শিক্ষক হেনস্তা : শিক্ষা ও সমাজের দায়বদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন

ছবি: সংগ্রহীত।

হায়দার মোহাম্মদ জিতু।। শিক্ষক ও কৃষকের মাঝে এক ধরনের অভিন্ন, গভীর মমত্ববোধ আছে। দুটি শ্রেণিই সর্বোচ্চ যত্ন ও সতর্কতায় বীজ বপন করে, ফসল ফলায়। এক শ্রেণি মনন, মানস, মস্তিষ্কে এবং অন্য শ্রেণি জমিতে। আমাদের জীবনের জাগরণ, সৃষ্টি, সভ্যতা-সব কিছুতেই এই দুই শ্রেণি অবিকল্প সারথি।

কিন্তু নির্মম বাস্তবতা হলো, সময়-অসময়ে তাঁরাই বহু ক্ষেত্রে উপেক্ষিত ও লাঞ্ছিত। শিক্ষকদের সম্পর্কিত কয়েকটা দুর্ঘটনাকে কেস স্টাডি আকারে নিরীক্ষণ করলে তা স্পষ্ট হয়। কয়েক দিন হলো একজন শিক্ষককে জুতার মালা পরানোর খবর সামনে এসেছে। তাঁর অপরাধ একজন সনাতন ধর্মাবলম্বী শিক্ষার্থীকে অন্যদের থেকে বাঁচানো। শিক্ষার্থীর সংকটে শিক্ষকের ঢাল হয়ে দাঁড়ানো পুরনো সংস্কৃতি। কিন্তু সেই সংস্কৃতির এমন নির্মম ফলাফল লজ্জাজনক। ওই শিক্ষার্থীসহ সনাতন ধর্মাবলম্বী শিক্ষক উভয়েই লাঞ্ছিত হয়েছেন। প্রহসনের বিষয়, এই প্রক্রিয়াটি প্রশাসনিক কাঠামোর একটা অংশের সামনেই ঘটেছে।

স্কুল, কলেজ, মসজিদ, মক্তব-মাদরাসাগুলো এখন কমিটি, সমিতির খপ্পরে। এগুলোতে অভিভাবক হিসেবে থাকা যতটা না সম্মানের, তার চেয়ে বেশি অর্থকড়ির হয়ে উঠেছে। শুধু তা-ই নয়, এমনও হয়েছে, সারা জীবন চুরি করে দাতার ছদ্মবেশে অনেকেই এসবের অংশ হয়ে উঠছেন। ফলে সেবা ও প্রশান্তির এই প্রতিষ্ঠানগুলো বাণিজ্যিক হয়ে উঠছে। নিয়োগ বাণিজ্যের বাগানবাড়িও বনে যাচ্ছে। নড়াইলের সেই শিক্ষক এ রকম কোনো নিয়োগ বাণিজ্য বা স্বার্থের ব্যাঘাত কি না তা-ও খতিয়ে দেখা জরুরি। অর্থাৎ পেছনে থেকে ইস্যু তৈরি করে তাঁকে সরানোর কোনো কৌশল আছে কি না তা-ও তদন্ত করে দেখা জরুরি।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে অধ্যাপককে হেনস্তার অভিযোগ ওঠার পর ওই ছাত্রকে তাত্ক্ষণিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হয়। পরে মামলা হলে তাঁকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এদিকে একজন ইমেরিটাস অধ্যাপকের জমি দখল করে রাখার খবরও পাওয়া গেছে। অথচ একটা সময় শিক্ষকের স্যান্ডেল, জুতা, ছাতা বহন করা সমাজের জন্য আশীর্বাদ ছিল। এই ছোট বিষয়গুলো সামাজিক শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা ও সততাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। বর্তমানের সভা-সমাবেশে আমন্ত্রণের তালিকা ও পরিসংখ্যানও এসব সম্পর্কে একটা বার্তা দেয়। আগে বরেণ্য শিক্ষাবিদরা উৎসব-অনুষ্ঠানে বক্তা হতেন, আলো ছড়াতেন। আর এখন আসছেন উঠতি বা নব্য ধনিক শ্রেণিরা।

