।। জুবাইয়া বিন্তে কবির।। আন্তর্জাতিক রাজনীতির পালাবদল, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং বিনিয়োগের প্রতিযোগিতার এই সময়ে প্রধানমন্ত্রী দেশনায়ক তারেক রহমানের জাপান সফর বাংলাদেশের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অধ্যায়। ২৬ অক্টোবর শুরু হওয়া চার দিনের সরকারি সফরের দ্বিতীয় দিন ২৭ অক্টোবর টোকিওতে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে তাঁর দ্বিপক্ষীয় শীর্ষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৈঠক শেষে প্রকাশিত যৌথ বিবৃতিতে উঠে এসেছে আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশে এক ট্রিলিয়ন ইয়েন পর্যন্ত জাপানি বেসরকারি বিনিয়োগের সম্ভাবনা, প্রায় দুই লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রত্যাশা এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতার নতুন রূপরেখা।জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতেও দুই দেশের কৌশলগত অংশীদারত্ব জোরদারের অঙ্গীকার প্রতিফলিত হয়েছে। এই সফরকে কেবল একজন রাষ্ট্রপ্রধানের বিদেশযাত্রা হিসেবে দেখলে এর তাৎপর্য সম্পূর্ণ উপলব্ধি করা যাবে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের শিল্পায়ন, তরুণদের কর্মসংস্থান, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের অবস্থান আরও সুদৃঢ় করার প্রত্যাশা। তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ পুরোনো বন্ধুত্বকে নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনায় রূপান্তরের যে উদ্যোগ নিয়েছে, তার সাফল্য নির্ভর করবে কূটনৈতিক সমঝোতাকে কতটা কার্যকর উন্নয়নে পরিণত করা যায়, তার ওপর।
এক ট্রিলিয়ন ইয়েনের সম্ভাবনা, দুই লাখ কর্মসংস্থানের প্রত্যাশা : সফরের সবচেয়ে আলোচিত অর্জন হলো আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশে জাপানি বেসরকারি বিনিয়োগ এক ট্রিলিয়ন ইয়েনে পৌঁছানোর সম্ভাবনা। ২৭ অক্টোবরের যৌথ বিবৃতিতে জাপানের প্রধানমন্ত্রী এই বিনিয়োগের পূর্বাভাস তুলে ধরেন এবং এর মাধ্যমে প্রায় দুই লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রত্যাশার কথা জানান। সমসাময়িক বিনিময় হারের হিসাবে এর পরিমাণ প্রায় ৬ দশমিক ৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা ৭৭ হাজার কোটি টাকার বেশি। বাংলাদেশের মতো বিপুল কর্মক্ষম তরুণ জনগোষ্ঠীর দেশে এ সম্ভাবনা নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। তবে এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট রাখা জরুরি—এটি আগামী পাঁচ বছরের জন্য ঘোষিত বিনিয়োগের পূর্বাভাস ও লক্ষ্য; পুরো অর্থ ইতিমধ্যে দেশে এসে গেছে কিংবা সব প্রকল্পের চুক্তি চূড়ান্ত হয়েছে, এমন নয়। সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে প্রয়োজন প্রকল্পভিত্তিক বিনিয়োগ, অর্থায়ন, সময়সীমা এবং বাস্তবায়নের সুস্পষ্ট পরিকল্পনা। তারেক রহমানের কূটনৈতিক উদ্যোগের প্রকৃত সাফল্য তাই শুধু বড় অঙ্কের বিনিয়োগের ঘোষণায় সীমাবদ্ধ থাকবে না। বরং কতটি কারখানা স্থাপিত হলো, কত তরুণ কাজ পেলেন, কত নতুন প্রযুক্তি দেশে এলো এবং কতটা উৎপাদনক্ষমতা বাড়ল—এসব সূচকেই তার মূল্যায়ন হওয়া উচিত।
