স্মৃতির পাতায় কলেজে চাকুরি জীবনের শেষ দিনগুলোর কিছু ভাবনা

৩০ জুন ছিল আমার চাকুরি জীবনের শেষ দিন। ২০১৬ সালের এদিন বিকেলে অধ্যক্ষ পদের দায়িত্ব ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে বুঝিয়ে দেয়া হয় তৎকালীন ভাইস প্রিন্সিপাল রতন মজুমদারের কাছে। তখন উপস্থিত ছিলো শিক্ষক পরিষদের সম্পাদক অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম, অধ্যাপিকা শাহানারা বেগম, মাসুদা খানম, শোয়েব, ইমান হোসেনসহ কয়েকজন শিক্ষক ।

“দীর্ঘ ৩৪ বছর একটানা কলেজে চাকুরি জীবনের ইতি টানায় মনটা খানিকটা খারাপ ছিলো, ছিলো অশ্রুসিক্ত কিন্তু বিধ্বস্ত হইনি’’। কারণ কাজের যেমন শুরু আছে, তেমন শেষও আছে। ভালোয় ভালোয় শেষ করতে পারলাম। আলহামদুলিল্লাহ কোটি কোটি বার। দায়িত্ব হস্তান্তরের কথা কলেজের সবাইকে বলিনি। বলেছি কলেজ কমিটির সভাপতি ও সংসদ সদস্য পরম শ্রদ্বেয় ডাঃ দীপু মনি ম্যামকে, কলেজ কমিটির ২/৪ জন সদস্যদেরকে। দায়িত্ব থেকে মুক্তি-এ কথা ভেবে মনে মনে ভালোও লাগছিলো। ইতিমধ্যে আমি চলে আসবো বা ৩০ জুন হবে আমার শেষ কর্ম দিবস-এটা ভেবে অনেকে ভিতরে বেশ আনন্দিত, এটা অস্বাভাবিক ছিলো না আমার কাছে। কারণ কারো বিদায়ে কিছু কিছু সম্মানিত শিক্ষক ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় স্বপ্ন দেখতেই পারেন। হিসেব নিকেষ করেছেন। উনি প্রিন্সিপাল হলে আমি হবো ভাইস— ইত্যাদি ইত্যাদি।

এই চিন্তায় আমার কিছু কাজে হঠাৎ ইউটারন নিলো কিছু শিক্ষক-যা আমার মনে সেই যে বিশ্বাসঘাতক খন্দকার মোশতাকের কথা মনে করিয়ে দিলো। আমার কাছে এটাও অস্বাভাবিক ছিলো না। কেহ চলে গেলে অন্যদের সুবিধা হবে এটা সব সময় মেনে চলি। এটাতো বিধির নিয়ম। ব্রিটিশ কবি আলফ্রেড টেনিসন তাঁর একটি কবিতায় বলেছেন ”The old order changeth, yielding place to the new.” একথা আমি সব সময় স্মরণ করি। চাকুরি জীবনের শেষ দিকে সহকর্মীদের শ্রদ্বাভক্তি সাধারণত কমে যেতে দেখলাম। দেখলাম ১/২ জন সহকর্মী অন্য দিকে তাকিয়ে হাঁটছেন। ভাবটা এমন যেনো কলেজের ভিতরে পাশ দিয়ে আমি যে হেঁটে যাচ্ছি, খেয়ালই করলেন না। ওহ খন্দকার মোশতাক তোমর মতো লোক আজও আশেপাশে আছে। আমি একটা চিন্তা সব সময় মনে রাখি যে, সব কিছুর অবসান আছে। টুডে অর টুমরো আপনাকে বড় চেয়ার ছাড়তেই হবে। কলেজ চাকুরি জীবনে সবশেষও শীর্ষ পদ অধ্যক্ষের চেয়ার। এটা কেহ পায়, আবার কেউ পায় না। আবার কেউ নিতেও চায় না। অবসরের পরে হয়তো ইনিয়ে বিনিয়ে কিছুদিন পদে থাকা যাবে কিন্তু অন্যকে সুযোগ করে দিতে হবে।

