৩’শ কোটি টাকা নিয়ে হাজীগঞ্জের এক বিএনপি নেতা স-পরিবারে উধাও

ছবি: সংগ্রহীত।

হাজীগঞ্জ (চাঁদপুর): হাজীগঞ্জের মো. ইসমাঈল হোসেন রিগ্যান নামের এক বিএনপি নেতা অভিনব কায়দায় আত্মীয়-স্বজন, নিজ এলাকাসহ বিভিন্ন এলাকা ও চট্টগ্রামের কয়েকশ মানুষের ‘তিনশ’ কোটিরও বেশি টাকা হাতিয়ে নিয়ে স-পরিবারে উধাও হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। ধারণা করা হচ্ছে, বর্তমানে তিনি তার পরিবারের লোকজনকে নিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ‘দুবাই’ এ অবস্থান করা করছেন বলে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

মো. ইসমাইল হোসেন রিগ্যান হাজীগঞ্জ উপজেলা বিএনপির নির্বাহী কমিটির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক পদে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি উপজেলার ৫নং হাজীগঞ্জ সদর ইউনিয়নের অলিপুর গ্রামের পাটওয়ারী বাড়ির মো. মফিজুল ইসলাম পাটওয়ারীর বড় ছেলে। তিনি কয়েক বছর ধরে চট্টগ্রামের খুলশী এলাকায় স-পরিবারে বসবাস করে আসছেন এবং সেখানেই অফিস স্থাপন করে রেন্ট-এ কার, ঠিকাদারীসহ বিভিন্ন ব্যবসা পরিচালনা করতেন।

জানা গেছে, মো. ইসমাইল হোসেন রিগ্যান চট্টগ্রামের খুলশী এলাকায় রেন্ট-এ কার বা ভাড়ায় গাড়ি লাগানো, সড়ক ও জনপথ বিভাগের ঠিকাদারীসহ নানা ব্যবসার নামে মানুষের বিশ্বাস অর্জনের করেন। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে তিনি তার নিকট আত্মীয়-স্বজন, এলাকার লোকজন, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার কয়েকশ মানুষের কাছ থেকে কোটি কোটি নগদ টাকা ও ভাড়ায় চালানোর কথা বলে কয়েকশ গাড়ি সংগ্রহ করেন।

পরে মানুষের কাছ থেকে নেওয়া ওইসব বিক্রি করে দেন। এমনকি একেকটি গাড়ি ৪/৫ জনের কাছে বিক্রি করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়াও তিনি তার বসবাসকৃত ফ্ল্যাটটি একাধিক ব্যক্তির কাছে বিক্রি করেন। তিনি যে বাড়িতে বসবাস করতেন, সেই বাড়ির অপর এক ফ্ল্যাটের এক বাসিন্দার মার্সিডিজ বেঞ্জ গাড়ি বিক্রি করে দেন পানির দরে। পরে তিনি ওই এলাকা থেকে গা-ঢাকা দেন।

স্থানীয় সংবাদমাধ্যম সূত্র জানা গেছে, রিগ্যান বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি চট্টগ্রামে কর্ণফুলী টানেল, মাতারবাড়ি বিদ্যুৎ কেন্দ্র, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক চার লেন প্রকল্প, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, চট্টগ্রাম ইপিজেডসহ দেশি বিদেশী বড় বড় কোম্পানিকে ভাড়ায় গাড়ি দেয়ার ব্যবসা শুরু করেন। এজন্য তিনি বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে মাসিক ভিত্তিতে কার, জিপসহ বিভিন্ন গাড়ি ভাড়ায় নিয়ে সেগুলো বিভিন্ন কোম্পানির কাছে ভাড়া দিতেন।

চট্টগ্রামে উন্নয়ন কর্মকান্ডের পরিধি বৃদ্ধির সাথে রিগ্যানেরও ব্যবসার পরিধি ক্রমে বাড়তে থাকে। বাড়তে থাকে আয়-রোজগার। পরবর্তীতে তিনি দক্ষিণ খুলশীর তিন নম্বর সড়কে সানম্যার রয়েল রিজ নামের অভিজাত এ্যাপার্টমেন্টে ২২৮৯ বর্গফুটের ডি-৪ ফ্ল্যাট কিনে তাতে বসবাস করতে থাকেন। দুই কোটি টাকারও বেশি দামের ফ্ল্যাটটি সাজাতে বেশ বড় অংকের টাকা ব্যয়ও করেন তিনি।