সানায়ে তাকাইচির প্রশংসা ও বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক পরিচিতি : জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্ব ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির প্রচেষ্টার প্রশংসা করেছেন। দুই দেশের বৈঠকে তিনি গণতন্ত্র, স্বাধীনতা ও আইনের শাসনের মতো অভিন্ন মূল্যবোধের ভিত্তিতে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। পাশাপাশি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে জাপানি বিনিয়োগকারীদের জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টিতে তারেক রহমানের নেতৃত্বের প্রতি প্রত্যাশা প্রকাশ করেন। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে আস্থা একটি অমূল্য সম্পদ। কোনো দেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব যত দীর্ঘই হোক, সেই সম্পর্কের গভীরতা নির্ভর করে পারস্পরিক বিশ্বাস, নীতির ধারাবাহিকতা এবং প্রতিশ্রুতি রক্ষার ওপর। জাপানের মতো প্রযুক্তিনির্ভর ও শিল্পোন্নত দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক আরও বিস্তৃত হওয়ার সম্ভাবনা এ কারণেই তাৎপর্যপূর্ণ।
তারেক রহমানের সামনে এখন সেই আস্থাকে প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। বিনিয়োগের অনুমোদন সহজ করা, দুর্নীতি প্রতিরোধ, নীতিগত স্থিতিশীলতা এবং চুক্তি বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা গেলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে বাংলাদেশের গ্রহণযোগ্যতা আরও বাড়বে। আন্তর্জাতিক প্রশংসাকে তখনই জাতীয় অর্জনে রূপ দেওয়া সম্ভব, যখন তার প্রতিফলন ঘটবে দেশের অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের জীবনে।
বিগ-বি থেকে ‘শেয়ারিং প্রসপারিটি’: উন্নয়নের নতুন মানচিত্র : বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক সহযোগিতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ ‘বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ বেল্ট’ বা বিগ-বি। এবারের শীর্ষ বৈঠকে এই উদ্যোগকে আরও বিস্তৃত করে ‘বিগ-বি ফর শেয়ার্ড প্রসপারিটি’ বা ‘অভিন্ন সমৃদ্ধির বিগ-বি’ কাঠামোয় উন্নীত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর লক্ষ্য বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলকে সংযোগ, শিল্পায়ন, জ্বালানি, বাণিজ্য এবং সরবরাহব্যবস্থার সমন্বিত কেন্দ্রে পরিণত করা। বিশেষ করে মাতারবাড়ী-মহেশখালী অঞ্চলকে ঘিরে গভীর সমুদ্রবন্দর, জ্বালানি অবকাঠামো, শিল্পকারখানা ও পণ্য পরিবহনের সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভূগোল বদলে দিতে পারে। একটি কার্যকর গভীর সমুদ্রবন্দর শুধু পণ্য ওঠানামার স্থান নয়; এটি শিল্পাঞ্চল, সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান, গুদাম, পরিবহন, রপ্তানি এবং কর্মসংস্থানের বিস্তৃত নেটওয়ার্ক তৈরির ভিত্তি। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থল। পরিকল্পিত অবকাঠামো ও দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এই অবস্থানকে অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপ দেওয়া গেলে বাংলাদেশ আঞ্চলিক বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে। তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিগ-বির নতুন কাঠামো সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবতার কাছাকাছি নিয়ে যাওয়ার একটি সুযোগ।
অবকাঠামো উন্নয়ন: রাজধানী থেকে সমুদ্রবন্দর পর্যন্ত :
উন্নয়নের গতি বাড়াতে আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থার বিকল্প নেই। বাংলাদেশ ও জাপানের শীর্ষ বৈঠকে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল দ্রুত চালুর প্রস্তুতি, ঢাকার গণপরিবহন ও মেট্রোরেল প্রকল্পের অগ্রগতি এবং মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরকে ঘিরে ভবিষ্যৎ সহযোগিতার বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে।