১৯৮২ সালের মাঝামাঝির (১লা জুলাই) দিকে শুরু থেকে চাকুরি জীবন ছিলো মোটামুটি ভালো। প্রথমে খন্ড কালীন, পরে চাকুরি নিয়মিতকরন করার জন্য আমদের বেশ কজনের ইন্টারভিউ নিলেন জেলা প্রশাসকের পক্ষে এ.ডি.এম মো: দেলোয়ার হোসেন সাহেব ও চাঁদপুর সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ মতিউর রহমান স্যার।

এভাবে ১৯৮২ সালের ১ অক্টোবর থেকে যাত্রা শুরু। সরকারি বেনিফিট (বেতনের ৩০%) পেলাম ৬মাস পরে। সেই সময়ে ৩ মাস পর পর সরকারি বেনিফিট দেয়া হতো। অনেক সময় অর্থ বছরের শেষ দিকে এই বেতন ৫ মাসের মাথায় পেতাম। এতে অনেক উপকারও হতো। আবার কি যে অসুবিধা হতো অর্থ কষ্টে, সেটা বলে বুঝানো যাবে না এখনকার স্যারদের। এক প্রিন্সিপালতো সব সময়ে বলতেন-“ কি করবেন ভাই, বেসরকারি কলেজ‘’। আবার বলতেন-প্রিন্সিপাল কি নিজের জমি বিক্রি করে শিক্ষকদের বেতন দিবে? মানে-আপনাকে হতাশায় রাখতে পারলেই যেনো কিছু কিছু দুষ্ট প্রকৃতির অধ্যক্ষদের মনে প্রশান্তি। আবার ব্রিটিশ পদ্বতি “ডিভাইড এন্ড রুল’’ প্রয়োগতো তো আছেই। কোন একজন সরকারি কলেজের শিক্ষক দেখলেই বলতো, দেখুন উনি একদিন ডিজি হয়ে যাবেন। আবার বসে বসে বলতো, আরে ডিজি’র কি অভিজ্ঞতা আছে? উনি কয়দিনের ডিজি? “অধ্যক্ষের চেয়ারে বসে যতসব মিথ্যা ও ফালতু কথা যে কতো ভাবে বলতো তার কোন ইয়ত্তা নাই।’’ একজনের কথা অন্যজনকে জানিয়ে সহকর্মীদের মধ্যে হানাহানি লাগিয়ে নিজে ফায়দা লুটতেন। কলেজে সবাইকে একটা মেন্টাল টরচারের মধ্যে রাখতে পারলেই মনে হয় আনন্দ পেতেন। যাক সে সব কথা। এসব ভালো মন্দ দেখারও সুযোগ হলো। এটাও একরকম খারাপ অভিজ্ঞতা। যা ঘৃনা করি।

