শেখ হাসিনা : স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম নেত্রী

এস ডি সুব্রত।। বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা, দেশের অভ্যন্তরীণ হাজারো প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে বিশ্বের বুকে এক নতুন বাংলাদেশকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন । মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত ধরে বিশ্ব দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে বাঙালি জাতি । এক সময়ের ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’র বদনাম থেকে বাংলাদেশকে মুক্তি দিয়েছেন সততা ও বিচক্ষণতায় আর দূরদর্শী নেতৃত্বের কারণে । এর জন্য অতিক্রম করতে হয়েছে কন্ঠকাকীর্ণ পথ । এই পথচলায় প্রতিটি দিন ছিল দুঃস্বপ্নের মতো। স্বজন হারানোর বেদনায় ভিজেছে তার শাড়ির আঁচল। নির্বাসিত জীবনের প্রতিটি দিন কেটেছে প্রাণ হারানোর শঙ্কায় । সব ষড়যন্ত্র মোকাবিলা প্রতিষ্ঠা করেছেন এক নতুন বাংলাদেশকে। নিজের জীবনের মায়া ত্যাগ করে, দেশের মানুষের কথা ভেবেছেন সব সময় ।

১৯৮১ সালের ১৭ মে, বিধ্বস্ত বাংলাদেশে দেশপ্রেমের আর প্রাণের জোয়ার নিয়ে ফিরে এসেছিলেন তিনি স্বদেশের মাটিতে সকল ভয়ভীতি উপেক্ষা করে । ২০০৭ সালের নানা প্রতিকূলতার কাছে হার না মেনে জনতার জন্য রুখে দাঁড়িয়েছিলেন শেখ হাসিনা ।

বারবার শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টা করে ব্যর্থ হওয়ায়, তাকে দেশ থেকে সরানোর অপচেষ্টা করে প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীও তাদের দোসর আন্তর্জাতিক চক্র। সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শাসনকালে চিকিৎসার জন্য শেখ হাসিনা দেশের বাইরে গেলে তাকে দেশে না ফেরার জন্য ফন্দি আঁটে । জনতা র নেত্রী জেলের ভয় উপেক্ষা করে সেই বছরের ৭ মে দেশে ফিরে আসেন বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা । বিরাজনীতিকরণের ষড়যন্ত্রমূলক পরিস্থিতিতে নিজের জীবনের কথা ভেবে নিরাপদে বিদেশে না থেকে, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দেশে ফিরে আসেন । ২০০৭ সালে সামরিক বাহিনীর সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও আন্তর্জাতিক কুচক্রীদের দেশবিরোধী ষড়যন্ত্র রুখে দিয়ে চিকিৎসা শেষে দেশে ফিরে গণতন্ত্র রক্ষার সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েন আপোসহীন নেত্রী। তখন ১৬ জুলাই, শেখ হাসিনাকে গ্রেফতার করে গত জাগরণ স্তব্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা করা হয় । কিন্তু জেলে যাওয়ার আগে শেখ হাসিনা যে নির্দেশ দিয়ে যান, তার প্রতি আস্থা রাখে তার দলের নেতা ও জনগণ। সংগঠিত হতে থাকে দল। যার ফলস্বরূপ ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিজয় এবং আজকের বাংলাদেশের বিশ্বজয়ের গল্পের জালবোনা শুরু হয় ।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম, বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা আর আওয়ামী লীগ যেন একই সূত্রে গাঁথা। ১৯৪৯ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে অনেক চড়াই উৎরাই পেরিয়ে আওয়ামী লীগ বঙ্গবন্ধুর হাতে সঞ্জীবনী লাভ করে । এই দলের নেতৃত্বেই ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার অনন্য ফল ভোগ করি ।

