হাজীগঞ্জ (চাঁদপুর): চাঁদপুরের হাজীগঞ্জের কালচোঁ উত্তর ইউনিয়নের সিহিরচোঁ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক পদে অনিয়ম ও অবৈধভাবে নিয়োগের পর গত ১৭ বছর ধরে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন, এমন অভিযোগ ওঠেছে মো. জুলফিকার আলী মজমুদার নামের এক শিক্ষক বিরুদ্ধে। ওই সময়ে প্রধান শিক্ষক পদে প্রায় ২০ বছর দায়িত্বরত ছিলেন, নিয়োগপ্রাপ্ত মো. আ. হালিম। বর্তমানে তিনি সহকারী শিক্ষক পদে কর্মরত আছেন।
মো. আ. হালিম নামের ওই শিক্ষক বঞ্চিত হলেও বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি ও গত ১৭ বছর আওয়ামী লীগের প্রভাবের কারণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারেন নি। গত বছর জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যূত্থানে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর অন্তবর্তীকালীন সরকার দেশের সকল বিদ্যালয়ের কমিটি বাতিল করে দেন। আর সরকারের পতন ও বিদ্যালয় কমিটি বাতিলের পর বিষয়টি নিয়ে তিনি মুখ খোলেন।
জানা গেছে, তৎকালীন সময়ে অর্থ্যাৎ ২০১৩ সালে জাতীয়করণের পূর্বে সিহিরচোঁ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি বেসরকারিভাবে পরিচালিত হতো। বিধি অনুযায়ী ১৯৮৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর বিদ্যালয়ের সম্পাদক নূর মোহাম্মদ মজুমদার স্বাক্ষরিত নিয়োগপত্র অনুযায়ী ১ জানুয়ারী ১৯৮৯ সালে সরাসরি প্রধান শিক্ষক পদে যোগদান করেন, মো. আ. হালিম। যোগদানপত্রটি অনুমোদন করেন, বিদ্যালয়ের সভাপতি জয়নাল আবেদীন মজুমদার।
যোগদানের পর থেকেই মো. আ. হালিম প্রধান শিক্ষক পদে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। এ পদে তিনি প্রায় ২০ বছর দায়িত্বরত থাকাবস্থায় ২০০৮ সালের ৯ সেপ্টেম্বর একই বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মো. জুলফিকার আলী মজুমদারকে প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি দেয় বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি। এরপর থেকে তিনি প্রধান শিক্ষক পদে দায়িত্ব পালন করছেন। আর প্রধান শিক্ষক মো. আ. হালিম হয়ে গেলেন সহকারী শিক্ষক।
বর্তমানে বদলিজনিত কারণে উপজেলার বড়কুল পূর্ব ইউনিয়নের নোয়াদ্দা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পদে দায়িত্ব পালন করছেন মো. জুলফিকার আলী এবং সিহিরচোঁ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েই সহকারী শিক্ষক পদেই কর্মরত আছেন আ. হালিম। তাঁর অভিযোগ, ওই সময়ে তাকে বঞ্চিত করে এবং অবৈধ ও অনিয়মের মাধ্যমে জুলফিকার আলীকে প্রধান শিক্ষক করা হয়েছে। তাই, তিনি ন্যায়-বিচার প্রার্থী।
এদিকে যে রেজুলেশনের মাধ্যমে জুলফিকার আলীকে সহকারী শিক্ষক থেকে প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে, ওই রেজুলেশনে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির ১১ জনের নাম উল্লেখ থাকলেও স্বাক্ষর রয়েছে ৪ জনের। বিধি অনুযায়ী এক-তৃতীয়াংশের স্বাক্ষর না থাকলে রেজুলেশনটি গৃহিত বা অনুমোদিত হওয়ার কথা নয়। অর্থ্যাৎ রেজুলেশনটি গৃহিত ও অনুমোদিত করতে হলে ১১ জনের মধ্যে ৭ জনের স্বাক্ষর বাধ্যতামূলক থাকতে হবে।
