হিরোশিমার ধ্বংসযজ্ঞ (নিবন্ধ)

এস ডি সুব্রত।।  দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের নাম  হিরোশিমা । দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে  জাপানের হিরোশিমায় ১৯৪৫ সালের ৬ আগস্ট আমেরিকা কর্তৃক পারমাণবিক বোমা লিটলবয় ফেলা হয়েছিল । পৃথিবীর কোন যুদ্ধে   এটাই ছিল প্রথম পারমাণবিক বোমার ব্যবহার  ।কোন শান্তিপ্রিয় মানুষেরই যুদ্ধ কাম্য নয় । তবু যুগে যুগে যুদ্ধ চলে আসছে । নিজে বাঁচার জন্য ,অন্যকে ঘায়েল করার জন্য কিংবা আধিপত্য বিস্তারের লক্ষ্যে যুদ্ধ সংঘটিত হচ্ছে। তেমনি একটি ভয়ঙ্কর যুদ্ধ হচ্ছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ।এ যাবতকালে সংঘটিত যুদ্ধের মধ্য এটা ছিল সবচেয়ে ভয়ংকর ও ধ্বংসাত্মক যুদ্ধ ।
এডলফ হিটলার ও নাৎসি পার্টির জার্মানির রাজনৈতিক অধিগ্রহন  এবং জাপান সাম্রাজ্যের ১৯৩০ এর দশকে চীন প্রজাতন্ত্রে আক্রমন ‌ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের   অন্যতম কারন বলে জানা যায় । হিটলার পোল্যান্ডের রাষ্ট্রীয় সীমানায় ডানজিগ অঞ্চলে যোগাযোগের জন্য পোলিশ করিডর দাবি করলে ফ্রান্স ও ইংল্যান্ড বিরোধীতার হুমকি দেয় । জার্মান এই হুমকি অগ্রাহ্য করে পোল্যান্ড আক্রমন করলে শূরু হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ । মিত্র পক্ষের দেশ আমেরিকা প্রতিপক্ষকে আত্ম সমর্পণের মাধ্যমে যুদ্ধ জয়ের পথ খুঁজতেই জাপান আক্রমণ করে । আবার কোন কোন মতে , ইউরোপে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়ে গেলেও জাপান এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে থাকলে  আমেরিকা জাপানকে যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানায় । জাপান এ আহ্বান অগ্রাহ্য করলে আমেরিকার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যানের নির্দেশে আমেরিকা জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণ ঘটায় ।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ স্থায়ী হয়েছিল ১৯৩৯ থেকে ১৯৪৫  পর্যন্ত ৬ বছর ।এরকম  ভয়াবহতা এ যুদ্ধের পর বিশ্ববাসী আর দেখেনি ।  এ যুদ্ধে জাপানের হিরোশিমা  শহরে ‌যে ধ্বংসযজ্ঞ তা ভুলে যাবার নয় ।এই বোমা হামলার স্মরণে বিশ্ববাসী আজও  ৬ আগস্ট হিরোশিমা দিবস পালন করে । এ বোমার বিস্ফোরণে আনুমানিক হিরোশিমা শহরে এক লাখ চল্লিশ হাজার মানুষ মারা যায় । এ মৃত্যুর সংখ্যা বোমার বিস্ফোরনের সাথে সাথে মৃত্যুর পরিমাণ । পরবর্তীতে এ বোমার তেজস্ক্রিয়তায় আরো মানুষ মারা গিয়েছিল । আবার যারা বেঁচে ছিল তারা প্রচন্ড মানসিক ও শারীরিক যন্ত্রণার মধ্যে দিয়ে বাকি জীবন অতিবাহিত করেছিল । হিরোশিমার  নাম শুনলেই আঁতকে উঠে মানুষ । চোখের সামনে ভেসে উঠে ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডের নিষ্ঠুর চিত্র ।  