বিধ্বস্ত দেশজুড়ে পাকিস্তানি সামরিক জান্তার নির্মমতা র চিহ্ন, ৫৫ হাজার বর্গমাইলের প্রতিটি ইঞ্চিতে রক্তের স্পষ্ট দাগ, দুই যুগের অধিক সময়ের অপশাসন ও শোষণ আর ৯ মাসের যুদ্ধে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল আমাদের বাংলা। একাত্তরের ৭ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বজ্রকণ্ঠের আহবানে জীবন বাজি রেখেছিল সাত কোটি বাঙালি । জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সদ্য-স্বাধীন এই বিধ্বস্ত রাষ্ট্রে যখন শুরু হলো দেশ গড়ার কাজ শুরু হল তখন দেশাদ্রোহীদের ষঢ়যন্ত্র চলতেই থাকলো। ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়িকে ঢেকে দিলো অশুভ কালো ছায়া । এরপর দীর্ঘদিনের জন্য সামরিক শাসন এবং মুক্তিযুদ্ধে পরাজিত কুচক্রীদের আঁচরে ক্ষতবিক্ষত হল বাংলাদেশ । শূরু হল অপশাসন । সেই সময়, স্বৈরশাসনে জর্জরিত জনমনে স্বস্তি ফেরাতে, দেশজনতার আহ্বানে ১৯৮১ সালের ১৭ মে, অর্ধযুগ নির্বাসন শেষে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দেশে ফেরেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা দেশ ও দেশের মানুষের শান্তির কথা ভেবে । জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর পরিবারকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার নীল নকশা আঁকে কুচক্রী মহল। মুজিব পরিবারকে নিশ্চিহ্ন করতে ১৫ আগস্ট যে নৃশংস হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়, সেসময় বিদেশে অবস্থান করায় ভাগ্যক্রমে প্রাণে বেঁচে যান বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা – শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা। দেশে ফেরার সব প্রচেষ্টা ভন্ডুল করে দেয় এদেশের স্বাধীনতাবিরোধী চক্র। ছয় বছর যাবত বিদেশের মাটিতে আততায়ীর হাতে প্রাণ হারানোর শঙ্কা নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করেন তিনি। বাঙালি জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের সোনার বাংলাকে শ্মশানে পরিণত করে স্বাধীনতাবিরোধী এদেশের প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী । বঙ্গবন্ধুর বলিষ্ঠ নেতৃত্বে অর্জিত গৌরবকে কালিমালিপ্ত করে পাকিস্তানের দোসররা । দেশে নৈরাজ্য আর উগ্রবাদের রাজত্ব কায়েম করে পাকিস্তানের দোসররা। আপামর জনতার জীবনে দুর্যোগ নেমে আসে। এরকম পরিস্থিতে আর দূরে থাকতে পারলেন না বঙ্গবকন্যা শেখ হাসিনা। দেশের মানুষের মানবিক মুক্তির জন্য নিজের জীবন বিপন্ন করে ছুটে আসেন তিনি। ১৯৮১ সালের ১৭ মে হতাশাগ্রস্ত বাঙালি জাতির আশার প্রদীপ হয়ে দেশে ফিরলেন শেখ হাসিনা। সেদিন রাজধানীর জনস্রোত সিক্ত হয়েছিল অশ্রুজলে । শুরু হলো নতুন করে অধিকার আদায়ের সংগ্রাম ।

১৮৮১ সাল থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ৯ বছর রাজপথে নেতৃত্ব দিয়ে গেছেন সামরিক শাসক স্বৈরাচার এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে। সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের জন্য রাজনৈতিক দলসহ সবাইকে সংগঠিত করেছেন শেখ হাসিনা ।

