হুমায়ূন আহমেদ: এক অনন্য শব্দকারিগর (নিবন্ধ)

।। এস ডি সুব্রত।। হুমায়ূন আহমেদ বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় লেখক ছিলেন । উপন্যাস লিখে জনপ্রিয় হলেও  শুরুটা ছিল কবিতা দিয়ে। এরপর নাটক, শিশুসাহিত্য, বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী, চলচ্চিত্র পরিচালনা থেকে শিল্প-সাহিত্যের প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি রেখে গেছেন প্রতিভার স্বাক্ষর। তার নাটক ,উপন্যাস ছিল এক অনন্য বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত । তার লেখায় অন্যরকম ছোঁয়া পাওয়া যায়।
নন্দিত কথাসাহিত্যিক  হুমায়ূন আহমেদের জন্ম ১৩ নভেম্বর ১৯৪৮। নেত্রকোনা জেলার মোহনগঞ্জে নানার বাড়িতে জন্মেছেন এই খ্যাতিমান  শব্দের কারিগর । তুমুল জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ মরণব্যাধি ক্যানসারের সঙ্গে লড়াইয়ে হার মানেন শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের একটি হাসপাতালে । বাবা ফয়জুর রহমান আহমেদ ও মা আয়েশা ফয়েজের প্রথম সন্তান তিনি। তিন ভাই ও দুই বোনের মধ্যে তিনি সবার বড়। কথাসাহিত্যিক জাফর ইকবাল তার ছোট ভাই। সবার ছোট ভাই আহসান হাবীব নামকরা কার্টুনিস্ট ও রম্যলেখক।
স্কুলজীবনে হুমায়ূন আহমেদকে বাবার চাকরিস্থল কুমিল্লা, সিলেট, বগুড়া, পঞ্চগড়সহ বিভিন্ন জেলায় বাস করতে হয়। তিনি ১৯৬৭ সালে বগুড়া জিলা স্কুল থেকে প্রবেশিকা (রাজশাহী বিভাগে মেধাতালিকায় দ্বিতীয়), ১৯৬৯ সালে ঢাকা কলেজ থেকে এইচএসসি এবং পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
স্নাতকোত্তর পাস করে প্রথমে প্রভাষক হিসেবে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও পরে অধ্যাপক হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগে যোগ দেন। পরবর্তীতে ১৯৮২ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ডাকোটা স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে কেমিস্ট্রিতে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ছিলেন তিনি। লেখালেখিকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করে শিক্ষকতা থেকে অবসর নেন। শিল্প-সংস্কৃতির প্রসারে হুমায়ূন আহমেদ গাজীপুরে সদর উপজেলার পিরুজালি গ্রামে প্রতিষ্ঠা করেন ‘নুহাশ পল্লী’। নুহাশ পল্লীর নান্দনিক পরিবেশ  মানুষের মন কাড়ে সহজেই।
১৯৭২ সালে  প্রকাশিত হয় তার প্রথম উপন্যাস  ‘নন্দিত নরকে’  । এ বইটি  প্রকাশের পরই তার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে । উপন্যাস ও নাটকে তার সৃষ্ট চরিত্র বিশেষ করে ‘হিমু’, ‘মিসির আলী, ‘শুভ্র’ তরুণ-তরুণীদের কাছে হয়ে ওঠে অনুকরণীয় ।  এরপর  একে একে লীলাবতী, শঙ্খনীল কারাগার, বহুব্রীহি, নক্ষত্রের রাত, কোথাও কেউ নেই, এইসব দিনরাত্রি, দারুচিনি দ্বীপ, শুভ্র, আগুনের পরশমণি, শ্রাবণ মেঘের দিন, জোছনা ও জননীর গল্প, এসব উপন্যাস তাকে প্রচণ্ড জনপ্রিয়তা এনে দেয়। মৃত্যু অবধি তিন শতাধিক বই উপহার দিয়ে গেছেন হুমায়ূন। বাংলা সাহিত্যে তাঁর জনপ্রিয়তা ছিল রীতিমতো ঈর্ষণীয় ।চলচ্চিত্র নির্মাণেও  এই কথা সাহিত্যিক সাফল্যের স্বাক্ষর রাখেন । তার নির্মিত চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছে- শঙ্খনীল কারাগার, শ্রাবণ মেঘের দিন, দুই দুয়ারী, চন্দ্রকথা ও শ্যামল ছায়া যা ছিল দর্শকনন্দিত । তার চলচ্চিত্র দেখার জন্য মানুষ হুমড়ি খেয়ে  পড়ত ।  বহুমাত্রিক  প্রতিভার অধিকারী হুমায়ূন আহমেদ চলচ্চিত্র ও নাটকের জন্য  বেশ কিছু গানও লিখেছেন,নিজেই সুর দিয়েছেন । সেই গানগুলো বহুল সমাদৃত হয়েছিল  । হুমায়ূন আহমেদের লেখা বেশ কিছু গান‌‌‌ যেমন —