হিরোশিমা শহরে ১৯৪৫ সালের ৬ আগস্ট সকাল ৮ টা ৪৫ মিনিটে আমেরিকার এলো বি-২৯ সুপার পোর্টেস নামক বিমান থেকে ফেলা হয়  লিটলবয় নামের পারমাণবিক বোমা । মূহুর্তের মধ্যে সারা শহরে আগুন ধরে যায় । বিস্ফোরণের দেড় কিলোমিটার এর মধ্যে যা ছিল পুড়ে ছাই । হাজার হাজার মানুষ পুড়ল । যারা বেঁচে ছিল তাদের  কারো পা নেই,কারো হাত নেই ,কারো চোখ অন্ধ । কেউ চিৎকার করছে পানির জন্য । ৪৮ হাজার বাড়িঘর পুড়ে ধ্বংস হল । হিচিয়ামা নদীর পানি হয়ে গেল উত্তপ্ত । এক লাখ চল্লিশ হাজার মানুষ মারা গেল দুই লাখ মানুষ চিরতরে পঙ্গু হয়ে গেল ।
কোন যুদ্ধে ব্যবহৃত প্রথম পারমাণবিক বোমা লিটলবয়ের ওজন ছিল চার হাজার কেজি, ইউরেনিয়াম ২৩৫, দৈর্ঘ্য ৯.৮৪ ফুট। বিস্ফোরণের মাত্রা ছিল ১৩ কিলোটন  টিএনটির সমতুল্য । এই বোমা বহনকারী বিমানের পাইলট ছিলেন কর্নেল পল টিবেটস । আঘাতের মূল লক্ষ্য ছিল শিমা সার্জিকেল ক্লিনিক ।  হিরোশিমায় যেখানে  লিটলবয় ফেলা হয়েছিল সেখানে  পরে নির্মিত হয়েছে পিস মেমোরিয়াল পার্ক ।জাপান‌ ১৪ আগস্ট নিঃশর্ত ভাবে আত্ম সমর্পণ করে । আত্ম সমর্পণের পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যান হোয়াইট হাউসের সামনে সমবেত জনতার উদ্দেশ্যে ভাষনে বলেন , এই দিনটি র জন্যই অপেক্ষা করছিলাম । আমরা জানতাম ফ্যাসিবাদ পরাস্ত হবেই । এর পরদিন জাপান সম্রাট হিরোহিতো রেডিও ভাষনে বলেন , ” আমাদের যদি লড়াই চালিয়ে যেতে হয় তা কেবল একটি জাতি হিসেবে চুড়ান্ত পতন এবং ধ্বংসই ডেকে আনবে না , পুরো মানব সভ্যতাকেও সম্পূর্ন নির্মূল করে দিতে পারে ” ।
সামরিক প্রভুত্বের মাধ্যমে সারা বিশ্বে আধিপত্য কায়েমের লক্ষ্যে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর  থেকেই পারমাণবিক বোমা তৈরি করতে থাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র । পারমাণবিক  বোমার অধিকারী হওয়ার ফলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সামরিক ক্ষেত্রে একক আধিপত্য অর্জন করে যুক্তরাষ্ট্র । এতে অন্যান্য দেশ পারমাণবিক বোমা তৈরির প্রতিযোগিতায় নামে । এই প্রতিযোগিতার  দৌড়ে রাশিয়া ,ব্রিটৈন , ফ্রান্স, চীন ,ভারত , পাকিস্তান ও উত্তর কোরিয়া পারমাণবিক বোমার অধিকারী হয় । অঘোষিত ভাবে ইসরাইলও পারমাণবিক বোমার অধিকারী ।  দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পারমাণবিক বোমা তৈরির যে প্রতিযোগিতা শুরু হয় তাতে বিশ্বের শান্তিকামী সাধারণ জনতা আতংকিত হয় । শান্তিপ্রিয় মানুষ বিশ্ব কে পারমাণবিক অস্ত্রের ভয়াবহ ধ্বংস থেকে ফিরিয়ে আনতে আন্দোলন শুরু করে । আন্দোলনের ফলশ্রুতিতে পারমাণবিক প্রতিযোগিতা বিস্তার রোধে  এনটিপি  ও  সিটিবিটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় ‌ কিন্তু সকল দেশের ঐক্য আর আন্তরিকতার অভাবে সে চুক্তি সফলতা লাভ করতে পারেনি ।
হিরোশিমায় মৃত্যু বরনকারী অধিকাংশই ছিল সাধারণ জনগণ । এমন মৃত্যুর শহর আর দেখতে চায়না বিশ্ববাসী ।আধুনিক সভ্য পৃথিবীতে দাঁড়িয়ে একটা যুদ্ধ বিহীন বিশ্ব গড়ার প্রত্যাশা করি ।
লেখক: কবি ও প্রাবন্ধিক, সুনামগঞ্জ।
বাংলাদেশ।
০১৭১৬৭৩৮৬৮৮ ।
Sdsubrata2022@gmail.com

ফোকাস মোহনা.কম