সমাজের স্থানান্তর পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে ঘটে

।। মোঃ মহসিন হোসাইন।। মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব। কারণ পৃথিবীতে ইতিবাচক ও নেতিবাচক দুটি দিক আছে যা পার্থক্য নির্ণয় করার জ্ঞানবুদ্ধি মানুষের রয়েছে। এখানেই অন্য প্রাণীদের চেয়ে মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব। কিন্তু জন্মসূত্রে মানুষ হলেই কি আদতে মানুষ হওয়া যায়? মানবশিশু যখন জন্মগ্রহণ করে, তখন সে থাকে শুভ্র মুক্তোর মতো নিষ্কলুষ ও পবিত্র, সব ধরনের অন্যায় আচরণ, পরশ্রীকাতরতা ও বিভেদমূলক চিন্তাধারা থেকে মুক্ত। কিন্তু শয়তানের কুমন্ত্রণায় ও আমাদের পরিবেশের নানা অসঙ্গতি দেখে মানুষে-মানুষে বিভেদের প্রাচীর তৈরি করে। মানবসমাজে নিয়ে আসে বিভীষিকা। আজ ধর্ম, বর্ণ, জাতি, ভাষা ও চিন্তাধারা ভেদাভেদে একাংশ মানুষ হয়েছে মানুষের শত্রু। আজ আমরা যে সামাজিক পরিমণ্ডলে বসবাস করছি তা পূর্বে ছিল না এবং বর্তমান কাঠামোও আগামী দিনে থাকবে না। সামাজিক পরিবর্তন বলতে বুঝায় সমাজস্থ মানুষের আচার-আচরণ, ধ্যান-ধারণা, মূল্যবোধ, সংস্কৃতি, কৃষ্টি, শিল্পকলা, রাজনীতি, অর্থনৈতিক উৎপাদন ও বণ্টন ব্যবস্থা এবং সর্বোপরি সমাজ কাঠামোর পরিবর্তন।

সমাজ পরিবর্তন হয় সময়ের সাথে সাথে। সামাজিক পরিবর্তনের সাথে সব সময় সামাজিক অগ্রগতি বা প্রগতির সম্পর্ক থাকে না। পরিবর্তনের দ্বারা সমাজ বর্তমান অবস্থা থেকে খারাপ দিকে যেতে পারে, আবার উন্নতির দিকেও যেতে পারে। সমাজ পরিবর্তনের সাথে অনেক সময় সামাজিক মূল্যবোধের সম্পর্ক থাকে না। যেমন, সংস্কৃতির ব্যাপ্তির মাধ্যমে সমাজের যে পরিবর্তন ঘটে তাতে সমাজে প্রচলিত মূল্যবোধের পতনও ঘটতে পারে। আবার বিজাতীয় সংস্কৃতির অনুপ্রবেশের মাধ্যমে কোন সমাজ তার নিজস্ব মূল্যবোধ হারিয়ে ফেলতে পারে। এক্ষেত্রে সমাজ মূল্যবোধের সংকটে পড়তে পারে।

সমাজের স্থানান্তর পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে ঘটে। আর সমাজের সমগ্র স্থানান্তর দৃশ্যমান হয় নানা অনুষঙ্গের দৃশ্যমান পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে। সমাজের অনুষঙ্গের মধ্যে রয়েছে পরিবার ব্যবস্থার ধরন, সমাজে বসবাসকারী মানুষের মানুষিক অবস্থার বাহ্যিক রূপ, আচার আচরণের বহিঃপ্রকাশ, সহযোগিতা ও দায়বদ্ধতার প্রবণতার বাহ্যিক রূপ। আর এগুলোর সমন্বিত রূপ হচ্ছে সামাজিক মূল্যবোধ। এ ছাড়া সমাজের আরও অনুষঙ্গ আছে। মূলত, একটি সমাজের সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, পরিবেশগতসহ সমন্বিত সামগ্রিক পরিবর্তনই দৃশ্যমান হয়। আর এই দৃশ্যমান স্থানান্তরকে হাবার্ট স্পেনসার বলেছেন, একটি জটিল কাঠামোয় ক্রমে রূপান্তরিত হওয়া, যা সামাজিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে সমাজের রূপান্তর বা অবস্থান্তর, যাকে আমরা এককথায় স্থানান্তর বলতে পারি। আর এ স্থানান্তর অবস্থায় সমাজে অনেক ইতিবাচক ও নেতিবাচক প্রভাব দৃশ্যমান হয় নানাভাবে। বিশেষ করে সমাজে বসবাসকারী মানুষের সামাজিক র্মূল্যবোধের গঠন নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দেয়।

