অকৃত্রিম ভালবাসার নাম মা

এস ডি সুব্রত।। মা যখন ছিলেন তখন বাড়িতে গেলে অন্যরকম আনন্দ পেতাম। দুনিয়ার আর সব ভুলে যেতাম। আর এখন বাড়িতে গেলেও সে আবেগ উচ্ছ্বাস কাজ করে না। এরই নাম মা। আগে ছোট খাট যেকোন অনুষ্ঠান হলে বাড়িতে যেতাম। অনুষ্ঠান ছাপিয়ে মনের মধ্যে লুকিয়ে থাকতে একরাশ ভাললাগা আর মায়ের কাছাকাছি থাকা। আর এখন গুরুত্বপূর্ণ কিছু থাকলেও বাড়ি যেতে তেমন আবেগ উচ্ছ্বাস কাজ করে না কেন জানি। মা হচ্ছে অকৃত্রিম ভালবাসার নাম,পরম নির্ভরতার জায়গা আর সবচেয়ে ভাল বন্ধু। দূঃখ কিংবা সুখে সব সময় যে পাশে থাকে নিঃস্বার্থভাবে সে হচ্ছে মা। মায়ের তুলনা শুধুই মা।মাকে ভালবাসতে আর শ্রদ্ধা নিবেদন করতে কোন দিনক্ষণের প্রয়োজন হয় না। তবু মায়ের প্রতি ভালবাসার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে প্রতি বছর বিশ্ব ব্যাপী পালিত হয় মা দিবস।মে মাসের দ্বিতীয় রবিবার পালিত হয় বিশ্ব মা দিবস। যুগে যুগে কবি লেখকগণ মাকে নিয়ে লিখেছেন হাজারো গল্প কবিতা উপন্যাস প্রবন্ধ। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম তার ” মা ” কবিতায় মায়ের স্বরুপ বর্ণনা করেছেন এভাবে——
“যেখানেতে দেখি যাহা
মা এর মতন আহা
একটি কথায় এত সুধা মেশা নাই,
মায়ের মত এত
আদর সোহাগ পেতে
আর কোনখানে আর কেহ পাইবে ভাই!
হেরিলে মায়ের মুখ
দূরে যায় সব দূঃখ
মায়ের কোলেতে শুয়ে জুড়ায় প্রাণ,
মায়ের শীতল কোলে
সকল যাতনে ভুলে
কতনা সোহাগে মাতা বুকটি ভরান। ”
মায়ের তুলনা শুধুই মা।সবাই ভুলে যেতে পারে, দূরে সরে যেতে পারে সময়ের ব্যবধানে। কিন্তু মা কোন অবস্থাতেই সন্তান কে ছেড়ে যায় না, আগলে রাখে অকৃত্রিম ভালবাসায়,পরম মমতায়।
মায়ের জন্য কোন দিবসই যথেষ্ট নয়। তবু মা দিবস পালিত হয় বিশ্বব্যাপী।মা দিবসের ইতিহাস খোজলে নানো তথ্য বেড়িয়ে আসে। ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায় মা দিবসের সূত্রপাত প্রাচীন গ্রীসের সিবেলের আরাধনা, রোমান দেবী জুনোর আরাধনা এবং ইউরোপ আফ্রিকা ও যুক্তরাজ্যের মাদারিং সান ডে র মতো বেশ কিছু অনুষ্ঠান।অন্য ইতিহাস মতে প্রাচীন গ্রীসে যেখানে প্রতি বসন্তকালে একটি দিন দেবতাদের মা ক্রোনাসের সহধর্মিণী রিয়া’ র উদ্দেশ্যে মা দিবস উদযাপন করা হতো। যুক্তরাষ্ট্রে মা দিবসের সূচনা হয় আমেরিকার সমাজকর্মী জুলিয়া ওয়ার্ড হোই নাম্নী এক নারীর হাত ধরে।১৮৭০ সালে আমেরিকার গৃহযুদ্ধে পৈশাচিকতা মাত্রা ছাড়িয়ে গেলে জুলিয়া শান্তির অন্বেষায় একটা ঘোষনা পত্র লেখেন যা ‘ মাদার্স ডে প্রোক্লেমেশন ‘ নামে পরিচিত ছিল। এরপর যুদ্ধ শেষে অনাতদে সেবা আর একত্র করনের কাজে নিয়োজিত হন মার্কিন সমাজকর্মী আনা রিভিস জার্ভিস ও তার মেয়ে আনা মেরী জার্ভিস।তখন তারা জুলিয়া ঘোষিত মা দিবস পালন করতে শুরু করেন।১৯০৫ সালের ৫ মে আনা বিবিসি জার্ভিস মারা গেলে মেয়ে আনা মেরী জার্ভিস মায়ের সম্মানে সরকারি ভাবে মা দিবস পালনের প্রচারনা চালান।এর তিন বছর পর ১৯০৮ সালের দশ মে পশ্চিম ভার্জিনিয়ায় আন্দ্রেউজ মেথডিস্ট এপিসকোপান চার্চে আনুষ্ঠানিক ভাবে প্রথম মা দিবস পালিত হয়।আনা রিভিস জার্ভিস সাদা কারনিশনের ফূল বেশি ভালবাসতেন।। নিজের মা এবং সব মায়েদের সম্মানে চার্চে উপস্থিত চার্চে উপস্থিত সকল মায়েদের সাদা কারনেশন ফুল উপহার দেন মেয়ে আনা মেরি জার্ভিস।১৯১২ সালে আনা মেরি জার্ভিস ” মাদার্স ডে ইন্টারনেশনাল এসোসিয়েশন” গড়ে তোলেন।আনা মেরি জার্ভিস এ দিনটিকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দিতে ব্যাপক প্রচারণা চালান। শেষে ১৯১৪ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন মে মাসের দ্বিতীয় রবিবার কে মা দিবস এবং জাতীয় ছুটির দিন হিসেবে ঘোষণা করেন। এরপর থেকে সরকারি ভাবে মা দিবস পালিত হতে থাকে। এক সময় মা দিবস পালন বানিজ্যিক হয়ে উঠলে আনা মেরি জার্ভিস এর প্রতিবাদ করে গ্রেফতার হন এবং নিজের সমস্ত সম্পদ ব্যয় করেন। প্রকৃত পক্ষে আনা মেরি জার্ভিস কেই মা দিবসের সত্যিকারের প্রতিষ্ঠাতা বলে গণ্য করা হয়। বিশ্বের সকল মা থাকুক শ্রদ্ধা সম্মান আর সন্তানের ভালবাসায়।সকল মায়েদের প্রতি শ্রদ্ধা আর ভালবাসা।

লেখক: কবি ও প্রাবন্ধিক, সুনামগঞ্জ।
০১৭১৬৭৩৮৬৮৮ ।
sdsubrata2022@gmail.com

ফোকাস মোহনা.কম