
এস ডি সুব্রত।। বিশ্বে পানির পরেই জনপ্রিয় পানীয় হচ্ছে চা । সকালে এক কাপ সতেজ চা না হলে যেন আমাদের চলেই না । ১৬৫০ খ্রিষ্টাব্দে চীনে বাণিজ্যিকভাবে চায়ের উৎপাদন শুরু হয়। আর ভারতবর্ষে এর চাষ শুরু হয় ১৮১৮ খ্রিষ্টাব্দে। ১৮৫৫ খ্রিষ্টাব্দে ব্রিটিশরা সিলেটে সর্বপ্রথম চায়ের গাছ খুঁজে পায়। এরপর ১৮৫৭ সালে সিলেটের মালনীছড়ায় শুরু হয় বাণিজ্যিক চা চাষ । ইংরেজ লেখিকা ক্যারোলাইন অ্যাডামস তার ‘সাত সমুদ্র তের নদীর ওপারে’ গ্রন্থে সিলেটে চা-বাগানের উষালগ্ন সম্পর্কে বলতে গিয়ে লিখেছেন, ‘প্রথম দিকের বাগান মালিকেরা তাদের দুর্ব্যবহারের জন্য ছিল কুখ্যাত, মদ্যপ, বাগানগুলো অব্যবস্থাপনার শিকার এবং শ্রমিকেরা বঞ্চিত ও অব্যবহৃত। … বাগান শ্রমিকদের অত্যধিক খাটানো হতো, তাদের বাসস্থান নিম্নমানের এবং মজুরি ব্রিটিশ মালিকদের মুনাফার তুলনায় খুবই নগণ্য।’
চা-শ্রমিক ইউনিয়ন সিলেট ভ্যালির সাবেক সভাপতি শ্রীবাস মাহালী মনে করেন, শতবর্ষ আগের এই মূল্যায়ন এখনও প্রাসঙ্গিক। আজকের দিনেও চা-শ্রমিকদের ভাগ্যের বদল হয়নি। তাদের ঘরবাড়ি খুবই নিম্নমানের। কারোরই ভূমির অধিকার নেই। তাদের খাটানো হয় অত্যধিক, কিন্তু মজুরি দেয়া হয় খুবই সামান্য। যাদের শ্রমে ও ঘামে চা পৌঁছে যায় ঘরে ঘরে তাদের জীবনের খবর কজন রাখে ? কিভাবে চলে তাদের সংসার তা আমরা অনেকেই জানি না । ইদানিং চা শ্রমিকদের ৩০০ টাকা মজুরির দাবিতে ধর্মঘটের কারণে বিষয়টি নজরে আসে সবার । মিডিয়া ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এ নিয়ে বেশ সাড়া পড়ে যায় । ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া এক চা শ্রমিকের সন্তানের ফেসবুকে আবেগঘন স্ট্যাটাস ভাইরাল হয় ইদানিং । চা শ্রমিকদের জীবনের করুন কাহিনী পড়ে অশ্রু সংবরণ করতে পারেনি অনেকেই ।
দেশের ২৪১টি চা বাগানে ধর্মঘট শুরু হয় গত ৯ আগস্ট । দেড় লাখের বেশি শ্রমিক চা পাতা তোলার কাজ থেকে বিরত আছেন। চা বাগানগুলোতে এ , বি এবং সি এই তিন ভাগে ভাগ করা হয়।এর মধ্যে এ শ্রেণির চা বাগানে দিনে সর্বোচ্চ মজুরি ১২০ টাকা। শ্রমিকেরা এখন দিনে ৩০০ টাকা মজুরি দাবি করেছেন । প্রতি দুই বছর পর পর তাদের মজুরি বাড়ানোর কথা থাকলেও ২০১৮ সালের পর আর মজুরি বাড়ানো হয়নি। মজুরির বাইরে শ্রমিকেরা সপ্তাহে তিন কেজি আটা পান, দুই টাকা কেজি দরে। এছাড়া তাদের চিকিৎসা ও আবাসন সুবিধা দেয়ার কথা। একই সঙ্গে সন্তানদের শিক্ষা সুবিধা থাকার কথা। চা গাছের দু’টি পাতা ও একটি কুঁড়ি থেকেই আমরা পাই সুপেয় চা৷ বাংলাদেশে এক সময় শুধু বৃহত্তর সিলেট জেলাতেই চা বাগান ছিল৷ সিলেটের অন্য নাম তাই ‘দু’টি পাতা একটি কুঁড়ির দেশ’৷ ধীরে ধীরে বাংলাদেশে চা বাগানের সংখ্যা ৷ চা বোর্ডের হিসেব অনুযায়ী, এখন মোট ১৬২টি চা বাগান রয়েছে বাংলাদেশে৷ এর মধ্যে ৯০টি মৌলভীবাজার জেলায়, ২৩টি হবিগঞ্জ, ১৮টি সিলেট, ২১টি চট্টগ্রাম এবং বাকি ৯টি পঞ্চগড় জেলায় । চা শ্রমিকদের অক্লান্ত শ্রমেই গড়ে ওঠে চা বাগান, বাগান থেকে তাঁদের হাতই তুলে আনে ‘দু’টি পাতা একটি কুঁড়ি’, তাঁদের শীর্ণ পিঠে চড়েই কারখানায় যায় সোঁদা গন্ধের পাতার বোঝা৷ বাংলাদেশে এখন চা শ্রমিকদের সংখ্যা প্রায় ১ লাখ ২২ হাজারের মতো৷
