
শাহরাস্তি (চাঁদপুর): চাঁদপুরের শাহরাস্তি উপজেলার শংকরপুর গ্রামে একদল স্বপ্নবাজ তরুণের উদ্যোগে গড়ে ওঠা সামাজিক সংগঠন টিম শংকরপুর গ্রামীণ শিক্ষার মানোন্নয়নে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে। সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাশ্রম ও সেবামূলক মানসিকতায় পরিচালিত সংগঠনটি শিক্ষার্থীদের জন্য গড়ে তুলেছে একটি নিয়মতান্ত্রিক সন্ধ্যাকালীন একাডেমিক রিডিং রুম, যা ইতোমধ্যে এলাকার শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।
২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করা এই রিডিং রুমে প্রতিদিন নির্ধারিত সময়ে শিক্ষার্থীরা এসে পাঠ্যবই অধ্যয়ন, বাড়ির কাজ সম্পন্ন, দুর্বল বিষয়গুলোর চর্চা এবং পরীক্ষার প্রস্তুতির সুযোগ পাচ্ছে। বিদ্যালয়ের পাঠের পাশাপাশি একটি শান্ত, নিরাপদ ও শৃঙ্খলাপূর্ণ পরিবেশে পড়াশোনার সুযোগ তৈরি হওয়ায় শিক্ষার্থীদের আগ্রহও বেড়েছে।
বর্তমানে তিনজন শিক্ষক নিয়মিত পাঠদান করছেন। তাঁদের তত্ত্বাবধানে শিক্ষার্থীরা শুধু পাঠ্যবিষয়েই নয়, শৃঙ্খলা, সময়ানুবর্তিতা, পরিচ্ছন্নতা ও নৈতিক মূল্যবোধ সম্পর্কেও দিকনির্দেশনা পাচ্ছে।
প্রাথমিক শিক্ষার ভিত্তি শক্তিশালী করতে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য সম্পূর্ণ বিনামূল্যে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করছে সংগঠনটি। বাংলা, ইংরেজি ও গণিত বিষয়ে নিয়মিত ক্লাসের পাশাপাশি সাপ্তাহিক পাঠ পরিকল্পনা, অনুশীলন শিট, ক্লাস টেস্ট, মৌখিক মূল্যায়ন এবং ধারাবাহিক অগ্রগতি মূল্যায়নের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। যেসব শিক্ষার্থী পড়াশোনায় পিছিয়ে রয়েছে, তাদের জন্য অতিরিক্ত সহায়তা ও বিশেষ পরিচর্যার ব্যবস্থাও রয়েছে।
শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করতে টিম শংকরপুর একটি প্রক্টোরিয়াল টিম গঠন করেছে। এই টিম নিয়মিত ক্লাস পর্যবেক্ষণ, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ও শৃঙ্খলা তদারকি, পাঠদানের মান মূল্যায়ন এবং পরীক্ষা পরিচালনার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করছে। ফলে শিক্ষা কার্যক্রমে জবাবদিহিতা ও মান নিয়ন্ত্রণ আরও সুদৃঢ় হয়েছে।
সংগঠনটির অন্যতম শক্তি অভিভাবকদের সক্রিয় সম্পৃক্ততা। নির্দিষ্ট সময় পরপর অভিভাবক সভার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের অগ্রগতি তুলে ধরা হয় এবং তাদের করণীয় বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া হয়। এতে শিক্ষক ও অভিভাবকদের মধ্যে সমন্বয় বাড়ার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের সার্বিক উন্নয়নেও ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
টিম শংকরপুরের শিক্ষা কার্যক্রম কেবল পাঠ্যবইকেন্দ্রিক নয়। শিক্ষার্থীদের মধ্যে সততা, সামাজিক দায়বদ্ধতা, দেশপ্রেম, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও মানবিক মূল্যবোধ গড়ে তুলতে নিয়মিত সচেতনতামূলক আলোচনা, দলীয় কার্যক্রম ও অনুপ্রেরণামূলক সেশনের আয়োজন করা হয়। পাশাপাশি মাসিক মূল্যায়ন, মৌখিক পরীক্ষা, মেধা যাচাই এবং ফলাফল বিশ্লেষণের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। ভালো ফল করা শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করার পাশাপাশি পিছিয়ে পড়াদের জন্য বিশেষ সহায়তার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
সংগঠনের সদস্যরা জানান, ভবিষ্যতে একটি সমৃদ্ধ পাঠাগার প্রতিষ্ঠা, তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা কার্যক্রম চালু, দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের শিক্ষা সহায়তা, ক্যারিয়ার গাইডলাইন এবং দক্ষতা উন্নয়নমূলক প্রশিক্ষণ চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
স্থানীয় অভিভাবক ও সচেতন মহলের মতে, গ্রামীণ পর্যায়ে সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে পরিচালিত এমন উদ্যোগ খুবই বিরল। এই উদ্যোগের ফলে অনেক শিক্ষার্থীর পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ বেড়েছে, বিদ্যালয়ে নিয়মিত উপস্থিতি বৃদ্ধি পেয়েছে এবং অভিভাবকদের মধ্যেও শিক্ষার গুরুত্ব সম্পর্কে নতুন সচেতনতা তৈরি হয়েছে।
শিক্ষাকে কেন্দ্র করে একটি আলোকিত, সুশৃঙ্খল ও মানবিক সমাজ গড়ে তোলার যে লক্ষ্য নিয়ে টিম শংকরপুর যাত্রা শুরু করেছে, তা ইতোমধ্যেই আশাব্যঞ্জক সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা পেলে এই উদ্যোগ ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত হবে এবং গ্রামীণ শিক্ষার উন্নয়নে একটি অনুসরণযোগ্য মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাবে।
ফম/এমএমএ/



