মতলব উত্তর সাব রেজিস্ট্রার অফিসে ‘অনিয়মেই নিয়ম’!

খাস কামরায় প্রকাশ্যে চলে অতিরিক্ত টাকা আদায়

মতলব উত্তর সাব রেজিস্টার অফিস। ইনসেটে খাস কামরায় প্রকাশ্যে টাকা আদায়কারী কর্মচারী খায়ের। ছবি: ফোকাস মোহনা.কম।

চাঁদপুর: চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে সেবা নিতে এসে পদে পদে ভোগান্তি ও হয়রানির শিকার হওয়ার অভিযোগ করেছেন সেবাগ্রহীতারা। দলিল নিবন্ধন থেকে শুরু করে নকল উত্তোলন ও আঙুলের ছাপ নেওয়াসহ বিভিন্ন কাজে সরকারি ফির বাইরে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এমনকি সাব-রেজিস্ট্রারের খাস কামরায় প্রকাশ্যেই অতিরিক্ত টাকা লেনদেনের চিত্র দেখা গেছে।

রোববার (৪ অক্টোবর) বেলা ১১টা থেকে দুপুর দেড়টা পর্যন্ত মতলব উত্তর উপজেলার মোহনপুর এলাকায় অবস্থিত সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে সরেজমিন ঘুরে সেবাগ্রহীতা, দলিল লেখক ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এসব অভিযোগের তথ্য পাওয়া যায়।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মতলব উত্তর উপজেলায় ১৫টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা রয়েছে। তিন লাখের বেশি মানুষের এই উপজেলায় জমি ক্রয়-বিক্রয় ও নিবন্ধনসংক্রান্ত কাজে নিয়মিত এই কার্যালয়ে আসেন সেবাগ্রহীতারা। অফিসটিতে ৮৪ জন দলিল লেখক রয়েছেন। তবে সাব-রেজিস্ট্রার কচুয়া উপজেলায় দায়িত্ব পালন করায় অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে সপ্তাহে মাত্র দুইদিন মতলব উত্তরে দলিল নিবন্ধনের কাজ করেন। ফলে সপ্তাহের প্রথম দুইদিন কার্যালয়ে সেবাগ্রহীতাদের চাপ থাকে বেশি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এই কার্যালয়ে প্রতি মাসে প্রায় এক হাজার দলিল সাব-কবলা ও অন্যান্য নিবন্ধনসংক্রান্ত কাজ সম্পন্ন হয়। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সকাল থেকেই কার্যালয়ের ভেতর-বাইরে সেবাগ্রহীতাদের দীর্ঘ সারি। কেউ দলিল নিবন্ধনের জন্য অপেক্ষা করছেন, কেউ নকল তুলতে আবার কেউ আঙুলের ছাপ দিতে লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন।

মোফাজ্জল নামে এক সেবাগ্রহীতা জমি বিক্রির কাজে কার্যালয়ে আসেন। তিনি অভিযোগ করেন, আঙুলের ছাপ নেওয়ার পর জনপ্রতি ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে। অথচ সাব-রেজিস্ট্রারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এ ক্ষেত্রে সরকারি নির্ধারিত ফি ১৮৪ টাকা।

এই অভিযোগের সূত্র ধরে কার্যালয়ের এক কর্মচারীর অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার দৃশ্যও ধারণ করা হয়। খায়ের নামে ওই কর্মচারীকে সাব-রেজিস্ট্রারের খাস কামরায় বসে সরকারি নির্ধারিত টাকার পাশাপাশি অতিরিক্ত অর্থ নিতে দেখা যায়। বিষয়টি টের পাওয়ার পর তিনি ওই কাজ রেখে অন্য কক্ষে চলে যান। কিছুক্ষণ পর আবার ফিরে এলেও গণমাধ্যমকর্মীদের উপস্থিতি টের পেয়ে কাজ বন্ধ করে বসে থাকেন।

এদিকে সাব-রেজিস্ট্রারের খাস কামরার পাশের দেয়ালে আঙুলের ছাপের অসংখ্য চিহ্ন দেখা যায়। দীর্ঘদিন ধরে আঙুলের ছাপ নেওয়ার কারণে দেয়ালে এসব চিহ্ন জমে এক ধরনের দাগের সৃষ্টি হয়েছে।