আর এই পরিবর্তনের অনেক কারণ রয়েছে, যেমন: মানুষের জীবনযাত্রায় পরিবর্তন, রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের কারণে, মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন, অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ও অবস্থার কারণে পরিবর্তন, সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের প্রতিক্রিয়ায় পরিবর্তন, তথ্য ও প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের ও ব্যবহারের কারণে পরিবর্তন, শিল্প সম্প্রসারণের কারণে পরিবর্তন, অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক সহজ যোগাযোগের কারণে পরিবর্তন, জীবনধারণের বিভিন্ন অনুষঙ্গের সহজলভ্যতার জন্য, যেমন: বিদ্যুৎ, আবাসন, স্বাস্থ্যসুবিধা ইত্যাদির কারণে পরিবর্তনগুলোকে বিশেষভাবে উল্লেখ করা যায়। উল্লিখিত কারণগুলো সরাসরি প্রভাবিত করে সমাজে বসবাসকারী ব্যক্তি ও সমষ্টির মানুষের মনঃসামাজিক অবস্থার উপর, যা সামাজিক মূল্যবোধকে সরাসরি প্রভাবিত করে। ফলে দীর্ঘদিনের সামাজিক মূল্যবোধ পরিবর্তিত তথা স্থানান্তরিত হতে থাকে। আর এ সময়ে সমাজের মানুষের মধ্যে একধরনের মনঃসামাজিক অসহিষ্ণুতা ও অস্থিরতার প্রবেশ ঘটে। ফলে দীর্ঘদিনের গঠিত সামাজিক মূল্যবোধের বিচ্যুতি ঘটে। আর এই বিচ্যুতির বহিঃপ্রকাশ হলো বিভিন্ন অপ্রত্যাশিত আচরণ। প্রাসঙ্গিকভাবে বলা প্রয়োজন, সামাজিক মূল্যবোধ হলো সমাজে মানুষের আচার-আচরণের মাপকাঠি। সমাজে মানুষ বসবাস করতে গিয়ে কতগুলো মাপকাঠির দ্বারা তাদের আচার-আচরণ নিয়ন্ত্রিত করে থাকে। মূলত, সেগুলোর সমন্বিত বহিঃপ্রকাশ সামাজিক মূল্যবোধ।

সমাজবিজ্ঞানীরা সামাজিক মূল্যবোধের যে সংজ্ঞায়িত করেছেন, তার মোদ্দাকথা হলো, সমাজে বসবাসকারী মানুষের আচার-আচরণ যে মাপকাঠি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়, তার সমন্বিত রূপই হলো সামাজিক মূল্যবোধ; যদিও এই সামাজিক মূল্যবোধ পরিবর্তিত হয়। সামাজিক মূল্যবোধের মূল ভিত্তি হলো আদর্শ, নীতি-নৈতিকতা এবং মানুষের ধ্যান-ধারণা। তবে এটা প্রতিষ্ঠিত যে সামাজিক মূল্যবোধ সমাজের মানুষের মধ্যে ঐক্য তৈরি করে। ন্যায়-অন্যায় ও অবিচার প্রতিরোধে প্রতিবাদ প্রতিরোধ করতে উদ্বুদ্ধ করে। আবার এর পাশাপাশি সামাজিক মূল্যবোধকে দুভাবে দেখা যায় ইতিবাচক ও নেতিবাচক মূল্যবোধ। আর এই নেতিবাচক মূল্যবোধে সমাজের মানুষের কিছু অংশের অপ্রত্যাশিত, অনাকাক্ষিত ও ধ্বংসাত্মক আচার-আচরণের বহিঃপ্রকাশ দেখা যায়। সাম্প্রতিক সময়ের কিছু কিছু ঘটনা তারই বাহ্যিকরূপ।

