হাজীগঞ্জে মালিকানা জমিতে ইজারা নিয়ে পাইকারী মাছের বাজার বন্ধ, হয়রানির শিকার ব্যবসায়ীরা

চাঁদপুর : সরকারি বিধি মেনে মালিকানা জমিতে দীর্ঘ বছর পাইকারী মাছের ব্যবসা করে আসছে চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ উপজেলার দেররা বাজারের ব্যবসায়ীরা। কিন্তু একটি সংঘবদ্ধ চক্র ঐতিহ্যবাহী এই বাজারের বাণিজ্যিক কার্যক্রম ধ্বংস করার জন্য উঠে পড়ে লেগেছে। তারা পৌরসভা থেকে ইজারা আনার নামে ব্যবসায়ীদের চরম হয়রানি ও নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। পৌরসভার অধিগ্রহণভুক্ত কিংবা মালিকানা ছাড়া কোন বাজার ইজারা দেয়ার বিধি নেই বিষয়টি উল্লেখ করে উচ্চ আদালতে রীট করেছেন জমির মালিক ও এক ব্যবসায়ী। ইজারাদার ও ব্যবসায়ীদের বিরোধে বর্তমানে বন্ধ রয়েছে আড়তগুলোর কেনাবেচা। বেকার হয়ে পড়েছে এর সাথে জড়িত কয়েক শতাধিক শ্রমিক ও ব্যবসায়ী।

সরেজমিন ঘুরে, ব্যবসায়ী সমিতির নেতা ও ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের কথা বলে এসব তথ্য জানাগেছে।

স্থানীয়রা জানান, ধেররা মাছের আড়তটি গত কয়েক বছর ধরে বৃহত্তর কুমিল্লা-চাঁদপুরের মধ্যে পাইকারী মাছের বাজার হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছে। ভোরের ১ ঘন্টার বাজারে কোটি টাকার লেনদেন হয় বাজারটিতে। এতে ছোট-বড় প্রায় দেড় শতাধিক মাছের পাইকারী ব্যবসায়ী জড়িত। এর সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কর্মসংস্থানে জড়িত রয়েছে কয়েক শতাধিক লোক।

দেররা গ্রামের নুরুল ইসলামের ছেলে সাখাওয়াত হোসেন এই মাছ বাজারে জমির মালিক ও ব্যবসায়ী। তিনি বলেন, আমরা ব্যাক্তিরাই এই বাজারের জমির মালিক এবং পৌরসভার ট্রেড লাইসেন্সধারী। প্রত্যেক ব্যবসায়ী ব্যাক্তিগতভাবে সরকারকে ট্রেক্স দেয়। কিন্তু ২০২৩ সাল থেকে এই বাজার পৌরসভা ইজারা দেয়ার চেষ্টা করছে। ইজারা দেয়ার ইখতিয়ার নেই পৌরসভার। যে কারণে আমি নিজে উচ্চ আদালতে এসব বিষয় উল্লেখ করে রীট করেছি।

তিনি আরো বলেন, আবেদনের প্রেক্ষিতে উচ্চ আদালতে রীটের শুনানি হয়। এতে বলা হয়, আবেদনকারী হাজীগঞ্জ পৌরসভার মধ্যে অবস্থিত জমির মালিক। পৌরসভা তাদের জমি অধিগ্রহণ না করে তাদের সম্পত্তি লিজ দেয়ার চেষ্টা করছে। যা সংবিধান প্রদত্ত তাদের মৌলিক অধিকারের সুষ্পষ্ট লঙ্ঘন। যার ফলে উচ্চ আদালত মালিকানাধীন প্রশ্নে জমি লিজ আউট করার আবেদন ধারা নিষেধ করা হয়েছে। এই বিষয়ে উচ্চ আদালত থেকে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সচিব, জেলা প্রশাসক, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌরসভাকে অবহিত করা হয়েছে।

এদিকে সম্প্রতি নতুন বাংলা সনে এই বাজার আবারও ইজারা নিয়েছেন হাসান বসির রানা এক ব্যাক্তি। তিনি চলমান এই বাজারে খাজনা নিতে এসে শুরু করেন নানা হয়রানি। ব্যবাসয়ীদের মারধর ও মামলা করে জুলুম-নির্যাতন শুরু করেছেন। তিনি নিজে না এসে উপজেলার বিভিন্ন স্থান থেকে লোক পাঠিয়ে ব্যবসায়ীদের হুমকি-ধমকি দিচ্ছেন।

আদর্শ মৎস্য আড়তের মালিক শাহজালাল বলেন, এই মাছ বাজারে ২৭ জন ব্যবসায়ী আছে। ব্যবসায়ীদের সমিতিও রয়েছে। ব্যবসায়ী ও সমিতির সিদ্ধান্ত ছাড়া কোন কিছু হয় না। আমরা কখনোই খাজনা দিয়ে অবৈধ ইজারাদারকে বৈধতা দিব না।

দেররা মৎস্য আড়ৎ ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি রাধা কান্তি রাজু বলেন, ইজারাদার ও ব্যবসায়ীদের বিরোধের মধ্যে উপজেলা পরিষদ পক্ষ থেকে উদ্যোগ নিয়ে আমাদের ৫জন ব্যবসায়ীকে গত ১৯ এপ্রিল এক সভায় ডেকে নেয়া হয়। সেখানে তাদের উপস্থিতির স্বাক্ষর রাখা হয়। পরবর্তীতে জানতে পারি ওই সভায় রেজুলেশনে বাজার সম্পর্কে কয়েকটি শর্ত জুড়ে দেয়া হয়েছে। বিষয়টি মূলত স্বাক্ষর রেখে বড় ধরণের জালিয়াতি। আমরা আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। আশা করি ব্যাক্তি মালিকানা এই জমি পৌরসভা ইজারা বাতিল করে সুষ্ঠু সমাধান দিবে। যাতে করে ঐতিহ্যবাহী এই মাছ বাজারের বাণিজ্যিক কার্যক্রম চলমান থাকে।

এদিকে গত ১ বৈশাখ পৌরসভা থেকে প্রাপ্ত ইজারাকৃত ব্যক্তির পক্ষে খাজনা আদায়ে লোকজন ধেররা বাজারে গেলে দুই পক্ষের মাঝে ধাওয়া পাল্টা ও হামলার ঘটনায় উভয় পক্ষের একাধিক ব্যক্তি আহত হন। এ ঘটনায় ইজারাদারের পক্ষে থানায় অভিযোগ দিলে ভয়ে ব্যবসা বন্ধ করে আড়তদাররা এলাকা ছাড়েন। এর পর থেকে ধেররা মাছের আড়তের কার্যক্রম বরাবর বন্ধ রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ধেররা মাছ বাজারের সমস্যা সমাধান করে অবিলম্বে বাজারের কর্মচাঞ্চল্য ফেরাতে মালিক ও ব্যবসায়ীরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে ১৮ এপ্রিল মানববন্ধন করে।

চাঁদপুরের জেলা প্রশাসক (ডিসি) আহমেদ জিয়াউর রহমানকে বিষয়টি অবগত করা হয়। তিনি বলেন, ব্যাক্তি মালিকানা জমিতে ব্যবসা করতে পারবে। কিন্তু কেউ যদি ওই জমিতে বাজার বসায়, তাহলে ইজারা হবে এবং খাজনা দিতে হবে।

হয়/এমএমএ/

ফোকাস মোহনা.কম