সরেজমিনে অনিয়মের এসব চিত্র সামনে আসার পর কার্যালয়ের সংশ্লিষ্টদের মধ্যে তৎপরতা দেখা যায়। এ সময় একজন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি গণমাধ্যমকর্মীদের ‘মেহমান’ আখ্যা দিয়ে বলেন, তাদের বিষয়টি খায়ের ‘দেখবেন’। পরে খায়েরের সঙ্গে কথা হলে দপ্তর প্রধানের সঙ্গে সাক্ষাতের কথা জানানো হয়।

কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর মতলব উত্তর উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রার মাহবুবের রহমান ওয়াজেদ তার কক্ষে গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে কথা বলেন। এ সময় কার্যালয়ের বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ তার কাছে তুলে ধরা হলে তিনি কর্মচারীদের ভুলত্রুটি থাকার বিষয়টি স্বীকার করেন। পাশাপাশি খাস কামরায় সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা আদায়ের অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের সতর্ক করেন।

কার্যালয়ের বাইরে কথা হয় আরও কয়েকজন সেবাগ্রহীতার সঙ্গে। তাদের অভিযোগও প্রায় একই ধরনের। দলিলের নকল উত্তোলন, পৌর এলাকার দলিলসহ বিভিন্ন সেবায় সরকারি নির্ধারিত ফির বাইরে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তারা। তবে অতিরিক্ত অর্থ কোন খাতে নেওয়া হচ্ছে, তা অনেক সেবাগ্রহীতাই স্পষ্টভাবে জানেন না।

একজন জমি গ্রহীতা অভিযোগ করেন, পৌরসভা এলাকার দলিল সম্পাদনের সময় নির্ধারিত রাজস্বের বাইরে অতিরিক্ত টাকা নেওয়া হচ্ছে। তার ভাষ্য, সাধারণ মানুষ সরকারি ফি ও অতিরিক্ত আদায়ের পার্থক্য বুঝতে না পারায় অনেক সময় বাধ্য হয়ে বাড়তি টাকা দিয়ে সেবা নিচ্ছেন।

কার্যালয়ের সামনে অপেক্ষমাণ এক নারী আরও গুরুতর অভিযোগ করেন। তার দাবি, একটি চক্র অন্যের জমি প্রতারণার মাধ্যমে বিক্রির চেষ্টা করে। নিজের সম্পত্তি এভাবে বিক্রির প্রস্তুতির বিষয়টি জানতে পেরে তিনি সাব-রেজিস্ট্রারের কাছে অভিযোগ করে তা বন্ধ করেছেন। তবে এরপরও ওই চক্র গোপনে আবার দলিল করে নিতে পারে-এমন আশঙ্কায় তিনি উদ্বিগ্ন।

এসব অভিযোগের বিষয়ে মতলব উত্তর উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রার মাহবুবের রহমান ওয়াজেদ বলেন, ‘আপনারা যেসব তথ্য-প্রমাণ পেয়েছেন, এ ধরনের বিষয়ে আমাদের কর্মচারীদের ভুলত্রুটি থাকতে পারে। তবে আপনারাও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করবেন অবশ্যই।’

তিনি আরও বলেন, বাইরে যদি কোনো অনিয়ম হয়ে থাকে, প্রমাণসহ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া যাবে। আবার আমাদের কথা বলেও কেউ অতিরিক্ত অর্থ আদায় করতে পারে। এসব বিষয় আমাদের অজানা। তবে এখন থেকে আমি কার্যালয়ের লোকজনকে সতর্ক করে দেব এবং নিয়মিত সতর্ক করি।

এই কর্মকর্তাকে প্রশ্ন করা হয়, আপনার খাস কামরায় কিভাবে আঙ্গুলের চাপ নিয়ে অতিরিক্ত টাকা আদায় হয়। এইভাবে প্রকাশ্যে টাকা নেয়ার বিধান আছে কীনা। এমন প্রশ্নের জবাবে এলোমেলো বললেও শেষ পর্যন্ত তিনি স্বীকার করেন প্রকাশ্যে খাস কামরায় টাকা নেয়ার নিয়ম নেই।

তবে সেবাগ্রহীতাদের অভিযোগ, নিয়মিত সতর্ক করার পরও যদি সরকারি ফির বাইরে অতিরিক্ত অর্থ আদায় ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য চলতে থাকে, তাহলে সাধারণ মানুষ সরকারি সেবা নিতে গিয়ে হয়রানি ও বাড়তি খরচের শিকার হতেই থাকবেন।

ফম/এমএমএ/

সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট | ফোকাস মোহনা.কম