।। জুবাইয়া বিন্তে কবির।। ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন এক অবিস্মরণীয় দিন, যার তাৎপর্য কেবল একটি রাজনৈতিক পটপরিবর্তন কিংবা ক্ষমতার পালাবদলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি ছিল স্বাধীনতাপরবর্তী বাংলাদেশের চরম রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা এবং জাতীয় অস্তিত্বের সংকটকালে এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ। সেদিন সিপাহী ও জনতার সম্মিলিত অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বন্দিদশা থেকে মুক্ত হন মহান স্বাধীনতার ঘোষক, বীর মুক্তিযোদ্ধা, বীর উত্তম শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান।
তাঁর প্রতি সেনাবাহিনীর সাধারণ সদস্যদের সমর্থন এবং জনগণের ভালোবাসা তাঁকে জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসে। আমি একজন বিএনপি পরিবারের সন্তান হিসেবে এই দিনটির ইতিহাস, আবেগ ও তাৎপর্যকে কেবল রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের অংশ হিসেবে নয়, বরং বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, জাতীয় আত্মপরিচয় ও গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত একটি ঐতিহাসিক অধ্যায় হিসেবে দেখি। আমাদের পারিবারিক রাজনৈতিক চেতনায় শহীদ জিয়া শুধু একজন রাষ্ট্রনায়ক নন, তিনি দেশপ্রেম, সাহস, আত্মমর্যাদা ও আত্মনির্ভরশীলতার এক অনন্য প্রতীক। তাঁর জীবন ও কর্মের দিকে তাকালে উপলব্ধি করা যায়, ইতিহাসের কোনো কোনো মানুষ নিজের কর্মের মধ্য দিয়েই সময়কে অতিক্রম করে জাতির হৃদয়ে স্থায়ী আসন করে নেন।
৭ নভেম্বরের ঐতিহাসিক পটভূমি বুঝতে হলে ফিরে যেতে হয় ১৯৭৫ সালের অস্থির দিনগুলোতে। ১৫ আগস্টের মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের পর রাষ্ট্রক্ষমতা ও সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে শুরু হয় নানা টানাপোড়েন। ৩ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে সংঘটিত সামরিক অভ্যুত্থানে তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান গৃহবন্দি হন। একই সময় ৩ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করা হয়, যা জাতির ইতিহাসে আরেকটি গভীর ক্ষত। একের পর এক অভ্যুত্থান, পাল্টা অভ্যুত্থান, নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব ও অনিশ্চয়তায় রাষ্ট্রযন্ত্র কার্যত বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। সেনানিবাসে সাধারণ সৈনিকদের মধ্যে অসন্তোষ ও বিভ্রান্তি ছড়িয়ে পড়ে।
৬ নভেম্বর দিবাগত রাত থেকে ৭ নভেম্বরের প্রত্যুষে সিপাহিদের বিদ্রোহ ও অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে জিয়াউর রহমান মুক্ত হন। এ ঘটনায় বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা ও লে. কর্নেল আবু তাহেরের অনুসারীদের ভূমিকাও ঐতিহাসিক আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ফলে ৭ নভেম্বরকে মূল্যায়ন করতে হলে সেদিনের বহুমাত্রিক ঘটনাপ্রবাহ, বিভিন্ন পক্ষের ভূমিকা এবং পরবর্তী রাজনৈতিক পরিণতি বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। তবে বিএনপির রাজনৈতিক ইতিহাসে দিনটি সিপাহী-জনতার ঐক্য, স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের চেতনা এবং শহীদ জিয়ার নেতৃত্বের পুনরুত্থানের প্রতীক।
স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে জিয়াউর রহমানের ঐতিহাসিক ভূমিকা তাঁকে বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ে বিশেষ মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেছে। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে তাঁর স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ মুক্তিযুদ্ধের সূচনালগ্নে বিপর্যস্ত ও দিশাহারা মানুষের মধ্যে সাহস, প্রত্যয় ও প্রতিরোধের প্রেরণা জুগিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে তিনি জেড ফোর্সের অধিনায়ক হিসেবে সম্মুখযুদ্ধে নেতৃত্ব দেন। তাঁর সাহসিকতা ও বীরত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ তাঁকে ‘বীর উত্তম’ খেতাবে ভূষিত করে। একজন পেশাদার সৈনিকের সামরিক শৃঙ্খলা, একজন মুক্তিযোদ্ধার দেশপ্রেম এবং একজন রাষ্ট্রনায়কের দূরদর্শিতা তাঁর ব্যক্তিত্বে এক অনন্য সমন্বয় ঘটিয়েছিল।
৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহে তাঁর মুক্তি তাই শুধু একজন সেনা কর্মকর্তার বন্দিদশার অবসান ছিল না; তা পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। তবে ইতিহাসের প্রতি সুবিচার করতে হলে মনে রাখতে হবে, ৭ নভেম্বরের পরও রাষ্ট্রক্ষমতার রূপান্তর একদিনে সম্পন্ন হয়নি। বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম রাষ্ট্রপতি ছিলেন; পরবর্তী সময়ে শহীদ জিয়াউর রহমান সামরিক আইন প্রশাসনের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন এবং ১৯৭৭ সালে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। ১৯৭৮ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ও ১৯৭৯ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন তাঁর রাজনৈতিক নেতৃত্বকে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে নতুন ভিত্তি দেয়। এই ধারাবাহিকতাই তাঁর রাষ্ট্রনায়ক হয়ে ওঠার ইতিহাসকে পূর্ণতা দেয়।
শহীদ জিয়াউর রহমানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অবদানগুলোর একটি হলো বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের দর্শন প্রতিষ্ঠা। বাংলাদেশের ভৌগোলিক সীমারেখায় বসবাসকারী মানুষের পরিচয় কেবল ভাষা, ধর্ম, বর্ণ, গোত্র কিংবা আঞ্চলিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়—এমন একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্রচিন্তা তিনি সামনে নিয়ে আসেন। পাহাড় ও সমতল, উত্তর ও দক্ষিণ, হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী ও বৃহত্তর জনগোষ্ঠী সবাইকে সমান মর্যাদার বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে ঐক্যবদ্ধ করার প্রত্যয় ছিল তাঁর জাতীয়তাবাদী দর্শনের অন্যতম ভিত্তি।
তাঁর চিন্তায় বাংলাদেশের স্বাধীনতা মানে শুধু একটি ভূখণ্ডের রাজনৈতিক মুক্তি নয়; বরং নিজস্ব ইতিহাস, সংস্কৃতি, ধর্মীয় স্বাধীনতা, অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও জাতীয় স্বাতন্ত্র্য নিয়ে বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো। বাঙালি সংস্কৃতির ভাষাগত ঐতিহ্যকে অস্বীকার না করেই তিনি রাষ্ট্রের বৃহত্তর নাগরিক পরিচয়কে সামনে আনতে চেয়েছিলেন। এ দর্শনের মধ্য দিয়ে তিনি এমন একটি রাজনৈতিক পরিসর নির্মাণের প্রয়াস নেন, যেখানে ধর্মীয় বিশ্বাস ব্যক্তির অধিকার, আর রাষ্ট্রের পরিচয় সব নাগরিকের সম্মিলিত অস্তিত্বের প্রতিফলন। আমার কাছে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য এখানেই—এটি বিভাজনের পরিবর্তে ঐক্য, সংকীর্ণতার পরিবর্তে সহাবস্থান এবং পরনির্ভরতার পরিবর্তে আত্মমর্যাদার কথা বলে।
রাষ্ট্র পরিচালনায় জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা কর্মসূচি ছিল তাঁর উন্নয়নদর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। ১৯৭৭ সালের ৩০ এপ্রিল ঘোষিত এই কর্মসূচিতে স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা, আত্মনির্ভরশীল জাতি গঠন, কৃষির উন্নয়ন, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা, শিক্ষা বিস্তার, চিকিৎসাসেবা, নারীর মর্যাদা, যুবসমাজের উন্নয়ন, জনসম্পৃক্ত প্রশাসন, বেসরকারি খাতের বিকাশ, শ্রমিক-মালিক সুসম্পর্ক, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, স্থানীয় সরকার শক্তিশালীকরণ এবং দুর্নীতিমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার মতো বিষয় স্থান পেয়েছিল। তাঁর রাজনীতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল উৎপাদনমুখী চিন্তা।