একটি আধুনিক বিমানবন্দর আন্তর্জাতিক যাত্রী চলাচলের পাশাপাশি পর্যটন, ব্যবসা, পণ্য পরিবহন এবং বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও নতুন সুযোগ তৈরি করে। একইভাবে মেট্রোরেল নগরজীবনের যানজট ও যাতায়াতের সময় কমাতে সহায়ক হতে পারে। আর গভীর সমুদ্রবন্দর দেশের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করার সম্ভাবনা রাখে।
তবে অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি প্রকল্পের ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, সময়মতো কাজ শেষ করা, ঋণের শর্ত পর্যালোচনা এবং পরিচালন দক্ষতা নিশ্চিত করা জরুরি। উন্নয়ন প্রকল্পের সাফল্য কেবল দৃশ্যমান স্থাপনায় নয়; বরং সেই স্থাপনা কতটা কার্যকরভাবে মানুষের জীবন ও অর্থনীতিকে এগিয়ে নেয়, তার মধ্যেই নিহিত। বাংলাদেশের প্রয়োজন এমন অবকাঠামো, যা বর্তমানের পাশাপাশি আগামী প্রজন্মেরও সম্পদ হয়ে থাকবে।
জ্বালানি নিরাপত্তা ও শিল্পায়নের ভিত : অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম পূর্বশর্ত নিরবচ্ছিন্ন ও সাশ্রয়ী জ্বালানি সরবরাহ। বিদ্যুৎ ও জ্বালানির ঘাটতি, আমদানিনির্ভরতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্য ওঠানামা শিল্প উৎপাদন ও ব্যবসার ব্যয় বাড়িয়ে দিতে পারে। বাংলাদেশ-জাপান বৈঠকে জ্বালানি নিরাপত্তা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার বিষয়ে সহযোগিতা জোরদারের অঙ্গীকার এসেছে। এ ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট আর্থিক উদ্যোগও রয়েছে। জাপানের ‘পাওয়ার এশিয়া’ কর্মসূচির আওতায় অর্থনৈতিক স্থিতিস্থাপকতা ও স্থিতিশীল জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে ৫০ বিলিয়ন ইয়েন বা প্রায় ৩১৭ মিলিয়ন ডলারের জরুরি ঋণসহায়তার বিষয়টি যৌথ বৈঠকের ফলাফলে উঠে এসেছে। এটি বেসরকারি বিনিয়োগের ঘোষিত এক ট্রিলিয়ন ইয়েনের অংশ নয়; বরং আলাদা উন্নয়ন ও জ্বালানি-সহায়তা উদ্যোগ। জ্বালানি খাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, নবায়নযোগ্য উৎসের ব্যবহার, বিদ্যুৎ সঞ্চালনব্যবস্থার উন্নয়ন এবং দক্ষ জ্বালানি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশের শিল্পায়ন আরও গতিশীল হতে পারে। একই সঙ্গে ঋণ গ্রহণের শর্ত, অর্থের ব্যবহার এবং প্রকল্পের প্রত্যাশিত সুফল সম্পর্কে স্বচ্ছতা বজায় রাখা প্রয়োজন। জ্বালানি নিরাপত্তা শক্তিশালী হলেই বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘমেয়াদি উৎপাদন পরিকল্পনায় অধিক আত্মবিশ্বাসী হবেন।
প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও দক্ষ মানবসম্পদ : বিশ্ব অর্থনীতি এখন চতুর্থ শিল্পবিপ্লব, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সেমিকন্ডাক্টর প্রযুক্তি, স্বয়ংক্রিয় উৎপাদন এবং ডিজিটাল সেবার দিকে দ্রুত এগোচ্ছে। বাংলাদেশের জন্য এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলানো শুধু আধুনিকতার প্রশ্ন নয়; এটি ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থান ও প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা টিকিয়ে রাখারও শর্ত। জাপানের সঙ্গে আলোচনায় তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি, প্রযুক্তি হস্তান্তর, উন্নত উৎপাদনশিল্প এবং বাংলাদেশ-জাপান প্রযুক্তি পার্ক প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব গুরুত্ব পেয়েছে। পাশাপাশি