক্ষা, আধুনিকতা ও উন্নয়নে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। ডিজিটাল যুগ অতিবাহিত করছে এই দেশ। এরই মধ্যে দেশের সমাজ ব্যবস্থায় বিভিন্ন কারণে দুর্নীতি, ধর্ষণ, আত্মহত্যা, খুন, শিশু ও নারী নির্যাতন, ভূমি দখল, মুক্তিপন আদায়, সন্ত্রাসবাদ, মাদক, মারামারি, হানাহানি, অস্থিরতাসহ বাড়ছে অপরাধপ্রবণতা।

যা প্রতিদিন দৈনিক পত্রিকা, ইলেক্ট্রনিক্স মিডিয়া, সামাজিক যোগাযোগসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছে। সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করছেন, সামাজিক অস্থিরতা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ মূল্যবোধ তথা মানুষগুলোর নৈতিক অবক্ষয়। নৈতিকতার অবক্ষয়ের কারণে আজ সন্তানদের কাছে পিতা-মাতা নিরাপদ নয়, পিতামাতার কাছে সন্তানরা নিরাপদ নয়, শিক্ষকদের কাছে শিক্ষার্থীরা নিরাপদ নয়, শিক্ষার্থীদের কাছে শিক্ষকরা নিরাপদ নয়, ডাক্তারের কাছে রোগী নিরাপদ নয়, চাচার কাছে ভাতিজি নিরাপদ নয়, সমাজে ছোট্ট শিশুরা নিরাপদ নয়!

প্রত্যেককে নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত করতে পারলে আমরা সুন্দর একটি সমাজ, সুন্দর একটি রাষ্ট্র ও সুন্দর একটি পৃথিবী গড়তে পারব। ইসলাম ধর্মে নৈতিক শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। আমরা প্রথমে নৈতিকতা কি তা বুঝার চেষ্টা করি। একজন মানুষ এবং পশুর মধ্যে পার্থক্য হলো মানুষের বিবেক। যেটি নৈতিকতা দ্বারা পরিচালিত হয়। যে ব্যক্তির মাঝে নৈতিক শিক্ষা রয়েছে, তার বিবেক বলে দিবে কোন কাজটি ভালো আর কোন কাজটি খারাপ। কোন কাজটি করলে সমাজে ক্ষতি হবে আর কোন কাজটি করলে সমাজ উপকৃত হবে।

মানসিক বিকাশ ও নৈতিক চরিত্র গঠনে সামাজিক মূল্যবোধ ও পারিবারিক সুশিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। মূলত মায়ের কোলে শিশুর শিক্ষার হাতেখড়ি। পরিবার থেকেই শিশু প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করে। ফলে পরিবার মানব সন্তানের প্রথম শিক্ষা নিকেতন। সন্তানের মূল্যবোধ, চরিত্র, চেতনা ও বিশ্বাস জন্ম নেয় পরিবার থেকেই। বাবা-মা যেমন আদর্শ লালন করেন, তাদের সন্তানরাও সেটা ধারণ ও লালন করার চেষ্টা করে।

পরিবার হলো প্রেম-প্রীতি ভালোবাসা ও মায়া-মমতায় ভরা এমন একটি সুসজ্জিত বাগানের মতো যেখানে প্রতিটি সদস্য তার চারিত্রিক গুণাবলি বিকশিত করার পর্যাপ্ত সুযোগ পায়। নৈতিক গুণাবলিসমৃদ্ধ হয়ে তারা পারিপার্শ্বিক পরিবেশকে সুশোভিত ও মোহিত করে। এটা এমন এক নিরাপদ আশ্রয়স্থল যা বাইরের যাবতীয় পঙ্কিলতা ও আক্রমণ থেকে শিশুসন্তানকে সুরক্ষিত রাখতে সক্ষম। শিশুর সামাজিক মুল্যবোধ শিক্ষার প্রাথমিক শিক্ষাকেন্দ্র হলো পরিবার। আর পরিবার থেকেই মূল্যবোধ শিখালে সন্তানের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে প্রগতিশীল, দায়িত্বশীল ও কর্তব্যপরায়ন করে তোলে।