তিনি মনে করতেন, শুধু রাজনৈতিক স্লোগানে একটি জাতির ভাগ্য পরিবর্তন হয় না; কৃষককে উৎপাদনে, শ্রমিককে শিল্পে, যুবককে কর্মসংস্থানে এবং সাধারণ মানুষকে উন্নয়নের অংশীদার করতে হয়। খাল খনন কর্মসূচি, সেচব্যবস্থার সম্প্রসারণ, কৃষি উৎপাদনে উৎসাহ, গ্রাম উন্নয়ন, পরিবার পরিকল্পনা, শিক্ষা ও জনস্বাস্থ্য খাতে উদ্যোগ—এসব কর্মসূচির মাধ্যমে তিনি গ্রামীণ বাংলাদেশকে উন্নয়নের মূলধারায় যুক্ত করার চেষ্টা করেন। তাঁর সময়কালে বেসরকারি উদ্যোগ ও রপ্তানিমুখী অর্থনীতির বিকাশের ক্ষেত্রও প্রসারিত হয়। বাংলাদেশের পরবর্তী অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার অনেক ভিত্তি গড়ে ওঠে সেই সময়ের নীতিগত পরিবর্তনের ধারাবাহিকতায়। তাঁর ১৯ দফা তাই আজও উন্নয়ন, সুশাসন ও আত্মনির্ভরতার আলোচনায় প্রাসঙ্গিক।
কৃষি, গ্রামীণ অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নে শহীদ জিয়ার উদ্যোগ বিশেষভাবে স্মরণীয়। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, বাংলাদেশের প্রাণ গ্রামে; কৃষকের ঘামে, শ্রমিকের শ্রমে এবং সাধারণ মানুষের উৎপাদনশীলতায় দেশের অর্থনীতির ভিত্তি নিহিত। তাই তিনি খাল খনন কর্মসূচির মাধ্যমে সেচ, পানি সংরক্ষণ, মৎস্য উৎপাদন ও কৃষির সম্প্রসারণে গুরুত্ব দেন। গ্রামসরকার ও স্থানীয় পর্যায়ে জনসম্পৃক্ততার উদ্যোগের মধ্য দিয়ে প্রশাসনকে মানুষের কাছাকাছি নেওয়ার প্রয়াসও চালান। তাঁর দর্শনে উন্নয়ন ছিল রাজধানীকেন্দ্রিক কোনো বিলাসী ধারণা নয়; বরং প্রত্যন্ত গ্রামের কৃষক, জেলে, শ্রমজীবী মানুষ ও দরিদ্র পরিবারের জীবনে পরিবর্তন আনার বাস্তব কর্মসূচি।
এ কারণেই তাঁর জনপ্রিয়তা শহরের রাজনৈতিক পরিমণ্ডল ছাড়িয়ে গ্রামবাংলার মানুষের মধ্যে বিস্তার লাভ করেছিল। আজকের বাংলাদেশে কৃষির আধুনিকায়ন, পানি ব্যবস্থাপনা, খাল পুনঃখনন, গ্রামীণ অবকাঠামো ও কর্মসংস্থানের যে প্রয়োজনীয়তা আমরা অনুভব করি, তার সঙ্গে জিয়ার উন্নয়নচিন্তার অনেক মৌলিক মিল রয়েছে। তাঁর সন্তান বর্তমান প্রধানমন্ত্রী দেশনায়ক তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন উদ্যোগে খাল খনন ও গ্রামীণ অর্থনীতির প্রসঙ্গ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে উন্নয়নের এই ধারাবাহিকতা তখনই অর্থবহ হবে, যখন তা দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে সাধারণ মানুষের জীবনমানের স্থায়ী উন্নয়ন নিশ্চিত করবে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেও শহীদ জিয়ার দূরদর্শিতা বাংলাদেশের ইতিহাসে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি মনে করতেন, কোনো দেশ একা উন্নতি করতে পারে না; প্রতিবেশীদের সঙ্গে পারস্পরিক সম্মান, সমতা, বাণিজ্য, যোগাযোগ ও সহযোগিতার সম্পর্ক গড়ে তুলতে হয়। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে আঞ্চলিক সহযোগিতার যে ধারণা তিনি ১৯৮০ সালে সামনে আনেন, তারই ধারাবাহিকতায় ১৯৮৫ সালের ৮ ডিসেম্বর ঢাকায় সার্কের আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠা ঘটে। এটি ছিল বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ, যার লক্ষ্য ছিল দক্ষিণ এশিয়ার জনগণের জীবনমান উন্নয়ন, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, সামাজিক অগ্রগতি ও পারস্পরিক আস্থা বৃদ্ধি।
একই সঙ্গে তিনি মুসলিম বিশ্বের দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করেন এবং চীন, জাপান, ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক যোগাযোগ সম্প্রসারণে ভূমিকা রাখেন। তাঁর পররাষ্ট্রনীতির মূল দর্শন ছিল জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌম সমতার ভিত্তিতে বন্ধুত্ব। কোনো শক্তির অধীনতা নয়, বরং সবার সঙ্গে মর্যাদাপূর্ণ সম্পর্ক-এই নীতিই ছিল তাঁর রাষ্ট্রচিন্তার অন্যতম শক্তি। আজকের পরিবর্তনশীল ভূরাজনীতিতে বাংলাদেশের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি, অর্থনৈতিক কূটনীতি ও আঞ্চলিক যোগাযোগের প্রয়োজনীয়তা যত বাড়ছে, শহীদ জিয়ার সেই দূরদর্শী চিন্তার প্রাসঙ্গিকতাও তত স্পষ্ট হচ্ছে।