এর পাশাপাশি রিগ্যান ওই এলাকার ৪ নম্বর সড়কে ৫৭০ নম্বর বাড়িতে অফিস স্থাপন করেন। গ্লোবাল কর্পোরেশন নামের কোম্পানি গঠন করে ব্যবসা কার্যক্রম পরিচালনা করতে থাকেন। বছরখানেক ধরে তার চলন বলন এবং কাজ-কর্মে বেশ পরিবর্তন আসে। যে গাড়ির জন্য মাসিক সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা ভাড়া পাওয়া যায় সেই গাড়ি তিনি ৭০/৭৫ হাজার টাকায় ভাড়া নিয়ে নিতেন। যার ফলে বেশ সুনাম কুড়িয়েছেন তিনি।

ইসমাঈল হোসেন রিগ্যানের কাজে সন্তুষ্ট হয়ে ডাক্তার, পুলিশ, ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে অসংখ্য মানুষ তাকে মাসিক ভিত্তিতে ভাড়ায় গাড়ি দিতে থাকে। প্রতি মাসের নির্দিষ্ট তারিখে ভাড়ার টাকা ব্যাংকে বা নগদে পেয়ে যাওয়ায় বহু গাড়ির মালিক এক বছরেও তার গাড়ির চেহারা দেখেননি। সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী তিনি শহরের বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে ১৪২টি কার ও জিপ গাড়ি নিয়ে ভাড়ায় পরিচালনা করছিলেন।

এক পর্যায়ে রিগ্যান গাড়িগুলো বিক্রি করতে শুরু করেন। এই বিক্রির ক্ষেত্রেও অভিনব প্রতারণার আশ্রয় নেন তিনি। গাড়ির রেজিস্ট্রেশন স্লিপে (ব্লু বুকে) থাকা মালিকের নাম এবং ছবি ব্যবহার করে তিনি নকল এনআইডি তৈরি করে। ওই এনআইডি দিয়ে তিনি গোপনে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে পানির দামে গাড়ি বিক্রি করতে শুরু করেন। তিনি একেকটি গাড়ি এমনকি তারা বসবাসকৃত ফ্ল্যাটটিও ৪/৫ জনের কাছে বিক্রি করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

শুধু গাড়িই নয়, রিগ্যান মানুষের কাছ থেকে নগদও কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। গাড়ি ব্যবসা, ঠিকাদারী ব্যবসাসহ নানা ব্যবসায় পার্টনার করার কথা বলে তিনি বহু মানুষের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা নগদ নিয়েছেন। এক কোটি টাকায় প্রতিমাসে দুই লাখ টাকা ব্যবসার লোভনীয় অফার দিয়ে বহু মানুষ থেকে দশ বিশ কোটি টাকা পর্যন্ত নিয়েছেন তিনি। নিজের এ্যাপার্টমেন্টের এক ব্যক্তির কাছ থেকে তিনি নিয়েছেন দশ কোটি টাকা।

এ ভাবে বিভিন্নজনের কাছ থেকে ইসমাঈল হোসেন রিগ্যান নগদে এবং গাড়ি বিক্রি করে ৩শ’ কোটিরও বেশি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে বলেও দাবিনামার খাতায় উল্লেখ করা হয়েছে। প্রায় প্রতিদিনই পাওনাদাররা সানমার রয়েল রিজ বাড়িতে ভিড় করছেন। আর লম্বা হচ্ছে পাওনাদারদের তালিকা। অথচ তার কোনো হদিস পাওয়া যাচ্ছে না। তবে পুলিশ নিশ্চিত হয়েছে যে, ইসমাইল হোসেন রিগ্যান ইতোমধ্যে পরিবার পরিজন নিয়ে দুবাই পাড়ি জমিয়েছে।

গত রোববার ইসমাঈল হোসেন রিগ্যানের গ্রামের বাড়ি হাজীগঞ্জ সদর ইউনিয়নের অলিপুর গ্রামের পাটওয়ারী বাড়ি সরজমিন পরিদর্শন করে দেখা গেছে, তার দোতলা সম্পন্ন তিনতলা বিশিষ্ট শীতাতপ নিয়ন্ত্রীত একটি আলিশান বাড়ি তালাবদ্ধ অবস্থায় রয়েছে। এ সময় কথা হয়, তার বাড়ি ও এলাকার লোকজনের সাথে। তারা জানান, রিগ্যান, তার বাবা-মা, স্ত্রী ও দুই সন্তান, দুই ভাই ও ভাইদের স্ত্রী, সন্তান এবং এক বোনসহ দুবাই গেছেন।

