
চাঁদপুর: চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলার ৮নম্বর পাইকপাড়া ইউনিয়নের সাহাপুর গ্রামের পাটওয়ারী (হুনার বাড়ি) বাড়িতে আপন দুই ভায়ের মধ্যে সম্পত্তি নিয়ে দীর্ঘদিন বিরোধ সৃষ্টি করে রেখেছে স্থানীয় একটি সংঘবদ্ধ চক্র। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ওই এলাকার ফরিদুজ্জামান বাঁধন। যে কারণে দুই ভাইয়ের মধ্যে বিরোধের সমাধান না হয়ে ঘটনা জটিল হচ্ছে। তবে দুই ভাইয়ের মধ্যে বড় ভাই কাশেম পাটওয়ারী নিজ সম্পত্তি রক্ষণা-বেক্ষণের জন্য তার দিয়ে সীমানা প্রাচীর দিতে গিয়ে নতুন করে বিরোধের সৃষ্টি হয়েছে।
বুধবার (২২ জুলাই) সরেজিমন ঘটনাস্থলে গিয়ে উভয় পক্ষের সাথে কথা বলে এসব তথ্য জানাগেছে। স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান শেখ হোসেন আহম্মদ রাজন এসব বিষয়ে অবগত আছেন।
বিরোধ সম্পত্তি নিয়ে অংশীজনদের সাথে কথা বলে জানাগেছে, কাশেম পাটওয়ারী এবং আমিন উল্যা পাটওয়ারী আপন ভাই। তাদের এক বোন আছে। পৈত্রিক সম্পত্তি হিসেবে তারা এক ভাই ২০ শতাংশ করে এবং বোন ১০ শতাংশ মালিক। এছাড়াও আমিন উল্যা ওই বাড়ির এসহাক পাটওয়ারী থেকে ৭শতাংশ জমি ক্রয় করেন। বাড়ির মধ্যে তিনি ২৭শতাংশ জমির মালিক হলেও তার বড় ভাইয়ের কাছে বিক্রি করেছেন ৩০শতাংশ। বাকি ৩শতংশ সরকারি খাস খতিয়ানভুক্ত খাল।
সম্প্রতি আমিন উল্যা পাটওয়ারীর ঘরের পশ্চিম পাশে সীমানা প্রাচীর দেয় বড় ভাইয়ের সন্তানরা। তবে বসতঘরের বাকি তিনদিক খোলা রয়েছে। এই নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে বলে বড় ভাই কাশেম পাটওয়ারীর পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ রয়েছে।
মূলত তাদের এই দুই ভাইয়ের মধ্যে দীর্ঘদিন বিরোধ সৃষ্টি করে আসছে পাশবর্তী ৭নং ইউনিয়নের সাচিয়াখাল গ্রামের মৃত আবু বকর ছিদ্দিক খোকনের ছেলে ফরিদুজ্জামান বাঁধন। তিনি নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের নেতা। কিন্ত স্থানীয় বিপরীত রাজনীতির লোকদের সাথে সখ্যতা তৈরি করে দরবার শালিশ করে আসছে। বাঁধন আমিন উল্যা পাটওয়ারীর পক্ষ নিয়ে তাকে ভুলবুঝিয়ে বিরোধকে দীর্ঘায়িত করছেন।
কাশেম পাটওয়ারীর বাগিনা বিল্লাল বলেন, আমি ছোট বেলা থেকে এই বাড়িতে আসা-যাওয়া। বড় মামার সম্পত্তি রক্ষণা বেক্ষণে কাজ করি। এই কাজ করতে গিয়ে আমি বাঁধনের হুমকি ধমকিতে পড়েছি। সে আমাকে মারধর করার হুমকি দেয়।
ঘটনা সম্পর্কে কাশেম পাটওয়ারীর প্রবাসী ছেলে মো. জসিম উদ্দিন পাটওয়ারী বলেন, আমরা ৪ ভাই প্রবাসে থাকি। বাড়িতে থাকে আমার বয়স্ক পিতা-মাতা। আমাদের চাচা আমিন উল্যা পাটওয়ারী আমাদের কাছে ৩০শতাংশ সম্পত্তি বিক্রি করেছেন। ওই সম্পত্তিতে আমরা দখলে গেলে তিনি জামেলা সৃষ্টি করেন। আমার-বাবা মাকে বেশ কয়েকবার মারধর করেছেন। এসব নিয়ে গত ৫ বছর বহুবার শালিশ বৈঠক হয়েছে। ওইসব বৈঠকে চূড়ান্তভাবে আমার চাচার সম্পত্তি খুবই কম বুঝতে পারলে তিনি আর মিমাংসায় আসেন না। নানাভাবে আমরা চাচার সাথে বিরোধ মিমাংসায় আসাতে চাইলেও তিনি সংঘবদ্ধ চক্রের সাথে হাত মিলান। বিশেষ করে বাড়ির হাসেম পাটওয়ারী, ছাত্রলীগ নেতা ফরিদুজ্জামান বাঁধন তাদেরকে কুপরামর্শ দেয়। এখন আবার চেয়ারম্যানও বাঁধনের পরামর্শ শুনেন।
জসিম আরো বলেন, তারা আমাদের বিরুদ্ধে বিএস খতিয়ানের মামলা করেছে। আমাদের পর্যাপ্ত কাগজপত্র থাকায় ওই মামলায় আদালত তাদের বিরুদ্ধে উল্টো নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। বর্তমানে ১ শতাংশ জমি নিয়ে মামলা চলমান। আমাদের বাকি সম্পত্তি নিয়ে কোন সমস্যা নেই। আমাদের আইনজীবীর সাথে আলাপ করে আমরা আমাদের বাকি সম্পত্তি রক্ষণা বেক্ষণ শুরু করেছি। এই বিষয়টি এখন তারা অপপ্রচার করছে। মিথ্যা ঘটনা সাজানোর অপচেষ্টায় লীপ্ত রয়েছে।