দক্ষতা উন্নয়ন, গবেষণা, উদ্ভাবন এবং কারিগরি প্রশিক্ষণ বাড়ানোর সুযোগও রয়েছে। ৭ বাংলাদেশের তরুণদের জন্য সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা হলো শুধু বিদেশি প্রতিষ্ঠানে কাজ পাওয়া নয়, বরং আধুনিক প্রযুক্তি শিখে দেশে উচ্চমূল্যের পণ্য ও সেবা উৎপাদনে সক্ষম হওয়া। জাপানি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়, কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় শিল্পের কার্যকর অংশীদারত্ব গড়ে তোলা গেলে দক্ষ কর্মী তৈরির পাশাপাশি গবেষণা ও উদ্ভাবনের পরিবেশও সমৃদ্ধ হবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সামনে তাই একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব—বিনিয়োগের সঙ্গে দক্ষতা ও জ্ঞান হস্তান্তরকে যুক্ত করা। বিদেশি পুঁজি তখনই দীর্ঘস্থায়ী সুফল দেবে, যখন তার সঙ্গে দেশের মানুষের সক্ষমতা বাড়বে এবং বাংলাদেশ নিজেই উন্নত উৎপাদনব্যবস্থার অংশীদার হয়ে উঠবে।
অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি: রপ্তানির নতুন সম্ভাবনা :
বাংলাদেশ ও জাপানের অর্থনৈতিক সম্পর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হলো অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি বা ইপিএ। দুই দেশ গত ৬ ফেব্রুয়ারি চুক্তিটি স্বাক্ষর করে। পণ্য ও সেবার বাজারে প্রবেশাধিকার উন্নত করা, শুল্কসংক্রান্ত বাধা কমানো এবং বাণিজ্য ও বিনিয়োগের নিয়মকাঠামো সুসংহত করার ক্ষেত্রে চুক্তিটির তাৎপর্য রয়েছে। ৮ জাপানের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক, চামড়াজাত পণ্য, কৃষিপণ্য, হালকা প্রকৌশলপণ্য এবং অন্যান্য রপ্তানিযোগ্য পণ্যের সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে। তবে বাজারে সুবিধা পাওয়ার জন্য শুধু চুক্তি যথেষ্ট নয়। পণ্যের মান, উৎপাদন ব্যয়, পরিবেশগত মানদণ্ড, সরবরাহের সময়নিষ্ঠতা এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের চাহিদা পূরণের সক্ষমতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের জন্য বিশেষভাবে জরুরি রপ্তানিকে তৈরি পোশাকের গণ্ডি থেকে বের করে বহুমুখী করা। জাপানি বিনিয়োগে নতুন শিল্প স্থাপিত হলে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা এবং রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানো সম্ভব হতে পারে। তারেক রহমানের সরকারের দায়িত্ব হবে ইপিএর সম্ভাব্য সুবিধাগুলো ব্যবসায়ীদের কাছে সহজবোধ্য করা, প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তা দেওয়া এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের পথ সুগম করা।
শিল্পায়নের নতুন অধ্যায়: গাড়ি, সার ও উৎপাদনশিল্প :
জাপান বিশ্বের অন্যতম প্রধান শিল্পোন্নত দেশ। অটোমোবাইল, ইলেকট্রনিকস, যন্ত্রপাতি, উন্নত উৎপাদন প্রযুক্তি এবং শিল্প ব্যবস্থাপনায় দেশটির দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে। বাংলাদেশে এসব খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো গেলে স্থানীয় উৎপাদন, প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং রপ্তানির সম্ভাবনা একসঙ্গে প্রসারিত হতে পারে।