সৌদিতে ১৪ বছর কারাগারে চাঁদপুরের শহিদুল্লাহ, সরকারের হস্তক্ষেপ চায় পরিবার

কচুয়া (চাঁদপুর): জীবিকার তাগিদে ২০০৮ সালে সৌদি আরবে পাড়ি জমান চাঁদপুরের কচুয়া উপজেলার তফিরা গ্রামের সহজ-সরল প্রকৃতির মো. শহিদুল্লাহ। চার বছর পর ছুটি কাটিয়ে পুনরায় কর্মস্থলে যাওয়ার পর থেকেই শুরু হয় তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি। দীর্ঘ ১৪ বছর ধরে তিনি সৌদি আরবের কারাগারে বন্দি জীবন কাটাচ্ছেন। মাথার ওপর ঝুলে আছে মৃত্যুদণ্ডের খড়্গ। প্রিয় মানুষটির দীর্ঘ অনুপস্থিতি ও ফাঁসির আশঙ্কায় চরম মানবেতর জীবনযাপন করছে তাঁর পরিবার।

পরিবার সূত্রে জানা যায়, ২০১৩ সালের ২৪ জুলাই থেকে সৌদি আরবের দাম্মাম কারাগারে বন্দি রয়েছেন শহিদুল্লাহ। বাংলাদেশ দূতাবাস, রিয়াদের ২০২৩ সালের ২৪ জানুয়ারির একটি চিঠি থেকে জানা যায়, এক সৌদি নাগরিককে (জাকী আল আশুর) হত্যার অভিযোগে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। বিচার প্রক্রিয়ার পর তাঁর বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় আসে এবং বর্তমানে রায় কার্যকরের অপেক্ষায় তিনি দাম্মাম কারাগারে আটক রয়েছেন।

শহিদুল্লাহর পরিবারে রয়েছেন তাঁর ৭৫ বছর বয়সি বৃদ্ধা মা খুশিদা বেগম, স্ত্রী পেয়ারা বেগম, ছেলে জিহাদ (২২) এবং মেয়ে ফিয়া আক্তার (১৭)। ১৪ বছর ধরে পরিবারটির জীবনে কোনো স্বস্তির খবর আসেনি। বৃদ্ধা মা প্রতিদিন ছেলের শোকে চোখের জল ফেলছেন।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে শহিদুল্লাহ স্ত্রী পেয়ারা বেগম বলেন, আমার স্বামী যখন কারাগারে যান, তখন ছেলের বয়স ছিল মাত্র ৭ বছর। তাঁর গ্রেপ্তারের পর থেকেই সংসারের অভাব-অনটন শুরু হয়। বাধ্য হয়ে মাত্র ১৪ বছর বয়সে পরিবারের ভরণপোষণের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতে হয় আমার ছেলেকে। শৈশব-কৈশোরের আনন্দ হারিয়ে সে কঠিন বাস্তবতার সঙ্গে লড়াই করেছে। সরকারের কাছে আমার স্বামীর প্রাণভিক্ষা চাই, আমার স্বামীকে ফিরিয়ে দিন।

ছেলের কষ্টের কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন বৃদ্ধা মা খুশিদা বেগমও। তিনি বলেন, ছেলের জন্য কাঁদতে কাঁদতে দুই চোখ প্রায় অন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। আমি বৃদ্ধ হয়ে গেছি, মৃত্যুর আগে আমার ছেলেকে এক নজর দেখতে চাই। আমার বুকে ফিরিয়ে দাও শহিদুল্লাহকে।

শারীরিক ও মানসিকভাবে ভেঙে পড়া ছেলে জিহাদ হোসেন বলেন, ১৪ বছর ধরে বাবা কারাগারে। আম্মা অনেক কষ্ট করে সংসার চালাচ্ছেন। আমি অনেক ছোট বয়সেই কাজে নামতে বাধ্য হয়েছি। এখন প্রায়ই অসুস্থ হয়ে পড়ি, আগের মতো কাজও করতে পারি না। আমি সরকারের কাছে বিনীত অনুরোধ করছি, আমার বাবাকে যেন ফিরিয়ে দেওয়া হয়। আমার বাবা সম্পূর্ণ নির্দোষ, তাঁকে অন্যায়ভাবে ফাঁসানো হয়েছে।

প্রতিবেশীরা জানান, শহিদুল্লাহ অত্যন্ত সহজ-সরল মানুষ ছিলেন। পড়ালেখা না জানা এই প্রবাসীকে পাকিস্তানি এক ব্যক্তির সঙ্গে জড়িয়ে মিথ্যা অভিযোগে আইনি ফাঁদে ফেলা হয় এবং দীর্ঘদিন ধরে তার ওপর নির্যাতন চালানো হয়।

সৌদি আরবের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে শহিদুল্লাহর বিষয়টি মানবিক দৃষ্টিতে বিবেচনা করতে এবং তাঁকে প্রয়োজনীয় আইনি সহায়তা দিয়ে দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনতে বর্তমান সরকার ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জোরালো হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তাঁর পরিবার।
ফম/এমএমএ/

মো. রাছেল | ফোকাস মোহনা.কম