শিক্ষার্থীদের মনন ঠিকঠাকমতো গড়ে না ওঠার কারণেও এসব বিশৃঙ্খলা দেখা দিচ্ছে। দেখা যায়, বাড়ির নিচে, পাড়া-মহল্লা, উঠানে সমানে স্কুল গড়ে উঠছে। স্বাভাবিকভাবে এত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মনিটর করাটাও মুশকিল। এ ছাড়া জনসংখ্যার সঙ্গে দেশে জমির পরিমাণ বাড়ার সুযোগ নেই। কাজেই পাড়া-মহল্লা কিংবা অলিগলিতে স্কুল না করে একটা এলাকার জনসংখ্যা পরিসংখ্যান করে সেই মোতাবেক উঁচু ইমারতকেন্দ্রিক স্কুল নির্মাণের ক্ষেত্রে এগোনো যেতে পারে এবং বাকি বিল্ডিংয়ের খরচ দিয়ে সেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য উন্মুক্ত মাঠের ব্যবস্থা করার সুযোগ হবে।

শিক্ষকসমাজের মধ্যে এক ধরনের আভিজাত্য নামের বিষ ঢোকানোর চেষ্টা চলছে। যার আংশিক সফলতাও পরিলক্ষিত। প্রমাণস্বরূপ বলা যায়, কিছুদিনের ব্যবধানে দুই শিক্ষকের এমন পরিণতির পরও শিক্ষককেন্দ্রিক সমিতি, কমিটিগুলোর জোরালো আওয়াজ নেই। হলে হয়তো একজন শিক্ষকের গলায় জুতার মালা পরানো, একজনের স্টাম্পের আঘাতে মারা যাওয়া এবং আরেকজনের জমি দখল করা এসবের মার্জিত প্রত্যুত্তর মিলত।

এ ক্ষেত্রে ছাত্রসংগঠনগুলোর নৈতিক দায়বদ্ধতা নিয়েও প্রশ্ন আছে। শিক্ষা, শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক দায়বদ্ধতায় না থেকে এরা ফুটেজ খাওয়ায় বেশি ব্যস্ত। অথচ এরা জানে না এমন উদ্ভট আচরণের কারণে এদের নিয়ে আড্ডা-গল্পে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করা হয়। সময় সামাজিক আবেদন বদলে ফেলে। বর্তমান সমাজব্যবস্থা কমিউনিটিকেন্দ্রিক আচরণ নিয়ে এগোচ্ছে। সে হিসেবে শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধি হিসেবে শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ানোই যৌক্তিক। কিন্তু সামনে থাকা একটা অংশ এসব পাশ কাটিয়ে নিজেদের ভবিষ্যৎ আখের গোছাতে তৎপর। ফলাফল বর্তমানের অংশীদাররা তাঁদের প্রাতিষ্ঠানিক ও সাংগঠনিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

এ সবই আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ। কারণ অতীত সাক্ষ্য দেয়, একসময় আফগানিস্তানও সমৃদ্ধ ছিল। কিন্তু সেখানে শিক্ষার সঙ্গে সংযুক্ত সময়কে মৌলবাদ খেয়ে ফেলায় শিক্ষার্থী ও শিক্ষকসমাজের মনন-মানসের দূরত্ব তৈরি হয়। যার কারণে সেই সমৃদ্ধতা বিলুপ্তির পথে গিয়ে ঠেকে।

দেশ এখন অর্থনৈতিক উন্নয়নের মহাসড়কে। এই উন্নয়নকে ‘টেকসই’ করতে অবশ্যই সমানে সমানে পারিবারিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক শিক্ষা জোরদার করতে হবে। এই জায়গায় সফল হতে পারলেই আর কোনো শিক্ষক বা গুরুজনকে লাঞ্ছিত হতে হবে না। কলঙ্ক জুটবে না বুকে-কপালে।

লেখক : প্রশিক্ষণবিষয়ক সম্পাদক, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদ। haiderjitu.du@gmail.com

ফোকাস মোহনা.কম