প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাপানি ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনায় তথ্যপ্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, উন্নত উৎপাদনশিল্প এবং সার উৎপাদন খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেডের আধুনিকায়ন এবং দেশে দ্বিতীয় সার কারখানা স্থাপনের সম্ভাবনা যাচাইয়েও জাপানের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে। সার উৎপাদনে সক্ষমতা বাড়লে কৃষি খাতের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সুফল তৈরি হতে পারে। একইভাবে গাড়ি ও যন্ত্রাংশ উৎপাদনে স্থানীয় শিল্পের বিকাশ ঘটলে নতুন কর্মসংস্থান এবং সংশ্লিষ্ট ক্ষুদ্র শিল্পের প্রসার ঘটার সুযোগ রয়েছে। তবে এসব উদ্যোগের ক্ষেত্রে প্রকল্পের আর্থিক সম্ভাব্যতা, প্রযুক্তি নির্বাচনের যথার্থতা, পরিবেশগত প্রভাব এবং বাজারের চাহিদা বিবেচনা করতে হবে। বাংলাদেশের লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু বিদেশি পণ্যের বাজার হয়ে থাকা নয়; বরং এমন একটি উৎপাদনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠা, যেখানে স্থানীয় শ্রমিক, প্রকৌশলী ও উদ্যোক্তারা বিশ্বমানের পণ্য উৎপাদনে অংশ নেবেন। শিল্পায়নের সেই পথই দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ও সমৃদ্ধির ভিত্তি শক্তিশালী করবে।
বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ: ঘোষণার পরের কঠিন পরীক্ষা :
বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সদিচ্ছা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু বিনিয়োগকারীরা শেষ পর্যন্ত হিসাব করেন বাস্তব পরিবেশের ভিত্তিতে। জমি পাওয়া, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের নিশ্চয়তা, করব্যবস্থার পূর্বানুমানযোগ্যতা, দ্রুত প্রশাসনিক অনুমোদন, চুক্তি বাস্তবায়ন এবং বিরোধ নিষ্পত্তির নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা—এসবই বিনিয়োগের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে। সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুনের বক্তব্যের মূল তাৎপর্যও এখানেই: এক ট্রিলিয়ন ইয়েনের সম্ভাব্য বিনিয়োগ বাংলাদেশের জন্য বড় সুযোগ তৈরি করলেও তা বাস্তবায়িত হবে কি না, নির্ভর করবে নির্দিষ্ট প্রকল্প চূড়ান্ত করা এবং বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্তের ওপর।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিনিয়োগকারীদের জন্য যে আস্থার বার্তা দিয়েছেন, তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রশাসনিক সংস্কারকে বাস্তব রূপ দিতে হবে। বিনিয়োগ অনুমোদনের প্রক্রিয়া সহজ করা, অপ্রয়োজনীয় আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানো, নীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। একটি প্রকৃত বিনিয়োগবান্ধব রাষ্ট্রের পরিচয় শুধু বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য সুবিধা সৃষ্টি করা নয়; দেশীয় উদ্যোক্তাদের জন্যও সমান সুযোগ নিশ্চিত করা। স্থানীয় শিল্পের বিকাশ, প্রতিযোগিতা এবং কর্মসংস্থান বাড়াতে পারলেই বিদেশি বিনিয়োগ দেশের অর্থনীতির সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত হবে।
ঋণ ও বিনিয়োগ এক নয়: অর্থনৈতিক বিচক্ষণতার প্রয়োজন : জাপান বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের উন্নয়ন সহযোগী। সড়ক, রেল, বিদ্যুৎ, নগর পরিবহন এবং বিভিন্ন অবকাঠামো প্রকল্পে দেশটির সহায়তা বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু ঋণ, উন্নয়নসহায়তা এবং বেসরকারি বিনিয়োগের মধ্যে পার্থক্য বোঝা অত্যন্ত জরুরি।