আমার সবচেয়ে বড় কথা-সুস্থভাবে চাকুরি জীবন শেষ করেছি। আমাদের সাথের অনেক সহকর্মীতো না ফেরার দেশে। আল্লাহ তাঁদের বেহেস্তি করুন।
প্রতি বছর ৩০ জুন আসলে, কলেজ জীবনের সেই স্মৃতিগুলো মনে পড়ে। এ কলেজে কটেছে যৌবনকালটা। মনে পড়ে, ১৯৮৪ সালের দিকে কলেজের জমি সরকারিভাবে নিলাম হচ্ছে। ঢাকার জাতীয় ইংরেজি দৈনিকে ফ্রন্টপেজে নিউজও হলো, শিরোনাম ছিলো “এ কলেজ অন অকশান’’। তখন এরশাদের আমল। কুমিল্লায় যেতে হয়েছিলো কলেজের দরখাস্ত নিয়ে। অধ্যক্ষ ছিলেন কুমিল্লা শিক্ষাবোর্ডের অবসরপ্রাপ্ত সচিব জনাব এ বিএম আখতারুল হক। (চাঁদপুর সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ জনাব তোয়াহা স্যারের বন্ধু)। তখন আমাকে এ গুরু দায়িত্ব দেয়া হলো। সেখানকার ডিএম এল এ সাহেবকে পুরানবাজারে একটি কলেজের প্রয়োজন আছে একথা বুঝিয়ে দরখাস্তখানি পেশ করার জন্য বলা হলো। সেটাই হলো। হঠাৎ ভোরেই রওয়ানা দিলাম। সকাল ১০টা থেকে অপেক্ষা করে ও দাঁড়িয়ে থেকে দুপুর ৩টায় তা পেশ করলাম। বললাম কলেজ বন্ধ হয়ে গেলে, এলাকায় মানুষের মাঝে ক্ষোভ বিক্ষোভ বাড়বে।

এরপরে ১৯৯২ তে ডিগ্রি কোর্স খোলার জন্য চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ও গাজীপুরে দৌঁড়াদৌড়ির কথা, শুভেচ্ছা স্বরুপ ইলিশের প্যাকেট নিয়ে গাড়িতে, ট্যাক্সিতে, উঠানামার কথা। আমাকে যেতে হতো কারন নচেৎ ডিগ্রি খোলা হতোই না। ১৯৯৩তে ডিগ্রি পাস কোর্স চালু হলো। এরপর আবার ২০১১ তে কলেজের শ্রীবৃদ্ধির জন্য সম্মান শ্রেণি খোলার লক্ষ্যে দৌঁড়াদৌড়ি শুরু হলো। এ কলেজে সম্মান শ্রেণি খোলা এটা ছিলো আমাদের জন্য একটা চ্যালেঞ্জ। অধ্যক্ষ সাহেব প্রায়শ বলতেন-এসব কলেজে সম্মান খোলার দরকার নাই। মনে রাখবেন, অধ্যক্ষ যা চান না, সেটা কখনো হয়ও না। প্রবল প্রতিকূলতার মধ্যে আমাদের বেশ ক’জন উদ্যোগী শিক্ষকের নিজেদের শ্রম ও অনেক টাকা ব্যয় হয়েছে এ কোর্স খোলার জন্য। যাক গভর্নিং বডির সহযোগিতায় বিশেষ করে ডা দীপু মনি ও জাহাঙ্গীর আখন্দ সেলিম সাহেবের উদ্যোগে কলেজ এক ধাপ এগিয়ে গেলো। পদ্মা সেতুর মতো সম্মান শ্রেণিও খোলা হয়েই গেলো। পরে এ কলেজে সম্মান পরীক্ষার সেন্টারও হয়েই গেলো। ভালো কাজে সব সময় বিরোধীতা থাকেই। বিরোধীতা না থাকলে কাজ এগোয় না। এতে উৎসাহ ও চেতনা বরঞ্চ আরো বৃদ্ধি পায়। তবে প্রতিষ্ঠান প্রধানকে হতে হয় ব্যক্তিত্ববান। তারঁ থাকতে হবে কলেজকে এগিয়ে নেয়ার ভিশন। আমি অধ্যক্ষ থাকাকালীন নতুন করে ইংরেজিসহ ৪ বিষয়ে সম্মান কোর্স খোলা হলো। মাঝে মাঝে ক্লাশ নিয়েছি। কিন্তু দু:খের বিষয় অবসরের পর আর সে সুযোগটি দেয়া হয়নি। অথচ আমি না থাকলে ইংরেজি ও অন্য বিষয়ে অনার্স কোর্স কখনোই হতো না। সম্মান কোর্স খোলার কারণ ছিলো-চাঁদপুর সরকারি কলেজে সবাই সুযোগ পায় না। তাই জেলা সদরের কলেজ বিধায় একলেজে সম্মান কোর্স খোলার এতো প্রাণান্তকর চেষ্টা। ব্যক্তি স্বার্থের চেয়ে প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ বেশী অগ্রগণ্য। এতে কলেজের স্ট্যাটাস ও কলেজ কমিটির সদস্যদেরও সম্মান বৃদ্বি পাবে।