স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সফল নেতৃত্বের কারণে শেখ হাসিনাকে জনগণের থেকে দূরে সরিয়ে রাখার ঘৃণা ষড়যন্ত্র করা হয়। ১৯৮৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি সামরিক সরকার তাকে আটক করে ১৫ দিন অন্তরীণ রাখে। ১৯৮৪ সালের ফেব্রুয়ারি এবং নভেম্বর মাসে তাকে দুবার গৃহবন্দি করা হয়। ১৯৮৫ সালের ২রা মার্চ তাকে আটক করে প্রায় ৩ মাস গৃহবন্দি করে রাখা হয়। ১৯৮৬ সালের ১৫ অক্টোবর থেকে তিনি ১৫ দিন গৃহবন্দি ছিলেন। ১৯৮৭ সালে ১১ নভেম্বর তাকে গ্রেফতার করে এক মাস অন্তরীণ রাখা হয়। ১৯৮৯ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি শেখ হাসিনা গ্রেফতার হয়ে গৃহবন্দি হন। ১৯৯০ সালে ২৭ নভেম্বর শেখ হাসিনাকে বঙ্গবন্ধু ভবনে অন্তরীণ করা হয়। কোনকিছুতে দমে যাননি জননেত্রী শেখ হাসিনা ।

নেত্রীকে বন্দি করেই থেমে থাকেনি তারা। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের দুর্বার আন্দোলন আন্দোলন থামিয়ে দিতে শেখ হাসিনাকে বহুবার রাষ্ট্রীয় মদতদে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে। ১৯৮৭ সালের ১০ নভেম্বর সচিবালয় ঘেরাও কর্মসূচি পালনকালে তাকে লক্ষ্য করে পুলিশ গুলিবর্ষণ করে। এসময় কয়েকজন নিহত হন। ১৯৮৮ সালের ২৪ জানুয়ারি চট্টগ্রাম কোর্ট বিল্ডিংয়ের সামনে শেখ হাসিনাকে লক্ষ্য করে সরকারের পুলিশ বাহিনী লাঠিচার্জ ও গুলিবর্ষণ করে। এসময় ৩০ জন আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী শহীদ হন। লালদীঘি ময়দানে ভাষণদানকালে তাকে লক্ষ্য করে গুলি করা হয়। জনসভা শেষে ফেরার পথে আবারও তার গাড়ি লক্ষ্য করে গুলি ছোড়া হয়।
জননেত্রী শেখ হাসিনা প্রাণের মায়া উপেক্ষা করে জনগণের ভোটের অধিকার ফিরিয়ে আনতে এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের করতে অটল থেকেছেন রাজপথে । শেখ হাসিনা র নেতৃত্বেই ১৯৯১ সালের জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেয় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। ওই নির্বাচনে কোনও দল এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করেনি। বিএনপি জামায়াতের সমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করে। পঞ্চম জাতীয় সংসদের বিরোধী দলের নেতা নির্বাচিত হন জননেত্রী শেখ হাসিনা। বঙ্গবন্ধুকন্যা থেকে যান রাজপথে মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য । বিরোধীদলীয় নেত্রী হওয়ার পরও শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টা হয়েছে বারবার । ১৯৯১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদের উপ-নির্বাচন চলাকালে তাকে লক্ষ করে গুলিবর্ষণ করা হয়। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফ্রেব্রুয়ারিতে বিএনপির ভোটারবিহীন নির্বাচনের বিরুদ্ধে তিনি গণআন্দোলন গড়ে তোলেন সারা দেশে । তখন আন্দোলনের মুখে ৩০ মার্চ তৎকালীন খালেদা জিয়ার সরকার পদত্যাগে বাধ্য হয়। সেবছর জুন মাসে অনুষ্ঠিত সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তার নেতৃত্বে ১৪৬ আসনে জয় লাভ করে সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ।প্রধানমন্ত্রী হয়েই শেখ হাসিনা দীর্ঘদিন অমীমাংসিত থাকা গঙ্গা-পদ্মা নদীর পানি বণ্টনে ৩০ বছর মেয়াদি চুক্তি , পার্বত্য শান্তি চুক্তি সম্পাদন করেন । ১৯৯৮ সালের বন্যার সময় তার সরকার দুই কোটি বন্যাদুর্গত মানুষকে বিনামূল্যে খাদ্য প্রদান করে। শেখ হাসিনা নেতৃত্ব বিশ্বের শীর্ষ নেতাদের কাতারে জায়গা করে নেয় । এরপরও থেমে থাকেনি ষঢ়যন্ত্র। একের পর এক চক্রান্ত করতে থাকে ষড়যন্ত্রকারীরা । জামায়াত জঙ্গিদের নেতৃত্বে কোটালীপাড়ায় হেলিপ্যাডে এবং সেখানকার জনসভাস্থলে ৭৬ কেজি ও ৮৪ কেজি ওজনের দুটি বোমা পুঁতে রাখা হয়। ঘটনাস্থলে পৌঁছার পূর্বেই বোমাগুলো শনাক্ত হওয়ায় প্রাণে বেঁচে যান শেখ হাসিনা সেবারের মতো। ২০০১ সালে ভোট বেশি পেয়েও, শুধু আসন সংখ্যা কম হওয়ায় সরকার গঠন করতে পারেনি আওয়ামী লীগ।বিরোধীদলীয় নেত্রী হন শেখ হাসিনা।
এবার বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার জঙ্গিবাদের আস্তানায় পরিণত করে দেশকে। মন্ত্রিত্ব পান যুদ্ধপরাধীরা। হত্যা করা হয় শেখ হাসিনার আস্থাভাজন দুজন জনপ্রিয় সংসদ সদস্যকে। দেশজুড়ে ৬৪ জেলায় চালানো হয় বোমা হামলা। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ের সন্ত্রাসবিরোধী জনসভায় শেখ হাসিনাকে হত্যার জন্য এক ডজনেরও বেশি আর্জেস গ্রেনেড হামলা ও গুলি চালানো হয়। এই ঘটনায় নিহত হন ২২ জন এবং আহত হন অনেকে । শেখ হাসিনা নিজেও আহত হন। অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান।মারা যায় তার দেহরক্ষী । এভাবে বারবার মৃত্যুর দরজা থেকে ফিরে এসে কাজ করে যাচ্ছেন দেশের মানুষের জন্য । ্শেখ হাসিনার সফল নেতৃত্বে বাংলাদেশ আজ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে । তথ্য প্রযুক্তি ও যোগাযোগ ক্ষেত্রে এনেছেন বৈপ্লবিক পরিবর্তন । শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছে । তাঁর সততা আর দক্ষতায় দেশের টাকায় হয়েছে স্বপ্নের পদ্মা সেতু যা বিশ্বব্যাপী সাড়া জাগিয়েছে এবং প্রশংসা পে য়েছে বিশ্ববাসীর । শেখ হাসিনার হাত ধরে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সেক্টরে এসেছে যুগান্তকারী পরিবর্তন । প্রত্যন্ত গ্রামও এখন বিদ্যুতের আলোয় আলোকিত । শহরের অনেক সুবিধা এখন গ্রামে বাস পাওয়া যায় । শেখ হাসিনার আরেকটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ গৃহহীনদের জন্য আবসন ব্যবস্থা। গৃহহীন মানুষের জন্য একটা মাথা গোঁজার ঠাঁই করে দেয়া সহজ কথা নয় । যাদের নিজের একটা ঘর বানাবার সাধ্য নেই তাদের ঘর বানিয়ে দিয়েছেন । পিতার আদর্শের সৈনিক হয়ে কাজ করে যাচ্ছেন দেশ ও দেশের মানুষের জন্য। সোনার বাংলার স্বপ্ন জয়ের এক যাদুকর আমাদের জাতির পিতার সুযোগ্য উত্তরসূরী বাংলার আপামর জনতার নয়নের মনি জননেত্রী শেখ হাসিনা ।

লেখক: কবি ও প্রাবন্ধিক, সুনামগঞ্জ।
০১৭১৬৭৩৮৬৮৮ ।
sdsubrata2022@gmail.com

ফোকাস মোহনা.কম