আজকের তরুণরাই জাতির আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। তাদের বেড়ে ওঠা ও প্রাপ্ত শিক্ষার ওপর সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ কেমন হবে তা নির্ভর করে। তাই তরুণ প্রজন্ম এবং তার ভবিষ্যৎ ও নীতি-নৈতিকতা নিয়ে বর্তমান প্রজন্মকেই ভাবতে হয়। চলমান আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে তরুণ প্রজন্ম নিজে নিজে বেড়ে উঠবে এমন ভাবাটা ঠিক নয়। সুষ্ঠু ও সুপরিকল্পিত পরিকল্পনার মাধ্যমে তাদের গড়ে তুলতে হয়। প্রয়োজন হয় যত্ন্ন ও পরিচর্যার। বিগত কয়েক দশক ধরে সেই যত্ন্ন ও পরিচর্যার অভাবেই সৃষ্টি হয়েছে সামাজিক অবক্ষয়, নতুন প্রজন্ম ধাবিত হচ্ছে অধঃপতনের দিকে।

তাই আমরা যদি এখন থেকেই সচেতন না হই, প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ না গ্রহণ করি, তাহলে তরুণ প্রজন্মের ধ্বংস অনিবার্য। যা সমগ্র জাতির জন্য এক মহা সর্বনাশের কারণ হয়ে দাঁড়াবে। বর্তমান সামাজিক প্রেক্ষাপটে একে অপরের মাঝে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের অভাব প্রকট। পরমত সহিষ্ণুতা ও ধৈর্য সামাজিক মূল্যবোধের অন্যতম চাবিকাঠি। সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রেই তা লক্ষ্য করা যায়।

অন্যদিকে প্রতিবছরই লাখ লাখ বেকার যুবক-যুবতীর সরকারি চাকরির বয়স সীমা শেষ হয়ে যায়, তাহলে তাদের এই আর্তনাদ কে দেখবে? বয়স সীমা শেষ হওয়ার কারণে এবং উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত একজন স্নাতক ডিগ্রিধারী কাক্সিক্ষত চাকরি না পাওয়ায় হতাশ হয়ে অনেক সময় আত্মহত্যা করে। আত্মহত্যাকে পৃথিবীর সব ধর্মে মহাপাপ হিসেবে বলা হয়েছে। তবে মানুষ আত্মহত্যা করে তখনই যখন নিজেকে আত্মহারা ব্যর্থ, হতাশ ভাবে। সচারাচর যারা হতাশাগ্রস্ত থাকে তাদের দেখলে খুব সহজে বোঝা যায়, যদি সে আপনার খুব কাছের মানুষ হয় তাহলে তাকে বুঝিয়ে বলুন, ভেঙে না পড়ে উঠে দাঁড়িয়ে হাঁটতে বলুন, এই হাঁটা মানে দুই পায়ে হাঁটা নয়, মনের ভেতরে নতুন স্বপ্নের বীজ বুনে ভালো কিছু করার আত্মবিশ্বাস নিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়ে কিছু করবই এমন ভাব আনা। হতাশাগ্রস্ত ছেলে-মেয়ের সঙ্গে বন্ধুর মতো ব্যবহার করুন তার বয়স যাই হোক না কেন, সেটা এ ক্ষেত্রে মুখ্য বিষয় না। ভালোটা বুঝিয়ে বলুন, তাদের আগুনে ঘি ঢেলবেন না। হতেও পারে কালজয়ী কোনো সফলতা তাকে দিয়ে আসবে। তেলা মাথায় তেল না দিয়ে বন্ধু সেজে শুকনো মাথায় তেল দিন। আপনার দেওয়াটা বড় আকারে আপনার কাছেই ফিরে আসবে। সুতরাং প্রত্যেকে প্রত্যেকের সঙ্গে বন্ধুসুলভ আচরণ করুন তা না হলে মানসিক বিষণ্নতা আমাদের কালো মেঘের ন্যায় ঘিরে ধরতে পারে। যার ফলাফল আমাদের কারোর জন্যই সুখকর হবে না। সর্বোপরি মানুষকে ভালোবাসুন, খারাপ সময়ে প্রত্যেকে প্রত্যেকের পাশে থাকুন।

লেখক : লেখক, কলামিস্ট ও সাংবাদিক
কেন্দ্রীয় সভাপতি- মানবতার ডাক সাহিত্য পরিষদ।

ফোকাস মোহনা.কম