তাছাড়া তিনটি বিষয়ে মাস্টার্স প্রিলিমনারী খোলার জন্য শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে সাড়ে ৬৭ হাজার টাকার চেক বিশ্ববিদ্যালয়ে জমা দেই। আমার চাকুরীর মেয়াদ না থাকায় সেটা আর সম্ভব হয়নি। হয়তো কোনদিনই আর হবে না। অনেক স্মৃতিই মনে পড়ে। অধ্যক্ষের রুমে একদিন এক কাঠ ব্যবসায়ী বললেন “প্রিন্সিপাল দেলোয়ার সাহেব, কলেজে সম্মান শ্রেণি খোলায় আপনার চাকুরির অসুবিধা হবে নাতো? আপনার ডিগ্রি ঠিক আছে তো? জানতে চাইলাম এ কথা বলার মানে কি? বললেন- মানে আগেতো শুনতাম প্রিন্সিপাল সাহেবের নাই, সেজন্য বললাম’’। বললাম, না, আমার অসুবিধে নেই।

সে যাক আমার চাকুরীর শেষ দিনে এক কোটি ২.৩ লাখ টাকা কলেজ ফান্ডে রেখে আসি। এটা শুনে উপস্থিত শিক্ষকগন স্তম্ভিত হন। বিদায়ের কথা কলেজের সভাপতি ডাঃ দীপু মনি ম্যামকে জানাই। আর যখন ২০১২ সালের মে মাসে অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্বভার নেই, তখন কলেজে সবর্সাকুল্যে ফান্ড ছিলো প্রায় সাড়ে ১০ লাখ টাকা। এর মধ্যে জেনারেল ফান্ডে ক্যাশ ছিলো সাড়ে তিন লাখ। অর্থাৎ আমি যাতে শিক্ষকদের বেতন দিতে ব্যর্থ হই। ব্যর্থ হলেই তখন শিক্ষকগন বেতন না পেয়ে হা হুতাশ করবেন। বলবেন অযোগ্য অধ্যক্ষ। আমি বিশেষভাবে কৃতজ্ঞ যে গভর্নিং বডির সভাপতি ও পররাষ্ট্র মন্ত্রী ডাঃ দীপু মনি ম্যাম ও প্রতিষ্ঠাতা সদস্য জনাব জাহাঙ্গীর আখন্দ সেলিমসহ সবাই আমাকে সহযোগিতা করেছেন। আবার চাকুরিকালে ২/১ জন কমিটির সদস্য হাই-কোর্ট ও লাল চক্ষু প্রদশর্ন করেছেন। আবার সভাপতির বা ওনাদের কান ভারীও করেছেন কেহ কেহ। অপমান অপদস্থ করার জন্য সচেষ্ট ছিলেন। অবসরের ২ বছর পরে আমাকে আনুষ্ঠানিক বিদায় বেলায় গভর্নিং বডির কোন সদস্যও উপস্থিত ছিলেন না। যাহোক আমি তাঁদের সুস্বাস্থ ও সর্বাঙ্গীন কল্যান কামনা করি। কল্যাণ কামনা করি সকল শিক্ষক ও অফিস স্টাফদের।

অধ্যাপক দেলোয়ার আহমেদ, ৩০ জুন, ২০২২খ্রি.
প্রাক্তন সহ-সভাপতি চাঁদপুর প্রেসক্লাব ও
সাবেক অধ্যক্ষ, পুরানবাজার ডিগ্রি কলেজ, চাঁদপুর সদর, বাংলাদেশ।

ফোকাস মোহনা.কম