বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান একটি বহুল আলোচিত অধ্যায়। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক টানাপোড়েন, আন্দোলন ও সংঘাতের প্রেক্ষাপটে এই আন্দোলন দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। সেই সময়ের ঘটনাপ্রবাহে অনেক রাজনৈতিক কর্মীর ব্যক্তিগত সংগ্রামও সামনে আসে। চাঁদপুরের রফিক মিজি তেমনই একজন, যার রাজনৈতিক জীবন বারবার গ্রেপ্তার, কারাবরণ এবং নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে এগিয়েছে।
চাঁদপুর শহরের প্রফেসরপাড়ায় জন্ম নেওয়া রফিক মিজি ছাত্রজীবন থেকেই জাতীয়তাবাদী রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। চাঁদপুর সরকারি কলেজ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে তার রাজনৈতিক পথচলার শুরু। বর্তমানে তিনি জেলা যুবদলের একজন সক্রিয় নেতা হিসেবে পরিচিত।
রফিক মিজির দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তিনি একাধিক রাজনৈতিক মামলার আসামি হন এবং বিভিন্ন সময়ে গ্রেপ্তার ও কারাবরণের পাশাপাশি শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এক পর্যায়ে তাকে গোপন আটককেন্দ্র বা কথিত ‘আয়নাঘরে’ রাখা হয়েছিল। তিনি অভিযোগ করেন, সেখানে তাকে কঠোর নির্যাতনের মুখোমুখি হতে হয় এবং একসময় তার জীবননাশের আশঙ্কাও তৈরি হয়েছিল। তবে এসব অভিযোগ স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
২০১৩ সালের ২৮ মার্চ সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনির বাসভবনের সামনের সড়কে বোমা হামলার ঘটনায় দায়ের করা একটি মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। রফিক মিজি এই মামলাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করে আসছেন।
২০২৪ সালের জুলাই মাসে কোটা সংস্কার আন্দোলন সারা দেশে ছড়িয়ে পড়লে চাঁদপুরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ১৮ জুলাই সন্ধ্যায় চাঁদপুর সরকারি কলেজ এলাকায় সংঘর্ষের মধ্যে তিনি গ্রেপ্তার হন বলে দাবি করেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, বিপণিবাগ বাজার এলাকা থেকে তাকে আটকের পর পুলিশ আদালতে হাজির করে এবং জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ডের আবেদন করে। আদালত দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। তিনি অভিযোগ করেন, রিমান্ড চলাকালে তাকে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করা হয়।
৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ৬ আগস্ট তিনি আদালতের মাধ্যমে কারামুক্ত হন। কারাগার থেকে বেরিয়ে গণমাধ্যমের সামনে নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের আহ্বান এবং চাঁদপুর জেলা বিএনপির সভাপতি শেখ ফরিদ আহমেদ মানিকের নির্দেশনায় তিনি আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন।

রফিক মিজির ভাষ্য, রংপুরের আবু সাঈদ এবং চট্টগ্রামের ছাত্রদল নেতা ওয়াসিমের মৃত্যুর ঘটনা আমাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে তখন আর ঘরে বসে থাকতে পারিনি। আন্দোলনে অংশ নেওয়াই আমার দায়িত্ব মনে করেছি।
তিনি আরও বলেন, যদি ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তন না ঘটত, তাহলে হয়তো আমি আর কোনোদিন কারাগার থেকে জীবিত বের হতে পারতাম না। সেই কঠিন সময়ে আমার পরিবারকে সাহস জুগিয়েছেন জেলা বিএনপির সভাপতি শেখ ফরিদ আহমেদ মানিক।
রফিক মিজির জীবনগাথা মূলত তার নিজের বক্তব্য ও দাবির ভিত্তিতে আলোচিত। তার সমর্থকদের কাছে তিনি দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংগ্রাম, কারাবরণ এবং প্রতিকূলতার মধ্যেও আদর্শে অবিচল থাকার প্রতীক। অন্যদিকে, তার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলাগুলো এবং তার উত্থাপিত নির্যাতনের অভিযোগগুলো নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কও রয়েছে।
চাঁদপুরের রাজনৈতিক অঙ্গনে রফিক মিজির নাম এখনও আলোচনায় থাকে। সমর্থকদের মতে, ব্যক্তিগত ঝুঁকি, কারাবরণ এবং নানা চাপের মধ্যেও তিনি রাজনৈতিক অবস্থান থেকে সরে আসেননি। তাদের দৃষ্টিতে, তার সংগ্রামের গল্প শুধু একজন রাজনৈতিক কর্মীর নয়; বরং প্রতিকূল সময়ের মধ্যেও বিশ্বাস ও আদর্শ ধরে রাখার এক ব্যক্তিগত ইতিহাস।
ফম/এমএমএ/