তিন দশক আগে একজন চা শ্রমিক পাহাড়ি বাগানের রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে সারাদিনের কাজ শেষে পেতেন সাত টাকা, এখন মজুরি ৮৫ থেকে ১২০ টাকা৷ চা বাগানেই চা শ্রমিকদের বাস৷ বাগানের শ্রমিকেরা এক পাড়ায় থাকেন বলে পাড়ার নাম হয়ে গেছে ‘লেবার লাইন’৷ ৮ হাত বাই ১২ হাতের এক টুকরো জমির ওপর গড়ে তোলা মাটির ঘরে গাদাগাদি করে থাকে শ্রমিক পরিবার৷ কোনো কোনো পরিবারে ৮ থেকে ১০ জন সদস্য৷
যে আয়ে সংসারই চলে না, সন্তানদের লেখাপড়া শেখাবেন কী! কোনো কোনো বাগানে প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে৷ অনেকগুলোরই ছাদ আছে তো, দেয়াল নেই৷ প্রয়োজনের তুলনায় শিক্ষকও অনেক কম৷ বেশির ভাগ বাগানে শ্রমিকের চিকিৎসার সুব্যবস্থাও নেই৷ জটিল রোগের চিকিৎসা তো দূরের কথা, সর্দি-জ্বারের চিকিৎসাও সময়মতো পাওয়া মুশকিল৷ হাসপাতালের বারান্দায় বসে ডাক্তারের অপেক্ষায় প্রহর গুণতে গুণতেই বেলা বয়ে যায়৷ চিকিৎসা তো পরের ব্যাপার । চা বাগানের মজুরিতে সংসার চলে না বলে বাড়তি উপার্জনের জন্য শ্রমিকদের অবসর সময়েও কিছু না কিছু করতে হয়৷ ঘরে তৈরি বিভিন্ন পণ্য বাজারে বিক্রি করেও দ্রব্যমূ্ল্যের ঊর্ধগতির সময়ে টিকে থাকার প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে অনেকেই । দেড়শ বছরেরও বেশি সময় ধরে চা-বাগান সংলগ্ন জমিকেই নিজের জমি মনে করে সেখানে বংশ পরম্পরায় চাষবাষ করে আসছে শ্রমিক৷ সেই জমিও তারা নিজেদের দাবি করতে পারছে না । চা শ্রমিকদের ১২০ টাকা মজুরির মধ্যেও ফাঁক আছে। কমপক্ষে ২০ কেজি চা পাতা তুলতে পারলে ১২০ টাকা মজুরি দেয়া হয়। এর কম হলে প্রতি কেজিতে ছয় টাকা করে কেটে নেয়া হয়। কিন্তু যদি ২০ কেজির বেশি হয় তাহলে প্রতি কেজিতে মাত্র দুই টাকা বেশি দেয়া হয়।”
শ্রমিকেরা যদি চা বাগানের জমিতে ফসল বা শাক সবজির চাষ করেন তাহলে তাদের আবার রেশন দেয়া হয় না। চিকিৎসা বলতে স্বাস্থ্য কেন্দ্র থেকে যেকোনো রোগে প্যারাসিটামল ট্যাবলেট ছাড়া আর কিছু দেয়া হয়না । চা শ্রমিকদের সন্তানরা যেন চা শ্রমিক হওয়ার জন্যই বড় হয়। তাদের জীবনে আর কোনো স্বপ্ন দেখার সুযোগ নেই। যদি একজনকে পড়াশুনা করাতে হয় তাহলে অন্য সন্তানদের আর পড়ালেখা করানো যায় না । ১২০ টাকা মজুরিতে পেটই চলে না, পড়াবে কীভাবে? মজুরি অনেক কম হওয়ায় চা শ্রমিকদের বলতে গেলে সবাইই ঋণগ্রস্ত। তারা বিভিন্ন এনজিও থেকে ঋণ নেন। প্রতি সপ্তাহেই ঋণের কিস্তি শোধ করতে হয়। ফলে তাদের মজুরির টাকাও ঘরে নিতে পারেন না। চা বাগানগুলোতে স্থায়ী শ্রমিক আছে এক লাখ। আর অস্থায়ী আছে ৫০ হাজার। তাদের ওপর নির্ভরশীল মানুষের সংখ্যা প্রায় আট লাখ।
চা শ্রমিকদের এখন মূল দাবি হলো মজুরি দিনে ১২০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩০০ টাকা করতে হবে। বাংলাদেশ বিশ্বের তিন শতাংশ চা উৎপাদন করে। ২০২১ সালের তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশি চায়ের বাজারের মূল্য প্রায় ৩ হাজার পাঁচশ’ কোটি টাকা। জিডিপিতে এই শিল্পের অবদান প্রায় ১ শতাংশ। সবুজ বনানীর আড়ালে চা শ্রমিকদের ধূসর জীবনের অবসান হবে কবে ? কবে পাবে শ্রমের ন্যায্য মজুরি । চা শ্রমিকদের মানবেতর জীবনে আলোর রেখা ফুটে উঠুক । চা শ্রমিকদের যৌক্তিক দাবি পূরণ হোক ।
লেখক : কবি ও প্রাবন্ধিক, সুনামগঞ্জ।
০১৭১৬৭৩৮৬৮৮ ।


