শেখ কামাল : এক বহুমুখী প্রতিভার নাম

এস ডি সুব্রত।। পিতার জেল জুলুম আর সংগ্রামী জীবন দেখে দেখে বেড়ে উঠা  শেখ কামালেরও স্বপ্ন ছিল দেশ ও দেশের মানুষের জন্য কিছু করা । ইতিহাসের কিছু ক্ষণজন্মা মানুষকে ঘায়েল করার জন্য  সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় শক্তি ব্যয়ের মাধ্যমে হেয় করার প্রয়াস চালানো হয়েছিল ।আর সেই ঘৃণ্য প্রয়াসের তালিকায় প্রথম নামটি শেখ কামাল। বিভিন্ন অপপ্রচারের মাধ্যমে পরিকল্পিতভাবে তাকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা হয়েছিল যা এই উপমহাদেশে নজীরবিহীন ।
মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, বিশিষ্ট ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব , জাতির জনকের জ্যেষ্ঠ পুত্র বীর মুক্তিযোদ্ধা শেখ কামালের আজ ৭২ তম জন্মবার্ষিকী ‌। বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী শেখ কামাল ১৯৪৯ সালের ৫ আগস্ট গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায়  জন্ম গ্রহন করেন  এবং ১৯৭৫ এর ১৫ ই আগস্ট ঘাতকদের হাতে নির্মমভাবে নিহত হন । পঁচাত্তরের পনেরোই আগস্ট নির্মম হত্যাকাণ্ডের প্রথম শহীদ হয়েছিলেন শেখ কামাল । আমি শেখের ছেলে কামাল বলে পরিচয় দেয়ার পর বরখাস্ত মেজর বজলুল হুদা স্টেনগান দিয়ে গুলি করে । হাবিলদার কুদ্দুস সিকদারের আদালতের সাক্ষ্য থেকে জানা যায় , বজলুর হুদা স্টেনগান দিয়ে গুলি করলে শেখ কামাল ছিটকে অভ্যর্থনা কক্ষে গিয়ে পড়ে । তখন পূনরায় সেখানে তাকে গুলি করে হত্যা করা হয় । সৃষ্টিশীল প্রতিভার অধিকারী তারুণ্যের প্রতীক শেখ কামাল ঢাকা শাহীন স্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজ বিজ্ঞান বিভাগ থেকে বি এ অনার্স পাস করেন । শেখ কামাল সাংস্কৃতিক অঙ্গনের পরিচিত সংগঠন ছায়ানটের সেতার বাদক বিভাগের ছাত্র ছিলেন ।  স্বাধীনতা পরবর্তী বিপর্যস্ত সময়ে মঞ্চ নাটক আন্দোলনের একজন প্রথম সারির সংগঠক ছিলেন তিনি । শেখ কামাল ঢাকা থিয়েটারের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন । শৈশব  থেকেই   ফুটবল ক্রিকেটসহ  বিভিন্ন খেলাধুলা য়  পারদর্শী ছিলেন । এ উপমহাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় ক্রিড়া সংগঠন আবাহনী ক্রিড়া চক্রের  প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন শেখ  কামাল ।
দেশের ক্রিড়াঙ্গনের উন্নয়নে তার রয়েছে অসামান্য অবদান ।  ১৯৭৫ সালের ১৪ জুলাই দেশবরেণ্য এথলেট সুলতানা খুকু কে বিয়ে করেন তিনি । তিনি ছাত্রলীগের বড় পদে না থেকেও সক্রিয়  কর্মী ছিলেন । ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে ও একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন । মুক্তিযুদ্ধের সময় শেখ কামাল মুক্তিযুদ্ধের  প্রধান সেনাপতি জেনারেল এম এ জি ওসমানীর এডিসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন । তিনি সেনাবাহিনীর কমিশন্ড প্রাপ্ত চৌকস সেনা অফিসার ছিলেন।
দেশ স্বাধীনের পর সেনাবাহিনীর চাকরি ছেড়ে আবার  পড়া লেখায় ফিরে যান । পনের আগস্ট মৃত্যুর পূর্বে তিনি সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের এম এ শেষ পর্বের পরীক্ষা দিয়েছিলেন ।  তারুণ্যের অগ্রপথিক শেখ কামাল আজীবন এদেশের তরুনদের সামনে একটা নতুন দিগন্ত উন্মোচনের চেষ্টা করে গেছেন । শেখ কামাল আবাহনী ক্রিড়া  চক্রের  মাধ্যমে বাংলাদেশে আধুনিক ফুটবলের সূচনা করেছিলেন এবং ফুটবলের আধুনিক জার্সি এবং সু এর সূচনা করেছিলেন ।  তিনি মঞ্চ নাটকের অভিনেতা ছিলেন । তার হাত ধরে এদেশে যাত্রা করে ব্যান্ড সঙ্গীত । যুদ্ধের সময় সারাদিন কঠোর পরিশ্রম শেষে অফিসার্স মেসে দেশাত্মবোধক গান গেয়ে সহকর্মীদের উজ্জিবীত রাখতেন । বন্ধু শিল্পীদে নিয়ে গড়ে তুলেছিলেন  স্পন্দন শিল্পীগোষ্ঠী ।
তিনি আধুনিক ক্রিড়া ও সাংস্কৃতিক অগ্রযাত্রা পথিকৃৎ ছিলেন । শেখ কামালের স্মৃতি চারণ করতে গিয়ে শেখ মুজিব তার অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে লিখেছেন,  “একদিন সকালে আমি ও রেণু বিছানায় গল্প করছিলাম । হাচু ( শেখ হাসিনা) এবং কামাল নীচে খেলছিল ।  হাচু মাঝে মাঝে খেলা ফেলে আমার কাছে আসে আর আব্বা আব্বা বলে  ডাকে । কামাল চেয়ে থাকে । এক সময় কামাল হাসিনা কে বলছে , হাচু আপা তোমার আব্বাকে আমি একটু আব্বা বলি । আমি আর রেণু  দুজনেই শুনলাম । আস্তে আস্তে বিছানা থেকে উঠে গিয়ে ওকে কোলে নিয়ে বললাম , আমি তো তোমারও আব্বা “। পনের আগস্টের নির্মম হত্যাকাণ্ডে শেখ কামাল নিহত না হলে বাংলাদেশ পেতো একজন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী একজন সংগঠক  ও দেশপ্রেমিক নেতা ।
লেখক: কবি ও প্রাবন্ধিক, সুনামগঞ্জ।
০১৭১৬৭৩৮৬৮৮ ।
sdsubrata2022@gmail.com

ফোকাস মোহনা.কম