এতে জুলফিকার আলী মজুমদারের প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতির বিষয়টি যথাযথ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়নি বলে জানান, একজন শিক্ষা কর্মকর্তা। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, যেহেতু কোরাম সম্পন্ন না হওয়ায় ওই রেজুলেশনটি গৃহিত বা অনুমোদিত হয়নি, তাহলে ওই রেজুলেশনে গ্রহণকৃত সিদ্ধান্তগুলো কার্যকর নয়।
অপর দিকে ওই রেজুলেশনে প্রধান শিক্ষক পদে দায়িত্বে থাকা মো. আ. হালিমের বিষয়ে কোন কথা উল্লেখ নেই। তাঁকে প্রধান শিক্ষকের পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে, নাকি প্রধান শিক্ষক থেকে পদানবতী দিয়ে সহকারী শিক্ষক করা হয়েছে?। এধরনের কোন সিদ্ধান্ত ওই রেজুলেশনে উল্লেখ করা হয়নি। ‘যেহেতু তাঁর নিয়োগ প্রধান শিক্ষক পদে, তাহলে কিভাবে তিনি সহকারী শিক্ষক হলেন? এমন প্রশ্ন থেকেই যায়।
এ বিষয়ে মো. আ. হালিমের সাথে কথা হলে তিনি জানান, ওই সময়ে তিনি কামিল (মাস্টার্স সমমান) পাশ থাকাবস্থায় সিহিরচোঁ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সম্পাদক নূর মোহাম্মদ মজুমদার স্বাক্ষরিত নিয়োগপত্র ও সভাপতি মো. জয়নাল আবেদীন মজুমদার অনুমোদনক্রমে প্রধান শিক্ষক পদে যোগদান করেন।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, প্রায় ২০ বছর দায়িত্বরত থাকা অবস্থায় ২০০৮ সালের ৯ সেপ্টেম্বর আমাকে বঞ্চিত করে এবং অবৈধ ও অনিয়মের মাধ্যমে জুলফিকার আলীকে সহকারী শিক্ষক থেকে প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়। বিভিন্ন প্রেক্ষাপটের কারণে আমি এতোদিন কথা বলতে পারিনি। এখন আমি ন্যায়-বিচার প্রার্থী।
এদিকে অভিযোগ অস্বীকার করে মো. জুলফিকার আলী মজুমদার জানান, বিধি অনুযায়ী ও বৈধ নিয়োগ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাঁকে প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি দেন, তৎকালীন সময়ের বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি।
তিনি বলেন, ওই সময়ে রেজিষ্টার্ড বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের পদ ছিলো না। ২০০৮ সালে সরকারি এক পরিপত্রের আলোকে প্রধান শিক্ষকের সৃষ্ট পদে আমাকে সহকারী শিক্ষক থেকে প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি দেন, বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি এবং বিধি অনুযায়ী সরকারিভাবে আমার নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।
তিনি আরো বলেন, এর মধ্যে ২০১৩ সালে দেশের অন্যান্য রেজিস্টার্ড প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাথে সিহিরচোঁ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টিও জাতীয়করণ হয় এবং ওই সময় (২০০৮) থেকে আজ পর্যন্ত আমি প্রধান শিক্ষক পদে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছি। তবে বর্তমানে আমি বদলীজনিত কারণে অন্য একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কর্মরত আছি।
বিদ্যালয়ের সাবেক সভাপতি মো. জয়নাল আবেদীন মজুমদারের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন রিসিভ ও পরে ফোন ব্যাক না করায় তাঁর বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আবু সাঈদ চৌধুরীর সাথে কথা হলে তিনি জানান। বিষয়টি তিনি জেনেছেন এবং শুনেছেন। তবে এ বিষয়ে তাঁর কাছে কেউ লিখিত অভিযোগ করেনি।
এক প্রশ্নের আলোকে তিনি বলেন, জানতে পেরেছি সহকারী শিক্ষক মো. আ. হালিম আমাদের ডিজি মহোদয়ের কাছে প্রধান শিক্ষক মো. জুলফিকার আলী মজুমদারের বিরুদ্ধে অভিযোগ দিয়েছেন।
ফম/এমএমএ/