বাড়ির সর্ম্পকীয় চাচা জাহাঙ্গীর হোসেন জানান, গত চার-পাঁচ বছর যাবৎ রিগ্যান স-পরিবারে চট্টগ্রামে স্যাটেল। তবে নিয়মিত বাড়িতে আসা-যাওয়া করতো। ১০/১৫ দিন আগেও বাড়িতে এসেছিল রিগ্যান। এসময় তার বাবা-মা, ভাই, ভাইদের স্ত্রী, বোন ও সন্তানসহ তার নিকট আত্মীয়-স্বজনেরা এসেছিল। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, টাকা নেওয়ার বিষয়ে আমরা কিছু জানিনা। তবে টিভির খবরে দেখেছি এবং কিছু লোক বাড়িতেও এসেছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তার বাড়ির সর্ম্পকীয় অপর এক চাচা জানান, তাঁর নিকট আত্মীয়-স্বজনেরও প্রায় আড়াই কোটি টাকা রয়েছে রিগ্যানের প্রতিষ্ঠানে। এছাড়াও ব্যবসার কথা বলে বলাখালের এক ব্যক্তির ৪ কোটি টাকা, সাতবাড়িয়ার এক ব্যক্তির ৪৭ লাখ টাকা, মুন্সীর হাটের এক ব্যক্তির ৪২ লাখ টাকাসহ বেশ কিছু মানুষের কয়েক কোটি টাকা নিয়েছে বলে স্থানীয় লোকমুখে জানা গেছে। তবে কেউ আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দিতে রাজি হয়নি।

ইসমাঈল হোসেন রিগ্যানের বিষয়ে হাজীগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এম.এ রহিম পাটওয়ারীর সাথে মুঠোফোনে কথা হলে তিনি সংবাদকর্মীদের জানান, তার বিরুদ্ধে উপযুক্ত প্রমাণ পেলে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

হাজীগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোহাম্মদ জোবাইর সৈয়দের সাথে কথা হলে তিনি বলেন, সংবাদ মাধ্যমের বিষয়টি জানতে পেরেছি। তবে আমাদের কাছে কোন অভিযোগ আসেনি।

চট্টগ্রামের খুলশী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সন্তোষ চাকমা সংবাদকর্মীদের বলেন, তিনি (রিগ্যান) বড় প্রতারক। অভিনব পন্থায় নানাভাবে সে মানুষের সাথে প্রতারণা করেছে। আমাদের থানায় তার বিরুদ্ধে একটি মামলা এবং তিনটি জিডি রেকর্ড হয়েছে। তিনি বলেন, রিগ্যান যে এ্যাপার্টমেন্টে থাকেন সেখানের কয়েকজন বড় ব্যবসায়ীর কাছ থেকেও বহু টাকা সে হাতিয়ে নিয়েছে। তারা মামলা করতে আসবেন বলে জানিয়েছেন।

এ সময় ওসি সন্তোষ চাকমা আরো বলেন, আমরা প্রাথমিকভাবে ১৮২ কোটি টাকা প্রতারণার তথ্য পেয়েছি। আরো কেউ প্রতারিত হয়েছে কিনা তা অভিযোগ করলে জানতে পারবো। তিনি প্রতারিতদের সকলকেই পুলিশের শরণাপন্ন হয়ে প্রকৃত তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপনের অনুরোধ জানিয়েছেন।

অপর দিকে রিগ্যান দুবাইয়ে অবস্থানের বিষয়টি বিভিন্ন সূত্র নিশ্চিত করেছে। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, এখানে অসংখ্য মানুষের সাথে প্রতারণা করার মাধ্যমে কয়েকশ’ কোটি টাকা হাতিয়ে রিগ্যান বিপুল পরিমাণ অর্থ হুন্ডির মাধ্যমে দুবাইয়ে নিয়ে গেছে। রিগ্যানের (পাসপোর্ট নম্বর- বিওয়াই-০৫৯৬৬৯৮) তার স্ত্রী মুশিয়া নুর কলিকে (পাসপোর্ট নম্বর- ইএইচ-০০৭৪৯৭৭) সাথে নিয়ে অতি সম্প্রতি চট্টগ্রাম থেকে দুবাই চলে গেছেন।

পরবর্তীতে তার মা-বাবা এবং ভাইসহ পরিবারের অন্যান্য সদস্যদেরও পার করে নেয়া হয়। অপর একটি সূত্র বলেছে, রিগ্যান এবং তার পরিবারের সদস্যরা দুবাই থেকে ইউরোপ কিংবা আমেরিকায় পাড়ি জমানোর চেষ্টা করছে। পুলিশ বলেছে, পুরো বিষয়টি তারা তদন্ত করছে। রিগ্যানকে দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেয়া হবে।
ফম/এমএমএ/

স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট | ফোকাস মোহনা.কম