চাঁদপুর: একই রোগী, একই ডায়াগনস্টিক সেন্টার-কিন্তু পরীক্ষার ফল দুই রকম! চাঁদপুর শহরের ঢাকা ডিজিটাল ডায়াগনস্টিক সেন্টারে করা প্রথম পরীক্ষার রিপোর্টে ডান কিডনিতে পাথর এবং দুই কিডনিতে মৃদু হাইড্রোনেফ্রোসিসের কথা উল্লেখ করা হলেও পরবর্তীতে একই প্রতিষ্ঠানে পুনরায় পরীক্ষা করে রোগীকে জানানো হয়েছে, কিডনিতে কোনো পাথর নেই। এবার বলা হয়েছে, তার সমস্যা নাকি পেটে গ্যাস!সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, পুনরায় পরীক্ষা করার পরও রোগীর হাতে কোনো লিখিত রিপোর্ট দেওয়া হয়নি। চিকিৎসকের মাধ্যমে মৌখিকভাবে জানানো হয়েছে পরীক্ষার ফল। ফলে আগের রিপোর্টে কিডনিতে পাথর ও হাইড্রোনেফ্রোসিসের উল্লেখ থাকার পর নতুন পরীক্ষায় তা কীভাবে ‘গ্যাসের সমস্যা’ হয়ে গেল—এ প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর মিলছে না।
সম্প্রতি ‘একই রোগী, একই পরীক্ষা-দুই ডায়াগনস্টিক সেন্টারে দুই রকম রিপোর্ট!’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশের পর বিষয়টি আরও আলোচনায় আসে। এরপর ঢাকা ডিজিটাল ডায়াগনস্টিক সেন্টারের পক্ষ থেকে আরিফ নামে ওই রোগীকে পুনরায় ডেকে নিয়ে পরীক্ষা করা হয়।
আরিফ জানান, গত ২৯ সেপ্টেম্বর চাঁদপুর শহরের হাজী মহসিন রোডে অবস্থিত ঢাকা ডিজিটাল ডায়াগনস্টিক সেন্টারে তার আল্ট্রাসনোগ্রাম (ইউএসজি) ও এক্স-রে (কেইউবি) করা হয়।
এক্স-রে রিপোর্টে রাইট লিওনাল কার্কুলাস’ উল্লেখ করে ডান কিডনিতে পাথর থাকার কথা বলা হয়। একই প্রতিষ্ঠানে করা রিপোর্টে ‘ইউ এস জি হোল এবডোমেন রিপোর্টে বিল্যাটেরিয়াল মিলড হাইড্রোনেফ্রোসিসের ’ উল্লেখ করা হয়। অর্থাৎ দুই কিডনিতে মৃদু হাইড্রোনেফ্রোসিস রয়েছে বলে রিপোর্টে বলা হয়।
রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পর স্বাভাবিকভাবেই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন আরিফ। বিষয়টি নিশ্চিত হতে পরদিন ৩০ সেপ্টেম্বর তিনি চাঁদপুর সদর হাসপাতালের সামনে অবস্থিত আজাদ এক্স-রে অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারে একই ধরনের পরীক্ষা করান।
আরিফের দাবি, আজাদ এক্স-রে অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারের আল্ট্রাসনোগ্রাম ও এক্স-রে রিপোর্টে কিডনিতে পাথর কিংবা অন্য কোনো অস্বাভাবিকতার কথা পাওয়া যায়নি।
দুটি প্রতিষ্ঠানের রিপোর্টে এমন পার্থক্যের বিষয়টি নিয়ে দৈনিক নয়া প্রভাতে সংবাদ প্রকাশের পর ঢাকা ডিজিটাল ডায়াগনস্টিক সেন্টারের পক্ষ থেকে আরিফকে আবারও ডেকে নেওয়া হয়।
আরিফের ভাষ্য অনুযায়ী, সেখানে পুনরায় পরীক্ষা করা হলেও তাকে কোনো লিখিত রিপোর্ট দেওয়া হয়নি। বরং চিকিৎসকের মাধ্যমে জানানো হয়, তার কিডনিতে কোনো পাথর নেই এবং পেটে গ্যাসের সমস্যা রয়েছে।
আরিফ বলেন, আগের রিপোর্টে আমার ডান কিডনিতে পাথর এবং দুই কিডনিতে মৃদু হাইড্রোনেফ্রোসিসের কথা বলা হয়েছিল। পরে অন্য জায়গায় পরীক্ষা করালে কোনো সমস্যা পাওয়া যায়নি। সংবাদ প্রকাশের পর ঢাকা ডিজিটাল থেকে আমাকে আবার ডেকে নিয়ে পরীক্ষা করানো হয়েছে। কিন্তু আমাকে কোনো রিপোর্ট দেওয়া হয়নি। ডাক্তার বলেছেন, পাথর নেই, গ্যাসের সমস্যা আছে।
এ সময় ঢাকা ডিজিটাল ডায়াগনস্টিক সেন্টারের পক্ষ থেকে আগের রিপোর্টটি ভুল ছিল বলেও দাবি করা হয়েছে বলে জানান আরিফ। তবে নতুন পরীক্ষার লিখিত রিপোর্ট রোগীর হাতে না থাকায় আগের ও পরের রিপোর্টের মধ্যে পার্থক্যের প্রকৃত কারণ স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
