প্রাচীনতম ধর্মীয় মারকাজ হাইমচর কাটাখালি জামে মসজিদ

ছবি: ফোকাস মোহনা.কম।

চাঁদপুর: চাঁদপুর জেলার প্রাচীনতম ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানরে মধ্যে অন্যতম হাইমচর উপজেলার কাটাখালি জামে মসজিদ। বর্তমানে কাটাখালি কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ নামে পরিচিত। ১৯০৩ সালে প্রতিষ্ঠিত এই মসজিদ এখন স্থানীয়দের কাছে ইবাদতের মারকাজ। দেশের দক্ষিণাঞ্চলে মোগল আমলে তৈরী মসজিদগুলোর আদলে শ্বৈল্পিকতায় তৈরী হয়েছে এই মসজিদ। স্থানীয়দের দান-অনুদানেই চলছে মসজিদের নিয়মিত ব্যয়। সংস্কার হলে মসজিদটি সৌন্দর্য্য আরো বিকশিত হবে অভিমত মুসল্লীদের। নিয়্যাত-মানতের জন্য অনেকেই আসেন এই মসজিদে।

সম্প্রতি সরেজমিন ওই এলাকায় গিয়ে মসজিদ পরিচালনা কমিটির সদস্য, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও মুসল্লীদের সাথে কথা বলে এসব তথ্য জানাগেছে।

খোঁজ নিয়ে জানাগেছে, মসজিদ এরিয়ায় মোট জমির পরিমান ৩৩ শতাংশ। তিন গুম্বজ বিশিষ্ট মসজিদটির দেয়ালের পুরুত্ব ৩বর্গফুট। মূল মসজিদের দৈর্ঘ্য ৫০ফুট এবং প্রস্থ ৩০ফুট। মসজিদের অভ্যন্তরে তিনটি গুম্বজ বরবার নীচে খুবই চমৎকার শ্বৈল্পিকতায় আকাঁ রয়েছে ১২টি নক্সা। মূল ভবনে কোন ফিলার নেই এবং বারান্দায় রয়েছে ২৪টি ফিলার। নির্মাণ সামগ্রী হিসেবে ব্যবহার হয়েছে চুন-সুরকি। মুসল্লীদের প্রবেশের জন্য দরজা রয়েছে পাঁচটি। ঝুলন্ত বিম দুটি। মেহরাব বড় একটি এবং ছোট তিনটি। কোরআন শরীফসহ ধর্মীয় কিতাব রাখার জন্য বক্স আছে একটি। মসজিদের উপরে বড় গুম্বজ একটি এবং দুই পাশে ছোট দুটি।

হাইমচর উপজেলা মূলত মেঘনা উপকূলীয় অঞ্চল। নদী ভাঙনের শিকার এসব লোকজন বারবার বসতি পরিবর্তন করতে হয়। অনেক বাসিন্দা এই মসজিদের অনেক দূরে বসতি থাকলেও মেঘনার ভাঙনে সব বিলীন হওয়ার পর মসজিদের আশপাশে বসতি গড়ে তুলেছে।

পাশের গাজীপুর এলাকার বাসিন্দা আব্দুর রশিদ মুন্সি (৭৬)। নদী ভাঙনের পর মসজিদের পশ্চিমে পরিবার নিয়ে বসতি করে আছেন। তিনি ফোকাস মোহনাকে বলেন, আমার জন্মের পরে এই মসজিদ দেখে আসছি। বিগত প্রায় আড়াই দশক এই মসজিদের মুসল্লি। আমি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের পাশাপাশি প্রতি জুমআর নামাজ আদায় করি। অনেক সময় মসজিদে জায়গা পাওয়া যায় না, কারণ অনেক মুসল্লী হয়। অনেক দূর থেকে মানুষ এসে এই মসজিদে নামাজ আদায় করেন।