৭ নভেম্বরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তাৎপর্য হলো সিপাহী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে সংহতির প্রতীকী প্রকাশ। সামরিক বাহিনী রাষ্ট্রের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রধান প্রতিষ্ঠান, আর জনগণ রাষ্ট্রের প্রকৃত মালিক। এই দুই শক্তির মধ্যে পারস্পরিক আস্থা, শৃঙ্খলা ও সাংবিধানিক দায়িত্ববোধ প্রতিষ্ঠিত থাকলে জাতীয় নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা সুদৃঢ় হয়। ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের ঘটনাকে বিএনপি জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস হিসেবে মূল্যায়ন করে। অন্যদিকে জাসদসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক পক্ষ সেদিনের ঘটনাকে ভিন্ন ঐতিহাসিক ব্যাখ্যায় দেখে। বিশেষত সিপাহিদের বিদ্রোহ, আবু তাহেরের ভূমিকা, সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরীণ সংঘাত এবং পরবর্তী সময়ে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড নিয়ে ইতিহাসে বিতর্ক রয়েছে। এই ভিন্নমত ও বিতর্ককে অস্বীকার না করেই বলা যায়, ৭ নভেম্বর বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি নির্ণায়ক অধ্যায়। দিনটির প্রকৃত শিক্ষা হওয়া উচিত—রাষ্ট্রীয় সংকটে জাতীয় ঐক্য, সাংবিধানিক শৃঙ্খলা, পেশাদার সামরিক বাহিনী, জনগণের অধিকার এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করা। কোনো বিপ্লবের চূড়ান্ত সাফল্য কেবল ক্ষমতার পরিবর্তনে নয়; বরং মানুষের স্বাধীনতা, নিরাপত্তা, মর্যাদা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার মধ্যেই নিহিত থাকে।
শহীদ জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার বহন করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি। ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর প্রতিষ্ঠিত এই দলটি তাঁর বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ, বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা, অর্থনৈতিক আত্মনির্ভরতা ও জাতীয় সার্বভৌমত্বের দর্শনকে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে রূপ দেওয়ার প্রত্যয় নিয়ে যাত্রা শুরু করে। তাঁর শাহাদাতের পর দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া দলের নেতৃত্ব গ্রহণ করে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এবং পরবর্তী সময়ে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠায় তাঁর ভূমিকা বিএনপির রাজনৈতিক ইতিহাসের উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। পরবর্তী প্রজন্মে দেশনায়ক তারেক রহমান দলটির নেতৃত্বে এসে শহীদ জিয়ার রাজনৈতিক দর্শন ও উন্নয়নচিন্তাকে নতুন সময়ের উপযোগী করে এগিয়ে নেওয়ার অঙ্গীকার করেছেন। বিএনপির একটি পরিবারের সন্তান হিসেবে আমার কাছে এই রাজনৈতিক উত্তরাধিকার শুধু দলীয় পরিচয়ের গর্ব নয়; এটি দায়িত্ব, আদর্শ ও মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতারও বিষয়। শহীদ জিয়ার নাম উচ্চারণ করলেই তাই মনে পড়ে একজন মুক্তিযোদ্ধার সাহস, একজন রাষ্ট্রনায়কের উন্নয়নচিন্তা এবং একজন জাতীয় নেতার আত্মনির্ভরতার স্বপ্ন। তবে তাঁর প্রকৃত উত্তরসূরি হওয়ার অর্থ কেবল তাঁর ছবি বহন করা কিংবা তাঁর স্লোগান উচ্চারণ করা নয়; তাঁর দেশপ্রেম, সততা, কর্মনিষ্ঠা, জনসম্পৃক্ততা ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদাবোধকে বাস্তবে ধারণ করা।