জসিম বলেন, সর্বশেষ সালিশ বৈঠকের সিদ্ধান্ত ছিলো চাচা শুধুমাত্র তার যে বসতঘর আছে সেটাতে থাকবে। বাকি আর কোন সম্পত্তি ভোগ দখল করতে পারবে না। কিন্তু তিনি এসব মানেন না। আমাদের সম্পত্তি দখল করে ঘর তুলতে যান। নানাভাবে হয়রানি করেন। তার হয়রানির কারণে আমরা বড় ধরণের আর্থিক ক্ষতির সম্মুখিন।
এদিকে কাশেম পাটওয়ারীর বাড়ির সম্পত্তির বিষয়ে জানান তার মেয়ের জামাতা এনামুল হক। তিনি বলেন, তার শ্বশুর ও শ্বাশুড়ি বাড়িতে ১ একর ৩৫শতাংশ জমির মালিক। এর মধ্যে তিনি (কাশেম পাটওয়ারী) পৈত্রিক সূত্রে শাহাপুর মৌজায় ১৪৯ নং খতিয়ানে ২০শতাংশ, একই খতিয়ান বোন নুরজাহান থেকে ক্রয়কৃত ১০শতাংশ, ভাই আমিন উল্যাহ পাটওয়ারী থেকে ২০শতাংশ, ভাইয়ের ক্রয়কৃত সম্পত্তি থেকে ৭শতাংশ, মান্নান গং থেকে ৯২৫ খতিয়ানে ১০৭৬ দাগে ৫শতাংশ, ১০৭৪ দাগে এসহাক পাটওয়ারী থেকে ৩শতাংশ, সিরাজ পাটওয়ারী থেকে ৪৪৮, ৪৪৬ ও ৪৬৫ দাগে ১০শতাংশ এবং পৈত্রিক সূত্রে এককভাবে ৬৪৩ খতিয়ানের ১০৮৯, ১১০০, ১০০১, ১১০৪ দাগে ২২শতাংশ জমির মালিক। এছাড়া রোকেয়া বেগম ৯৩২ নং খতিয়ানে ১০৭৪ থেকে ১১০৪ পর্যন্ত ৮ দাগে ৩৫শতাংশ জমির মালিক।
কাশেম পাটওয়ারীর স্ত্রী রোকেয়া বেগম বলেন, আমার ছেলেরা প্রবাসে থাকে। গত কয়েকবছর আমিন উল্যা পাটওয়ারী পরিবারের সদস্যরা আমাকে নানাভাবে হুমকি-ধমকি ও মারধর করে আসছে। নিজেদের সম্পত্তির মধ্যে যেতে পারি না।
সীমানা প্রচীর সম্পর্কে আমিন উল্যা পাটওয়ারীকে জিজ্ঞাসা করা হয় কেন এই সামীনা দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, আমি কিছুই জানিনা। এটা আমার ভাই জানে। তবে তিনি এসব বিষয়ে তার ভাই এবং ভাতিজারদের কাছে জাননি এবং তাদের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ নেই বলে জানান।
ওই বাড়ির কর্তা ব্যাক্তি হাসেম পাটওয়ারীর কাছে যাওয়া হয় বিগত দিনে সালিশ বৈঠক সম্পর্কে জানার জন্য। তিনি বলেন, আমি সর্বশেষ বৈঠকে ছিলাম না। তাদের কারো বিষয়ে কথা বলতে চাই না, কারণ কথা বললে কোন পক্ষ হিসেবে আমাকে চিহ্নিত করা হবে। তারা আপন লোক। নিজেরেই সমাধানে যেতে পারে।
স্থানীয় ইউপি সদস্য ও শালিশ বৈঠকে উপস্থিত থাকা উজ্জল বলেন, আমার জানামতে বড় ভাই কাশেম পাটওয়ারী ছোট ভাই আমিন উল্যা থেকে সম্পত্তি পাবেন।
চেয়ারম্যান শেখ হোসেন আহম্মদ রাজন বলেন, গত প্রায় ৩ বছর পূর্বে আমিন উল্যা পরিষদে অভিযোগ করেন বড় ভাইয়ের বিরুদ্ধে। তখন উভয় পক্ষকে ডাকানো হয়। তবে বৈঠক হয় পরিষদের বাহিরে। সেখানে উভয়পক্ষের কাগজপত্র কমতি থাকায় সময় নেয়া হয়। এরপর আর তারা কোন পক্ষ আমার সাথে যোগাযোগ রাখেননি। সম্প্রতি কাটা তার দিয়ে সীমানা প্রাচীরের বিষয়টি নজরে আসলে আমি বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অবগত করি। তিনি আমাকের দায়িত্ব দেন দুই পক্ষের সাথে কথা বলার জন্য। আমি ইউপি সদস্যদের নিয়ে মঙ্গলবার (২১ জুলাই) বিকেলে ওই বাড়িতে গিয়েছি এবং তাদের বড় ভাই কাশেম পাটওয়ারী পরিবারকে মানবিক দিক বিবেচনা করে সীমানা প্রাচীর সরিয়ে দিতে বলেছি। আর তাদেরকে বলেছি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সাথে দেখা করার জন্য।
চক্রের সদস্য ফরিদুজ্জামান বাঁধনের বিষয়গুলো অবগত করা হয় চেয়ারম্যানকে। তিনি বলেন, এই নামে একজন আমার পরিচিত। তবে আমার অনপুস্থিতিতে কে কী করে এসব বিষয়ে জানিনা।
ফম/এমএমএ/