‘যদি মন কাঁদে তুমি চলে এসো’,  ‘‘ও আমার উড়াল পঙ্খীরে’, ‘এক যে ছিল সোনার কন্যা’, ‘আমার ভাঙ্গা ঘরে ভাঙ্গা বেড়া ভাঙ্গা চালার ফাঁকে’, ‘চাঁদনী পসর রাইতে যেন আমার মরণ হয়’ তুমুল জনপ্রিয়তা পেয়েছিল । কিছু গান মানুষের   মুখে মুখে ছিল এবং এখনও আছে । বাংলা সাহিত্যে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ১৯৯৪ সালে একুশে পদক লাভ করেন। এ ছাড়া বাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৮১), হুমায়ূন কাদির স্মৃতি পুরস্কার (১৯৯০), লেখক শিবির পুরস্কার (১৯৭৩), জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার (১৯৯৩ ও ১৯৯৪), বাচসাস পুরস্কার (১৯৮৮) লাভ করেন হুমায়ূন আহমেদ । ১৯৭৩ সালে হুমায়ূন আহমেদ প্রিন্সিপাল ইব্রাহিম খাঁর নাতনী গুলতেকিনের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। প্রথমপক্ষে এক ছেলে ও তিন মেয়ে রয়েছে। ১৯৯০ সালে তিনি অভিনেত্রী মেহের আফরোজ শাওনকে বিয়ে করেন। দ্বিতীয়পক্ষে দুই ছেলে রয়েছে। শাওনের সঙ্গে স্বামীর এ অসম বিয়ে কিছুতেই মেনে নিতে পারেননি গুলতেকিন। দাম্পত্য কলহের কারণে শেষপর্যন্ত ২০০৫ সালে তাদের বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে।
কৌতূহল আর রহস্য সম্পর্কে বলতে গিয়ে হুমায়ূন আহমেদ বলতেন  —  ‘রহস্যময় এই জগতের বিপুল রহস্যের অতি সামান্যই আমরা জানি। আমাদের উচিত এই সামান্য জ্ঞান নিয়েই তুষ্ট থাকা। বেশি জানতে না চাওয়া ।’  মানবমনের   রহস্যসম্ভারকে উপজীব্য করে তিনি উপহার দিয়েছেন ‘মিসির আলী’ সিরিজ। সেই রহস্যের মধ্যেও আছে বিজ্ঞান টপকে যাওয়া মনোবিজ্ঞান, আছে অতলস্পর্শী মানবতাবোধের রহস্যময় ছোঁয়া । হিমুকে দিয়েও অমীমাংসিত রহস্যের দ্বার  উন্মোচনের চেষ্টা করেছেন হুমায়ূন আহমেদ । নন্দিত কথাশিল্পী হুমায়ূন আহমেদ মানুষের মনের কথা বুঝতে পারতেন । তাইতো খুব সহজেই তাঁর লে মানুষের মনে নাড়া দিত গভীরভাবে। এ প্রসঙ্গে সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম সুন্দর একটা কথা বলেছেন ।
হুমায়ূন আহমেদের গল্পসমগ্র সম্পর্কে   সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলছেন, ‘আমার মনে হয়েছে, তিনি মানুষের মনের অনেক হদিস জানেন, আর সেগুলো আমাদের জানাতে পারেন।’ হুমায়ূন আহমেদের শরীরে ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে মারণব্যাধি ক্যানসার ধরা পড়ে। এরপর তিনি উন্নত চিকিৎসার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে যান। ২০১২ সালের ১৬ জুলাই সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাকে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়। ১৯ জুলাই বাংলাদেশ সময় রাত সাড়ে ১১টায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ২৩ জুলাই দেশে ফিরিয়ে আনা হয় হুমায়ূন আহমেদের মরদেহ। ২৪ জুলাই তাকে দাফন করা হয় নুহাশপল্লীতে। হুমায়ূন আহমেদ ছিলেন সৃজনশীলতা ও নান্দনিকতার এক অনন্য রুপকার । সৃজনশীলতার প্রায় সব শাখায় পাঠক ও দর্শকদের নিয়ে বিশাল এক সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন এই নন্দিত কথাসাহিত্যিক । তার লেখালেখি দিয়েই বাংলাভাষীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে বিশাল এক পাঠকসমাজ। বইয়ের প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়াতে হুমায়ূন আহমেদের জুড়ি মেলা ভার ।
লেখক: কবি ও প্রাবন্ধিক, সুনামগঞ্জ।
০১৭১৬৭৩৮৬৮৮ ।

ফোকাস মোহনা.কম