বর্তমান বাংলাদেশের আর্থসামাজিক অবস্থার সামগ্রিক পরিবর্তন তথা স্থানান্তর ঘটেছে। এ পরিবর্তন প্রতিটি ক্ষেত্রেই দৃশ্যমান। এ ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তনগুলো পরিসংখ্যানগত ভাবে প্রকাশ পাচ্ছে, যা জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে গৃহীত হচ্ছে। পাশাপাশি সামাজিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে নেতিবাচক কিছু বিষয় পরিলক্ষিত হচ্ছে, যেমন: শিক্ষক নিগ্রহ, ধর্ষণ, মাদকের ব্যাপকতা, নারী নির্যাতন ইত্যাদি সামাজিক অস্থিরতা। বাংলাদেশে বর্তমানে উল্লেখযোগ্য হারে অর্থনৈতিক উন্নয়ন, যেমন: মাথাপিছু আয়, রিজার্ভ, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, তথ্য ও প্রযুক্তি খাতের উন্নয়ন, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, রপ্তানি বৃদ্ধিসহ নানা খাতের উন্নয়ন দৃশ্যমান। ঠিক তেমনিভাবে সামাজিক খাতেরও উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন, যেমন: শিক্ষার হার বৃদ্ধি, জনসংখ্যা ও মাতৃমৃত্যুর হার হ্রাস, যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন, আধুনিক তথ্য ও পযুক্তির ব্যাপক ব্যবহার, আবাসন, সুপেয় পানির প্রাপ্যতা, পয়োনিষ্কাশন সুবিধা, সর্বোপরি জীবনযাত্রার মানের উন্নয়ন আজ দৃশ্যমান। তবে ব্যতিক্রম তো কিছু আছেই।

এছাড়াও বিজ্ঞানের অগ্রগতি ও প্রযুক্তির আবিষ্কারের ফলে ব্যক্তি নতুন নতুন কলাকৌশল সম্পর্কে সচেতন হয়। প্রযুক্তির পরিবর্তন সমগ্র সমাজ কাঠামোর পরিবর্তন আনতে পারে। সমাজবিজ্ঞানী ভেবলেন বলেন, “প্রযুক্তি প্রধানত তিনটি জিনিসে পরিবর্তন আনে। যথা ১. উৎপাদন, ২. যোগাযোগ ও ৩. মনোভাব।” এই তিনটি জিনিস প্রকৃতপক্ষে সমাজ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন আনে। বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার ও যান্ত্রিক কলাকৌশলের প্রসারের ফলে সমাজের পুরাতন কাঠামো বিলুপ্ত হয়ে নতুন সমাজ সচেতনতার জন্ম দেয়। সমাজবিজ্ঞানী এমিল ডুরখেইমের মতে, “বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের ফলে সমাজে বসবাসরত ব্যক্তিদের মধ্যে সহজ-সরল ও স্বাভাবিক সস্পর্কের পরিবর্তে কৃত্রিম সম্পর্কের সৃষ্টি হয়।”

আলোকিত সমাজ গড়তে মানুষের চিন্তাধারা ও কার্যক্রমে ইতিবাচকতার চর্চা অতিব জরুরি। আমাদের সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে জাগ্রত হতে হবে যাতে অপরাধ করে কেউ মানসিক তৃপ্তিবোধ না করেন। তাই আমাদের মন মানসিকতা পরিবর্তন করা প্রয়োজন। মন মানসিকতার পরিবর্তনের ফলে সমাজ পরিবর্তন করা সম্ভম।

লেখক পরিচিতি: মোঃ মহসিন হোসাইন
লেখক, কলামিস্ট ও সাংবাদিক
সভাপতি- মানবতার ডাক সাহিত্য পরিষদ।

ফোকাস মোহনা.কম