বেসরকারি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কোনো প্রতিষ্ঠান নিজের বাণিজ্যিক প্রত্যাশা বিবেচনায় পুঁজি বিনিয়োগ করে। অন্যদিকে ঋণ পরিশোধ করতে হয় নির্ধারিত শর্ত অনুযায়ী, আর উন্নয়নসহায়তার প্রকৃতি নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট চুক্তি ও অর্থায়নের কাঠামোর ওপর। ফলে এক ট্রিলিয়ন ইয়েনের সম্ভাব্য বেসরকারি বিনিয়োগ এবং ৫০ বিলিয়ন ইয়েনের জরুরি ঋণসহায়তাকে এক করে দেখার সুযোগ নেই। বাংলাদেশের স্বার্থে প্রতিটি ঋণের সুদের হার, পরিশোধের সময়সীমা, মুদ্রা বিনিময়ের ঝুঁকি এবং প্রকল্প থেকে প্রত্যাশিত আয় সতর্কতার সঙ্গে মূল্যায়ন করা দরকার। বিশেষত মেট্রোরেল ও অন্যান্য বড় অবকাঠামো প্রকল্পে ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং অর্থনৈতিক সুফলের বাস্তব হিসাব নিশ্চিত করতে হবে। তারেক রহমানের সরকারের জন্য অর্থনৈতিক কূটনীতির বড় পরীক্ষা হবে—দেশের প্রয়োজনীয় অর্থায়ন সংগ্রহের পাশাপাশি ঋণের বোঝা যেন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর অযৌক্তিক চাপ সৃষ্টি না করে। বিচক্ষণ অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনাই বিদেশি সহযোগিতাকে টেকসই জাতীয় সম্পদে পরিণত করতে পারে।
বঙ্গোপসাগর ও ইন্দো-প্যাসিফিক: অর্থনীতির সঙ্গে ভূরাজনীতির যোগ : বাংলাদেশের জাপান সফরের গুরুত্ব অর্থনৈতিক সহযোগিতার বাইরেও বিস্তৃত। জাপানের ‘ফ্রি অ্যান্ড ওপেন ইন্দো-প্যাসিফিক’ বা এফওআইপি উদ্যোগের লক্ষ্য হলো আন্তর্জাতিক নিয়ম, স্বচ্ছতা, সমুদ্রপথের স্বাধীনতা এবং আঞ্চলিক শান্তি ও সমৃদ্ধির ভিত্তিতে ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলকে এগিয়ে নেওয়া।
জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সফরের আগেই জানিয়েছিল, তারেক রহমানের এই সফর দুই দেশের কৌশলগত অংশীদারত্ব জোরদার করার পাশাপাশি হালনাগাদ এফওআইপি উদ্যোগ বাস্তবায়নে সমন্বয় বাড়াবে বলে তারা প্রত্যাশা করে। শীর্ষ বৈঠকেও দুই নেতা আঞ্চলিক শান্তি, স্থিতিশীলতা এবং পারস্পরিক সমৃদ্ধির বিষয়ে সহযোগিতা অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার করেছেন। বঙ্গোপসাগর আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথের অংশ। এ অঞ্চলে স্থিতিশীলতা বজায় থাকলে বাংলাদেশ যেমন অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হতে পারে, তেমনি আঞ্চলিক যোগাযোগ ও শিল্পায়নের সুযোগও বাড়বে। তবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির শক্তি হওয়া উচিত নিজস্ব জাতীয় স্বার্থ, স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং সব অংশীদারের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা। কোনো ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার হাতিয়ার না হয়ে বাংলাদেশ যদি সহযোগিতা, সংযোগ ও শান্তির কার্যকর অংশীদার হতে পারে, তাহলে তার আন্তর্জাতিক মর্যাদা আরও সুদৃঢ় হবে।
সমুদ্রনিরাপত্তা, রোহিঙ্গা সংকট ও আঞ্চলিক শান্তি : বাংলাদেশের ভৌগোলিক বাস্তবতায় সমুদ্রনিরাপত্তা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার গুরুত্ব অপরিসীম। শীর্ষ বৈঠকে জাপান বাংলাদেশের উপকূলরক্ষী বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য একটি টহল জাহাজ দেওয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছে। পাশাপাশি দুই দেশ নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার করেছে। সমুদ্রসীমা সুরক্ষা, অবৈধ কর্মকাণ্ড প্রতিরোধ, দুর্যোগে উদ্ধার তৎপরতা এবং সামুদ্রিক সম্পদ রক্ষার ক্ষেত্রে আধুনিক সরঞ্জাম ও প্রশিক্ষণ কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বঙ্গোপসাগরকে ঘিরে বাণিজ্য ও শিল্পায়নের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হলে