স্থানীয় আরেক মুসল্লী আলী আহম্মদ গাজী ফোকাস মোহনাকে বলেন, এক সময় মসজিদের পশ্চিমে অনেক বসতি ছিলো। নদী ভাঙার কারণে মুসল্লী কিছুটা কমেছে। ছোট বেলায় দেখেছি মূল মসজিদের অবকাঠামো ছিলো স্বল্প পরিসরে। এরপর যারাই এই মসজিদের খেদমতে ছিলেন, তারা মসজিদ সংস্কার করেছেন এবং মুসল্লী বেড়ে যাওয়ায় মসজিদের আকারও বৃদ্ধি পেয়েছে। এখন প্রতি জুমআর নামাজের দিন প্রায় ৬শ’ থেকে ৭শ’ মুসল্লী হয়। এছাড়ও এই মসজিদটির সৌন্দর্য্য দেখার জন্য অনেক স্থান থেকে এখনো লোকজন আসেন।

ছবি: ফোকস মোহনা.কম।

স্থানীয় সাবেক ইউপি সদস্য হাসান তপাদার ফোকাস মোহনাকে বলেন, ছোট বেলা থেকেই মসজিদটি দেখে আসছি। আমাদের পূর্বপুরুষরাই এই মসজিদে প্রথমে ৭ শতাংশ জমি দান করে এবং পরবর্তীতে প্রয়োজনীয়তা দেখা দিলে আরো সম্পত্তি দান করেন। এর মধ্যে একজন জমিদাতা হলেন আব্দুর রহমান। বর্তমানে মসজিদ এরিয়া প্রায় ৩৩শতাংশের মধ্যে।

তিনি আরো বলেন, মসজিদ পরিচালনা কমিটির সভাপতি সিরাজুল ইসলামের তত্ত্বাবধানে গত কয়েকবছর ধরে বারান্দাসহ মসজিদের অংশ বাড়ানো হয়। যারাই এই মসজিদ পরিচালনা কমিটিতে ছিলেন প্রত্যেকেই আন্তরিক হয়ে কাজ করেছেন।

হাসান তপদার আরো বলেন, মসজিদের খুবই নিকটে মেঘনা নদী। প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় মসজিদের দক্ষিণ পশ্চিমে কিছু অংশ ভেঙে নদীগর্বে বিলীন হয়েছে। ভাঙন প্রতিরোধেও সরকারের দৃষ্টিত দিতে হবে।

মসজিদের ইমাম ও খতিব মাওলানা খলিলুর রহমান ফোকাস মোহনাকে বলেন, তিনি দুই বছরের অধিক সময় মসজিদের খেদমতে আছেন। অনেক দুর দূরান্ত থেকে এই মসজিদে লোকজন নামাজ পড়তে আসে। জুমাআর দিন ছাড়াও নিয়মিত জামায়াতে প্রায় ২০০ মুসল্লী নামাজ আদায় করে। মসজিদের স্বাপত্য শ্বৈলী দেখার জন্য বিভিন্ন এলাকা থেকে অনেক লোকজন আসেন।

মসজিদের কোষাধ্যক্ষ মফিজ উল্লাহ শাহ্ ফোকাস মোহনাকে বলেন, চাঁদপুরের দক্ষিণে কাটাখালি কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের অনেক সুনাম ও সুখ্যাতি রয়েছে। শুধুমাত্র নামাজ আদায় করার জন্য অনেক লোক চাঁদপুর জেলার বাহির থেকেও আসেন। আমার দেখামতে শুধুমাত্র মুসলমানই নয়, অন্য ধর্মের লোকজনও মসজিদে দান করে।

তিনি বলেন, আমাদের মসজিদটির মূল ভবন এমন ভাবে তৈরী, যেখানে শুধুমাত্র চুন-সুরকী ব্যবহার হয়েছে। ইট-সিমেন্ট ও বালুর ব্যবহার হয়নি। যখন বাহিরে প্রচন্ড গরম, তখন মসজিদের ভিতরে নামাজ আদায় করলে খুব শীতল অনুভব হয়।
ফম/এমএমএ/

সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট | ফোকাস মোহনা.কম