৭ নভেম্বর আমাদের শিখিয়ে গেছে— জাতি যখন ঐক্যবদ্ধ থাকে, তখন কোনো ষড়যন্ত্রই তাকে পরাজিত করতে পারে না। সিপাহী আর জনতা যেদিন কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়িয়েছিল, সেদিন বাংলাদেশ প্রমাণ করেছিল, এই মাটির মানুষ স্বাধীনতাকে কেবল অর্জন করতেই জানে না, রক্ষা করতেও জানে। শহীদ জিয়াউর রহমান চলে গেছেন, কিন্তু তিনি রেখে গেছেন এমন এক আদর্শ, যা আজও গ্রাম থেকে শহর, পাহাড় থেকে সমতল সর্বত্র মানুষের হৃদয়ে বেঁচে আছে। তিনি রেখে গেছেন বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের অন্তর্ভুক্তিমূলক দর্শন, ১৯ দফার উন্নয়ন-সনদ, খাল খননের মাধ্যমে কৃষকের হাসি, বহুদলীয় গণতন্ত্রের আলো, আর সার্কের মাধ্যমে বিশ্বের বুকে বাংলাদেশের মর্যাদাপূর্ণ পরিচয়। তাঁর সেই আদর্শকে বুকে ধারণ করে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া হয়ে উঠেছেন আপসহীনতার প্রতীক। তিনি শিখিয়েছেন, ক্ষমতার লোভে নয়, জনগণের অধিকারের জন্য রাজনীতি করতে হয়। তাঁর ত্যাগ, তাঁর ধৈর্য, তাঁর মমতাময়ী মাতৃত্ব আজ বাংলাদেশের প্রতিটি ঘরে শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়। তিনি শুধু শহীদ জিয়ার স্ত্রী নন, তিনি নিজেই বাংলাদেশের ইতিহাসের এক মহীয়সী নেত্রী। আজ দেশনায়ক তারেক রহমানের নেতৃত্বে সেই আদর্শ নতুন করে প্রাণ পেয়েছে। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি যখন খাল খনন, গ্রামীণ অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও মানবিক বাংলাদেশের কথা বলেন, তখন মনে হয়— পিতার স্বপ্ন পুত্রের হাত ধরে আবার ফিরে এসেছে। তাঁর দৃঢ়তা, তাঁর দূরদর্শিতা, তাঁর জনসম্পৃক্ততা আমাদের আশা জাগায়— বাংলাদেশ আবার ঘুরে দাঁড়াবে, আবার মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে।
তাঁর এই পথচলায় নীরব শক্তি হয়ে আছেন ডা. জোবায়দা রহমান। একজন চিকিৎসক হিসেবে তিনি যেমন মানুষের জীবন বাঁচান, তেমনি একজন সহযোদ্ধা হিসেবে তিনি পরিবারকে আগলে রাখেন পরম মমতায়। তাঁর বিনয়ী, শিক্ষিত ও মানবিক উপস্থিতি প্রমাণ করে, ক্ষমতার পাশে থেকেও কতটা স্নিগ্ধ ও সেবাপরায়ণ থাকা যায়। আর জাইমা রহমান আমাদের দেখাচ্ছেন ভবিষ্যতের বাংলাদেশ কেমন হবে— মেধাবী, আন্তর্জাতিক, আত্মবিশ্বাসী ও মানবিক। জাতিসংঘের মতো বিশ্বের সর্বোচ্চ মঞ্চে তাঁর উপস্থিতি বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মকে বলছে তোমরাও পারবে, তোমরাও বিশ্ব জয় করতে পারবে। আমরা যারা বিএনপি পরিবারের সন্তান, আমাদের দায়িত্ব কেবল শহীদ জিয়ার ছবি বুকে ধারণ করা নয়— তাঁর সততা, তাঁর কর্মনিষ্ঠা, তাঁর দেশপ্রেম, তাঁর জনসম্পৃক্ততা আর তাঁর আত্মমর্যাদাবোধকে নিজেদের জীবনে ধারণ করা। ৭ নভেম্বরের চেতনা আমাদের আহ্বান জানায় বিভাজন নয়, ঐক্য; প্রতিহিংসা নয়, ন্যায়বিচার; ক্ষমতার অহংকার নয়, জনগণের অধিকার। আসুন, শহীদ জিয়া, দেশনেত্রী খালেদা জিয়া, দেশনায়ক তারেক রহমান, ডা. জোবায়দা রহমান ও জাইমা রহমানের স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ে তুলিযেখানে থাকবে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন, আইনের শাসন, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন এবং ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার সমান মর্যাদা। শহীদ জিয়া ও তাঁর পরিবারের ত্যাগের প্রতি এটাই হবে আমাদের শ্রেষ্ঠ শ্রদ্ধাঞ্জলি। সিপাহী-জনতার সেই ঐতিহাসিক সংহতি আমাদের চিরকাল পথ দেখাক। মহান আল্লাহ আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশকে স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, শান্তি, সমৃদ্ধি ও গণতন্ত্রের পথে এগিয়ে যাওয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।
লেখক : জুবাইয়া বিন্তে কবির
অর্থনীতিবিদ, গবেষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট।
মোবাইল : ০১৮৪৫৮৫৮০৮৯