এদিকে বিষয়টি নিয়ে ঢাকা ডিজিটাল ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিকপক্ষের পরিচয়দানকারী মহসিনের বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলে তার বিরুদ্ধে সাংবাদিকদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণের অভিযোগ উঠেছে।
সংবাদ প্রকাশের বিষয়ে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “আমিও সাংবাদিক। সিনিয়র সাংবাদিকদের সঙ্গে আমার ওঠাবসা আছে। আপনারা নিউজ করলে আমিও দেখে নেব। আমি শতভাগ নিশ্চিত কিডনিতে পাথর আছে, এক্সরে রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে।
একই রোগীর কাছাকাছি সময়ে করা পরীক্ষায় প্রথমে কিডনিতে পাথর ও দুই কিডনিতে মৃদু হাইড্রোনেফ্রোসিসের কথা উল্লেখ করা হলো, অথচ পরবর্তীতে একই প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা করে বলা হলো—কিডনিতে কোনো পাথরই নেই। তাহলে প্রথম রিপোর্টে কীভাবে এমন তথ্য এলো?
এ ছাড়া নতুন পরীক্ষার পর রোগীকে লিখিত রিপোর্ট না দিয়ে কেবল মৌখিকভাবে ফলাফল জানানো হয়েছে কেন—এ প্রশ্নও উঠেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একই রোগীর একই ধরনের পরীক্ষায় ভিন্ন ফল পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট রিপোর্ট, ব্যবহৃত যন্ত্র, পরীক্ষার পদ্ধতি এবং রিপোর্ট প্রস্তুতকারী সংশ্লিষ্টদের ভূমিকা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তবে এ ক্ষেত্রে নতুন পরীক্ষার লিখিত রিপোর্ট না থাকায় বিষয়টি যাচাই আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।
ঘটনাটি নিয়ে চাঁদপুরে আলোচনা তৈরি হলেও সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন রোগী ও তার স্বজনরা।
রোগী ও তার স্বজনদের দাবি, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে প্রথম ও পরবর্তী পরীক্ষার ফলাফলের পার্থক্যের প্রকৃত কারণ বের করতে হবে। একই সঙ্গে বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর পরীক্ষা-নিরীক্ষার মান, রিপোর্ট তৈরির প্রক্রিয়া, রোগীকে লিখিত রিপোর্ট সরবরাহ এবং রোগীদের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল আচরণ নিশ্চিত করতে কার্যকর তদারকি প্রয়োজন।
কারণ রোগ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে একটি রিপোর্টের ভুল তথ্য একজন রোগীকে যেমন অযথা আতঙ্কিত করতে পারে, তেমনি ভুল চিকিৎসা বা অপ্রয়োজনীয় চিকিৎসার ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে। তাই ঢাকা ডিজিটালের এই ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটনে সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের নিরপেক্ষ তদন্ত এখন সময়ের দাবি।
বাংলাদেশ প্রাইভেট হসপিটাল ক্লিনিক এন্ড ডায়াগনস্টিক অ্যাসোসিয়েশন চাঁদপুর জেলা শাখার সভাপতি ডাক্তার মোবারক হোসেন চৌধুরী বলেন, মেডিক্যাল রিপোর্টের বিষয়ে চাঁদপুর মেডিকেল কলেজের রেডিওলজি প্রফেসর ভাল মতামত দিতে পারবে। তবে ডায়াগনস্টিক গুলোতে পরীক্ষা-নিরীক্ষার ক্ষেত্রে আমাদেরকে আরো সচেতন হওয়া দরকার। যেকোনো ধরনের ভুল পরীক্ষা রোগীর জন্য ক্ষতিকর।
এ বিষয়ে চাঁদপুরের সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ নুর আলম দীনের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, কেউ অভিযোগ দিলে আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।
ফম/এমএমএ/