নিরাপদ সমুদ্রপথও নিশ্চিত করতে হবে। অন্যদিকে, রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘস্থায়ী মানবিক ও অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করছে। মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অপরিহার্য। জাপানের সঙ্গে আলোচনায় আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি এবং মিয়ানমার পরিস্থিতি গুরুত্ব পেয়েছে। তারেক রহমানের সরকারের জন্য এই ক্ষেত্রেও প্রয়োজন ধারাবাহিক কূটনৈতিক উদ্যোগ। বাংলাদেশের মানবিক অবস্থানকে আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় রূপান্তর করা গেলে রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধানের পথে অগ্রগতি সম্ভব হতে পারে। শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির স্থায়ী ভিত্তি।
স্বাস্থ্য কূটনীতি ও মানবিক উন্নয়নে জুবাইদা রহমানের ভূমিকা : অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রকৃত মূল্য নির্ধারিত হয় মানুষের জীবন কতটা উন্নত হলো, তার ভিত্তিতে। এই বিবেচনায় প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী ও চিকিৎসক ডা. জুবাইদা রহমানের জাপান সফরের স্বাস্থ্যবিষয়ক কর্মসূচিও বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। ২৭ অক্টোবর টোকিওতে সাসাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশন আয়োজিত স্বাস্থ্যবিষয়ক সেমিনারে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা, স্বাস্থ্য গবেষণা, মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য এবং আধুনিক চিকিৎসা অবকাঠামোর উন্নয়নে সহযোগিতা বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। শিশু ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ফাউন্ডেশনটির ভূমিকার প্রশংসা করে বাংলাদেশে তাদের কার্যক্রম সম্প্রসারণেরও অনুরোধ জানান তিনি। ১২ স্বাস্থ্য কূটনীতি আন্তর্জাতিক সহযোগিতার এমন একটি ক্ষেত্র, যেখানে প্রযুক্তি, গবেষণা, প্রশিক্ষণ এবং মানবিক উদ্যোগ সরাসরি মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলে। জাপানের চিকিৎসা প্রযুক্তি ও জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের প্রয়োজনের সঙ্গে সমন্বয় করা গেলে স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নে নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে মা ও শিশুর স্বাস্থ্য, গ্রামীণ চিকিৎসা, স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ এবং সাশ্রয়ী চিকিৎসাসেবা সম্প্রসারণে কার্যকর অংশীদারত্ব গুরুত্বপূর্ণ। উন্নয়নের আলো তখনই সত্যিকার অর্থে ঘরে ঘরে পৌঁছাবে, যখন অর্থনৈতিক অগ্রগতির পাশাপাশি মানুষের স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তাও নিশ্চিত হবে।
প্রধানমন্ত্রী দেশনায়ক তারেক রহমানের জাপান সফরকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, শিল্পায়ন ও নতুন বিনিয়োগের সম্ভাবনা উন্মোচনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে অভিহিত করেছেন প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব ও সফরসঙ্গী মোঃ আতিকুর রহমান রুমন। বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য রুমন ২৭ অক্টোবর মঙ্গলবার স্থানীয় সময় রাতে টোকিওতে বাংলাদেশ দূতাবাসে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বলেন, জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক ফলপ্রসূ হয়েছে। তিনি জানান, বাংলাদেশের উন্নয়নে জাপানের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী দেশটির বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও স্থাপনা পরিদর্শন করেছেন। আতিকুর রহমান রুমনের ভাষ্য অনুযায়ী, দেশের অর্থনীতি ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে আরও কার্যকর করার পাশাপাশি শিল্পায়নের নতুন সুযোগ সৃষ্টিতে সরকার কাজ করছে। দেশের মানুষের কল্যাণ ও উন্নয়ন নিশ্চিত করতে প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করছেন এবং জাপান সফরের কর্মসূচিগুলোও বাংলাদেশের উন্নয়ন সম্ভাবনা সম্প্রসারণের লক্ষ্যেই সাজানো হয়েছে। তাঁর এই বক্তব্যে সফরের মূল দর্শনটি স্পষ্ট—আন্তর্জাতিক অংশীদারত্বকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়ানো, শিল্পায়নের নতুন পথ তৈরি করা এবং উন্নয়নের সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া। জাপানের উন্নত প্রযুক্তি, শিল্প ব্যবস্থাপনা ও দক্ষতা উন্নয়নের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের বাস্তবতায় কাজে লাগানো সম্ভব হলে এই সফর ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
পরিশেষে, দেশনায়ক তারেক রহমানের জাপান সফর বাংলাদেশের সামনে নতুন সম্ভাবনার জানালা খুলে দিয়েছে। এক ট্রিলিয়ন ইয়েন পর্যন্ত সম্ভাব্য বেসরকারি বিনিয়োগ, দুই লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রত্যাশা, বিগ-বির সম্প্রসারিত কাঠামো, জ্বালানি সহযোগিতা, প্রযুক্তি হস্তান্তর, ইপিএ বাস্তবায়ন এবং স্বাস্থ্য ও মানবসম্পদ উন্নয়নের উদ্যোগ—সব মিলিয়ে বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্কের ভবিষ্যৎ আরও বিস্তৃত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, সম্ভাবনা আর অর্জন এক বিষয় নয়। বড় ঘোষণাকে বাস্তব সাফল্যে রূপ দিতে প্রয়োজন দক্ষ প্রশাসন, নীতির ধারাবাহিকতা, জবাবদিহি, সুশাসন এবং বিনিয়োগ বাস্তবায়নের নিরবচ্ছিন্ন তদারকি। ঘোষিত বিনিয়োগের প্রকল্পভিত্তিক অগ্রগতি, কর্মসংস্থানের বাস্তব সংখ্যা, প্রযুক্তি হস্তান্তরের ফলাফল এবং ঋণের আর্থিক দায় নিয়মিতভাবে মূল্যায়ন করতে হবে। তারেক রহমানের নেতৃত্বের ইতিবাচক দিক হলো, বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বকে তিনি অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ও ভবিষ্যৎ সহযোগিতার আলোচনায় সামনে এনেছেন। এখন প্রয়োজন সেই কূটনৈতিক অর্জনকে দেশের প্রতিটি অঞ্চলের মানুষের জীবনমান উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত করা। কৃষক যেন উন্নত প্রযুক্তির সুফল পান, তরুণ যেন মর্যাদাপূর্ণ কাজের সুযোগ পান, উদ্যোক্তা যেন সহজে শিল্প গড়ে তুলতে পারেন এবং সাধারণ মানুষ যেন উন্নয়নের বাস্তব সুবিধা অনুভব করেন। জাপানের সঙ্গে বাংলাদেশের বন্ধুত্বের ইতিহাস দীর্ঘ; সেই বন্ধুত্বের আগামী অধ্যায় লেখা হোক পারস্পরিক আস্থা, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি, ন্যায্য বাণিজ্য এবং মানুষের কল্যাণের ভিত্তিতে। টোকিওর আলোচনায় যে সম্ভাবনার বীজ রোপিত হয়েছে, তা যেন বাংলাদেশের মাটি ও মানুষের শ্রমে একদিন সমৃদ্ধির বৃক্ষে পরিণত হয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাপান সফরের প্রকৃত সার্থকতা সেখানেই—যখন কূটনীতির সাফল্য মানুষের মুখে হাসি ফোটাবে, কর্মসংস্থানের নতুন দুয়ার খুলবে এবং একটি আত্মবিশ্বাসী, সক্ষম ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার পথকে আরও প্রশস্ত করবে।
লেখক : জুবাইয়া বিন্তে কবির
অর্থনীতিবিদ, গবেষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট


